মিয়ানমারের চরমপন্থি সশস্ত্র সংগঠন আরসার আগের নাম ছিল আল ইয়াকিন বা ইসলামি সংগঠন। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে কাজ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ২০১৩ সালের দিকে সংগঠনের নাম পাল্টে রাখা হয় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা, যদিও দলের একাংশ এখনো আল ইয়াকিন নামেই পুরোনো সংগঠনকে আকড়ে ধরে আছে। আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি সেসময়ে হন স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কমান্ডার ইন চিফ। এই আতাউল্লাহর জন্ম সৌদি আরবে, তার বাবা-মা আরাকান থেকে গিয়ে সৌদি আরবে স্থায়ী হন। কিন্তু জন্ম সৌদি আরবে হলেও আতাউল্লাহ পরে পাকিস্তানের করাচিতে এসে বসবাস করতেন।
রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায় করতে ঠিক কবে মিয়ানমারে তিনি ফিরে আসেন, তা জানা যায় না। তবে তা ২০১৩ সালের আগেই অর্থাৎ আল ইয়াকিন থেকে আরসার যাত্রা শুরুর আগেই হয়েছে, তা নিশ্চিত। সংগঠনটি সশস্ত্র হয়ে উঠেছে, তা প্রথম বোঝা যায় ২০১৫-১৬ সালের দিকে। লক্ষ্য ছিল, মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত আরাকান প্রদেশ দখল। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি মিয়ানমারের থানায় হামলা, পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনার পর সংগঠনটির বিরুদ্ধে প্রথম মনোযোগ দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তবে ওই বছরেই আগস্টে তার নির্দেশে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে আরকান দখল ও অস্ত্র লুট করার জন্য আবার হামলা চালায় আরসা। এ ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী আরসা নির্মূলের উদ্দেশে আরকান প্রদেশে হামলা শুরু করে। তখন উত্তপ্ত হয়ে পড়ে মিয়ানমারে মুসলমানদের গ্রামগুলোর পরিস্থিতি। ওই দেশের সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে চড়াও হয়ে অভিযান ও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হামলা ও গণধর্ষণের ঘটনা শুরুর পর নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে তাদের তখন আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ সরকার। আর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আরসার সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য না থাকার সুযোগে এসব রোহিঙ্গার সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশে চলে আসে আরসার কিছু সদস্য আর সমর্থকও।
উদ্দেশ্য তাদের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করা হলেও অস্ত্র তৈরি ও সংগ্রহ, বাহিনীর জন্য সদস্য সংগ্রহ, সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া ইত্যাদি কাজে তারা তখন থেকেই গোপনে বাংলাদেশের পাহাড়ি নির্জন এলাকাগুলো ব্যবহার শুরু করে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে তারা সেগুলোতে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সর্দার বা মাঝিদের করায়ত্ত করা বা ভয় দেখানো দিয়েই এর শুরু। একই সঙ্গে নিজেদের অর্থভাণ্ডার ঠিক রাখতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে এদেশে মাদক চোরাচালান আরও বাড়িয়ে দেয়।
শুরুতে আরসা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকলেও দিনের পর দিন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরস্পরের মধ্যে হামলা, গুলি, হত্যার ঘটনা বাড়তে থাকায় এবং বিপুল পরিমাণ মাদকসহ রোহিঙ্গা ও তাদের প্ররোচনায় স্থানীয়দের আটক বা গ্রেপ্তাদের মধ্য দিয়ে এই চরমপন্থি সংগঠন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র্যাব, এপিবিএন আরসা দমনে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে মাঝেমধ্যেই। তার পরও তাদের গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়া এবং বেশির ভাগ রোহিঙ্গা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িত হতে না চাওয়ায় আরসার নেতাসহ সদস্যরা বরাবরই আছে উৎকণ্ঠায়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরসা ছাড়াও আছে আরও কিছু সশস্ত্র গ্রুপ। তবে তারা পরস্পর যেন পরস্পরের শত্রু। আরাকানে যে বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপ আরাকানের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াই করে যাচ্ছে, আরাকান আর্মি, ওদের সঙ্গেও এসব গ্রুপের শত্রুতা রয়েছে। আরাকান আর্মি সাধারণভাবে সব আরাকানির জন্যে স্বাধীন আরাকান চায়, কিন্তু আরসাকে ওরা চিহ্নিত করে মুসলিম সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে। সব মিলিয়ে অস্থির হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিবির।
আরসার শীর্ষ নেতা অলি আকিজ দীর্ঘদিন মিয়ানমারে আত্মগোপনে থাকলেও গত ১৯ মে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিরেছেন। আরসার শীর্ষ কমান্ডার আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি এবং সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ওস্তাদ খালেদের নির্দেশে ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গ্রুপ আরসার প্রশিক্ষণ। অস্ত্র তৈরি, আত্মগোপন, মিটিংসহ নানা কর্মকাণ্ড সেখানে সংগঠিত হতো। গত রোববার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে ক্যাম্প-৪-এ গোপন বৈঠক থেকে আকিজসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি এলজি, একটি ওয়ানশুটার গান, ১০ রাউন্ড কার্তুজ, দুই কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য, তিনটি মোবাইল এবং নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা জব্দ করা হয়।
র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ১১২ জনের ওপরে আরসার ভিন্ন পদবিধারী নেতা গ্রেপ্তার করেছি। গত রোববারের আরসার শীর্ষ নেতা আকিজসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করি। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
২০১৭ সালে সীমান্ত পার হয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসে ক্যাম্প-৫-এ সপরিবারে বসবাস শুরু করেন মৌলভী আকিজ। পরে আরসার হয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর ক্যাম্প-৫-এ আরসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। নেটওয়ার্ক গ্রুপে কাজ করতেন। ক্যাম্পের বিভিন্ন তথ্য আরসা কমান্ডারদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এভাবে শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছান। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করায় ওস্তাদ খালেদের নির্দেশে রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মহিবুল্লাহকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন আকিজ। তা ছাড়া মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে ক্যাম্পে সেভেন মার্ডারে সরাসরি অংশ নেন। তাদের নেতা-কর্মী আটক হলে কিছুটা দুর্বল হয়ে যায় কিন্তু আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশাল এই জনগোষ্ঠীতে আরসা, আল-ইয়াকিনসহ অন্তত ১৫টি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সক্রিয়। ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ছয় বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে। মামলা হয়েছে পাঁচ হাজারের অধিক। এসব মামলার বেশির ভাগই হয়েছে মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে।
রোহিঙ্গা নেতা ড. জোবায়ের বলেন, আরসা রোহিঙ্গা ক্যাম্প দখল করে রাজত্ব কায়েম করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত তাদের দুই শতাধিক নেতা-কর্মী আটক হয়েছেন। আটক করলেও তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তার কারণ তাদের রোহিঙ্গা সরকার মদদ দিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যাবাসন বন্ধ রাখার জন্য মিয়ানমার সরকার তাদের ব্যবহার করে যাচ্ছে, যে কারণে তারা এতটা শক্তিশালী।
গত রোববার রাতে উখিয়ার মধুরছড়া ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আরসার শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। সে জায়গায় ভোরে ৪০-৪৫ জন আরসা সন্ত্রাসী পাহাড় থেকে সীমানার কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে ৪ নম্বর ক্যাম্পে আসে। ঘটনাস্থলে এসে ক্যাম্পে পাহারারত রোহিঙ্গা ইলিয়াছকে তারা গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাতে, পায়ে ও তলপেটে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এতে ইলিয়াস ঘটনাস্থলেই মারা যান।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে এপিবিএন সদস্যদেরও লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে সন্ত্রাসীরা।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে সংগঠিত এবং নাশকতা করার চেষ্টা করছে আরসা। মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায় আরসা সন্ত্রাসীরা। এতে তারা গুলি এবং কুপিয়ে তিন রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। আর গুরুতর আহত হয় সাতজন। হতাহতরা আরএসও সদস্য বলে জানা গেছে।
রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায় করতে আরসা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের দিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালায়। কিন্তু এটার কারণে নির্যাতনের তীব্রতায় নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা। সে কারণে আরসা রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব হয়ে উঠতে পারে নাই। বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, রোহিঙ্গাদের এ দুর্দশার জন্য আরসা দায়ী। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরসার একটা বড় গ্রুপ বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং যখন কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করেছে তখন তারা তাদের দমন করেছে। এর মধ্যে একজন ছিলেন মুহিব উল্লাহ। মুহিব উল্লাহ যখন রোহিঙ্গাদের নেতা হয়ে ওঠে বিশ্বের কাছে পরিচিত হন এবং আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্দোলন করেন তখন তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশ যখন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করে তখন রোহিঙ্গাদের রাজি করানোর জন্য মুহিব উল্লাহ সোর্স ছিল। ধীরে ধীরে মুহিব উল্লাহ প্রধান পাঁচ রোহিঙ্গা নেতার একজন হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গার মহাসমাবেশ করে তাক লাগিয়ে দেন এবং আনন্দে আত্মহারা করে দেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে লেগে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোকে। এসব কারণে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ভেঙে দেওয়ার জন্য মুহিব উল্লাহকে হত্যা করা হয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শত্রু হচ্ছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মির শত্রু হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। আবার মিয়ানমারের শত্রুও আরসা। মিয়ানমার নৌবাহিনী ঘোষণা দিয়ে বলছে আরকান আর্মি ও আরসা মিলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু মিয়ানমার আরাকানে আরকান আর্মি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সে কারণে আরসা ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে ড. রাহমান নাসির বলেন, দুই শতাধিক আরসার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার করাতেই আরসা দুর্বল হয়ে পড়েছে এমন যুক্তি হয়তো সঠিক নয়। এই চরমপন্থি দলে আরও অনেক সদস্য ও সমর্থক রয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে থাকে। আগুন নাশকতা এসব মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু ঘটনা আমরা সন্দেহ করি এগুলো নাশকতা। আমরা আরসা বলে কিছু পাইনি। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী গ্রুপ আছে। যারা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়াবে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রোহিঙ্গা ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা খিন মং বলেন, রোহিঙ্গাদের অধিকারের জন্য লড়াই করার দাবি করেছিল আরসা। তখন তাদের বিশ্বাস করেছিল রোহিঙ্গারা। কিন্তু এখন সাধারণ রোহিঙ্গারাও মনে করে আরসা মিয়ানমারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। যারা প্রত্যাবাসনের কথা বলছেন তাদের হত্যা করা হচ্ছে। তাই আরসার ওপর তাদের আর বিশ্বাস নেই।
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিধি বাড়াতে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক (ডিসি) ক্ষমতার দেশের সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) কর্তৃক প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি ২০২৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন ও বিউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হবে এবং অবশিষ্ট ৩ হাজার ৭৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বিউবোর নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাবে প্রস্তাবিত বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৬.১৮ টাকা।
বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১২ সালে বাগেরহাট জেলার রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে বিপিডিবি। জমিটি দু’টি ব্লকে বিভক্ত—ব্লক-এ ও ব্লক-বি। এর মধ্যে ব্লক-এ অংশে বাংলাদেশ-ভারত কয়লাভিত্তিক মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। ব্লক-বি অংশটি বর্তমানে বিপিডিবির অধীনে রয়েছে, যেখানে ভূমি উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বিউবো জানায়, ‘ব্লক-বি’-এর ৯১৮.৫০ একর জমির মধ্যে ৭৬.৬৩ একর গ্রিন বেল্ট উন্নয়নের জন্য, ৩২.৮৭ একর বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণে, ৯৪ একর নিচু জমি এবং উত্তর-পশ্চিম পাশের প্রায় ৩০ একর জমি লেক হিসেবে রয়েছে। ফলে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪৪২ মেগাওয়াট (ডিসি) সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ব্যবহারযোগ্য জমির পরিমাণ ৬৮৫ একর।
প্রাথমিকভাবে যৌথ উদ্যোগে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও, বিদ্যুতের বিশেষ বিধান আইন ২০১০ (সংশোধিত ২০২১) বাতিল হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া স্থগিত হয়। পরবর্তীতে মে ২০২৫-এ তৃতীয় পক্ষ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করে ৬৮৫ একর জমিতে এই গ্রিড-সংযুক্ত কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, জমিতে অতিরিক্ত ভূমি উন্নয়নের প্রয়োজন না থাকায় নির্মাণ ব্যয় কম হবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বিদ্যুতের ইউনিট খরচে। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
এদিকে গত ডিসেম্বরে ফেনীর সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (ইজিসিবি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
বিপিডিবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রামপাল প্রকল্পের তুলনায় সোনাগাজী প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি দক্ষ হলেও এর নির্মাণ ব্যয় ও ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। সোনাগাজী প্রকল্পের ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ শতাংশ, যা রামপাল প্রকল্পের ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ।
রামপাল প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াটে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫.৬৬ কোটি টাকা। সোনাগাজী প্রকল্পে এই খরচ ৬.২৭ কোটি টাকা। অবকাঠামো নির্মাণ খাতে সোনাগাজীতে ব্যয় রামপাল প্রকল্পের দ্বিগুণেরও বেশি। এ ছাড়া ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণেও সোনাগাজী প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।
ব্যয়বহুল নির্মাণ খরচের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্যের ওপর। রামপাল প্রকল্প থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬.১৮ টাকায় কেনার প্রস্তাব থাকলেও সোনাগাজী প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই ট্যারিফ ধরা হয়েছে ৮.৮৭ টাকা। অর্থাৎ সোনাগাজীর বিদ্যুতের দাম রামপালের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি। সোনাগাজী প্রকল্প থেকে বার্ষিক ৩৮১.৫৪ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। রামপালে এ লক্ষ্যমাত্রা ৩৫২.৪১ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী ডিজিটাল শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, আইসিটি খাতে অগ্রগতি ও জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নের ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান ২০২৩ অনুযায়ী, ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা যথাক্রমে ২৯ হাজার ২৫৭ মেগাওয়াট, ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট ও ৯৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। অথচ এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট (২৩ জুলাই ২০২৫)।
দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এলেও উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ প্রণয়ন করেছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ মোট উৎপাদনের তুলনায় এখনও খুবই সীমিত। ফলে এই খাতে দ্রুত বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা উইং-এর অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ বলেন, ‘রামপাল এলাকায় প্রস্তাবিত ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’
প্রকল্পটির প্রস্তাব ইতোমধ্যে ডিপিপি আকারে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
নূর আহমেদ বলেন, ‘সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। সেই তুলনায় ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পটি প্রায় দ্বিগুণ বড়, যা দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নির্দেশ করে। এই প্রকল্পের ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অন্য প্রকল্পের তুলনায় কম, যা এটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।’
ঢাকার আদালত থেকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে ফেরার পথে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি ‘পিচ্চি রাজা’ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ভ্যানের তালা খুলে পিচ্চি রাজাকে একটি প্রাইভেটকারে তুলে দিয়ে পালানোর সুযোগ করে দেন উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার বিশ্বাস। পরে ঘটনাটি ভিন্নখাতে নিতে আসামি পালিয়ে যাওয়ার ‘নাটক’ সাজানো হয়।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার এসব তথ্য জানান।
ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন এবং পলাতক আসামি পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক পিচ্চি রাজা ও অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলা জজকোর্ট থেকে ২৯ জন আসামিকে প্রিজন ভ্যানে করে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হচ্ছিল। পথে ঢাকার তাঁতিবাজার এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে ভ্যানটি থামানো হয়।
এ সময় প্রিজন ভ্যানের ইনচার্জ এএসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালকের কাছ থেকে ভ্যানের চাবি নিয়ে পিচ্চি রাজা ও আরেক হাজতি খাইরুল বাশারকে ভ্যান থেকে নামিয়ে আনেন। পরে খাইরুল বাশারকে পুনরায় ভ্যানে তোলা হলেও পিচ্চি রাজা ও প্রবীর কুমার আর ভ্যানে ওঠেননি।
পুলিশের ভাষ্য, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে অপেক্ষমাণ একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে উঠে পিচ্চি রাজা পালিয়ে যান। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রবীর কুমার ঘটনাস্থলে ফিরে এসে স্কোয়াড পার্টির সদস্যদের নিয়ে আসামি পালিয়ে যাওয়ার একটি সাজানো ঘটনা তৈরি করেন।
সাক্ষ্যপ্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় প্রিজন ভ্যানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব ও শাকিল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা। সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র কলা ভবনের সামনে এই মানববন্ধন হয়।
মানববন্ধনে সহযোগী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার বলেন, ‘আমরা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এরপরই দেখছি, গণমাধ্যমের ওপর বড় ধরনের হামলা শুরু হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কারের বদলে সেটাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। গণমাধ্যম ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
গত রোববারের (৪ অক্টোবর) হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভিডিও দেখলেই বোঝা যায়, কোনো কারণ ছাড়াই তাদের মারধর করা হয়েছে। সাংবাদিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতেই সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দুদিন আগে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা থেকেই গত রোববারের পরিস্থিতির সূত্রপাত।’ এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায় আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই।
সম্প্রতি একটি মামলার তদন্তে গিয়ে চুনারুঘাট উপজেলার রানীগাঁও বাজারে ইলিয়াস হোসেন এ বক্তব্য দেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে তাঁর ওই বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়।
ভিডিওতে এএসআই ইলিয়াস হোসাইনকে বলতে শোনা যায়, ‘কিছু রটে দেখেই তো কিছু বটে! কথা বুঝছ না? আমি যদি বলি, আমি পুলিশের দারোগা, আমি ঘুষ খাই না, আমি বায়তুল মোকাররমের ইমাম সাহেব, হইব নাকি? আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রানীগাঁও বাজারের ব্যবসায়ী নোমান মিয়ার করা একটি মামলার তদন্তে সেখানে গিয়েছিলেন এএসআই ইলিয়াস হোসাইন। ওই সময় উপস্থিত লোকজনের সামনে তিনি এ কথা বলেন।
চুনারুঘাট থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ভিডিওটি আমি দেখেছি। এটি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। কোন প্রেক্ষাপটে এ কথা বলেছেন, তাঁর (এএসআই ইলিয়াস হোসাইন) সঙ্গে বসে বিষয়টি জানার চেষ্টা করব।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, এএসআই ইলিয়াস হোসাইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার তদন্তে ঘুষ দাবির অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, ঘুষ ছাড়া তিনি মামলার তদন্তে আগ্রহ দেখান না।
এএসআই ইলিয়াস হোসাইনের বিরুদ্ধে উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের টেকারঘাট গ্রামে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে করা একটি মামলার তদন্তের সময়ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ, তিনি মামলার বিবাদীপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে বাদীকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন এবং ভয়ভীতি দেখান।
স্থানীয় লোকজনের আরও অভিযোগ, চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম তাঁর এলাকার ‘বড় ভাই’—এমন পরিচয় দিয়ে এএসআই ইলিয়াস হোসাইন থানায় ও তদন্তকাজে প্রভাব খাটান। তবে এ অভিযোগের সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে জানতে এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’ এরপর তিনি মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
চুনারুঘাট থানার ওসি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভিডিওটি আমি দেখেছি। এটি যাচাই করে দেখা হচ্ছে। কোন প্রেক্ষাপটে এ কথা বলেছেন, তাঁর (এএসআই ইলিয়াস হোসাইন) সঙ্গে বসে বিষয়টি জানার চেষ্টা করব।’
বরিশালে ফেনসিডিলের মামলায় দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার (৫ অক্টোবর) বরিশালের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. মিল্টন হোসেন আসামিদের অনুপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরশিবা পণ্ডিতবাড়ির বাসিন্দা আজাহার আলী পণ্ডিতের ছেলে মো. শাহাদাৎ হোসেন পণ্ডিত (৪৭) এবং একই উপজেলার চরকপালবেড়া এলাকার আব্দুল বারেক হাওলাদারের ছেলে জলিল হাওলাদার (৪৬)।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ বলেন, ‘২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন র্যাব-৮-এর একটি দল নগরের নতুনবাজার এলাকায় তল্লাশি চৌকি স্থাপন করে। সেই সময় ২৫ বোতল ফেনসিডিলসহ শাহাদাৎ ও জলিলকে আটক করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী নগরের উত্তর আলেকান্দা এলাকার ভাড়া বাসা থেকে আরও ১৮৪ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।’
এ ঘটনায় তৎকালীন র্যাবের ডিএডি মশিউর রহমান বাদী হয়ে দুজনকে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে একই বছরের ৩ নভেম্বর কোতোয়ালি মডেল থানার তৎকালীন এসআই আব্দুর রহমান মুকুল দুজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। পাঁচজনের সাক্ষ্য-গ্রহণ শেষে দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও পলাতক আসামি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় বীজতলা তৈরি, চারার পরিচর্যা ও পানি দেওয়া। কেউ চারা তুলছেন, কেউ ক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত চারা গাড়িতে তুলে দিতে। শীতের আগমুহূর্তে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সমেশপুরে এখন চলছে সবজির চারা বিক্রির ব্যস্ত মৌসুম।
ময়নামতি রানীর বাংলো পেরোলেই চোখে পড়ে এই কর্মব্যস্ততা। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে এ এলাকায় সবজির চারা উৎপাদন হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে সমেশপুরের চারা। চলতি মৌসুমে প্রায় ১৫ থেকে ২০ একর জমিতে উৎপাদিত চারা বিক্রি করে ৫০ কোটি টাকার বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন চাষিরা।
ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মরিচ, শিম, লাউ, কুমড়া ও ব্রকলিসহ অন্তত ২৩ ধরনের সবজির চারা উৎপাদন হচ্ছে এখানে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পলিথিনে ঢাকা ছোট ছোট তাবুর ভেতর মাচার ওপর সারিবদ্ধ ট্রেতে কোকোপিটে বেড়ে উঠছে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা চারা কিনে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন।
চারা উৎপাদনকারী আবদুল কুদ্দুস বলেন, ১৯৬৬ সাল থেকে সমেশপুরে সবজির চারা উৎপাদন হচ্ছে। এখানকার চারা দেশের অন্তত ৩৪টি জেলায় যায়। গ্রামের প্রায় দেড়শ পরিবার চারা উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
আরেক চারা উৎপাদনকারী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে অন্তত ৫০ কোটি টাকার চারা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চারা উৎপাদন ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় কাটছে।
চাষি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বুড়িচংয়ে ধানের পর চারা উৎপাদন কৃষকদের অন্যতম বড় আয়ের উৎস। তবে কৃষি অফিস থেকে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না। ভালো বীজ ও মাটি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চাষিরা জানান, মূল মৌসুমে সেচসংকট দেখা দিয়েছে। আবার বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে চারা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানসম্মত বীজ ও সার সংগ্রহ এবং মাটি পরীক্ষা নিয়েও নানা জটিলতা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. আফরিন আক্তার বলেন, চারা উৎপাদনকারীদের সমস্যাগুলো শুনেছেন। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সমেশপুরের চারা উৎপাদন আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের সবজি উৎপাদনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এ জনপদ।
প্রবাসী স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বিষপান করেছেন ঝুমুর খানম সেতু (২৭) নামে এক গৃহবধূ। আশঙ্কাজনক অবস্থায় সোমবার (৫ অক্টোবর) তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ঝুমুর আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের মেয়ে। স্থানীয় ও তার পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে তিনি বিষপান করেন। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ওই রাতেই বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে তার অবস্থার অবনতি হলে সোমবার বেলা ১১টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরে স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
ঝুমুরের বাবা করিম খান জানান, প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে গৌরনদী পৌর এলাকার চরগাধাতলী এলাকার মৃত হারুন কাজীর ছেলে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হয়। তাদের চার বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
করিম খানের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তার জামাতা, মেয়ের শাশুড়ি, ননদ ও ননদের স্বামী বিভিন্ন কারণে ঝুমুরকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছেন। একপর্যায়ে স্বামীর বাড়ি থেকে ঝুমুর ও তার মেয়েকে বের করে দেওয়া হয়। পরে তারা বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেওয়া, প্রায় ৫০০ বরযাত্রীকে যথাযথভাবে আপ্যায়ন করতে না পারা এবং ঝুমুর দেখতে সুন্দরী না হওয়ার মতো বিষয়কে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাকে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে।
ঝুমুরের স্বামী শাহারিয়া কাজী কাজের সুবাদে কুয়েতে অবস্থান করছেন। করিম খানের অভিযোগ, স্বামীর মা রুনু বেগম, বোন নাজমিন বেগম, শারমিন, রিয়া এবং নাজমিনের স্বামী সাইদুল হাওলাদারের প্ররোচনায় ঝুমুরের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
ঘটনার রাতে শাহারিয়া ভিডিও কলে ঝুমুরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে তাকে বিষপান করে মারা যেতে বলেন—এমন অভিযোগ করেছেন ঝুমুরের বাবা।
করিম খানের ভাষ্য, স্বামীর কথিত মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরিবারের সদস্যদের অজান্তে ঝুমুর বিষপান করেন। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদ খান বলেন, এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে শাহারিয়া কাজী শাহাবুদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ সফররত ওমানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সোমবার (৫ অক্টোবর) মৎস্য অধিদপ্তর পরিদর্শন করেছেন এবং মহাপরিচালকের সাথে এক দ্বিপাক্ষিক সভায় অংশগ্রহণ করেছেন। সভায় ওমানের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের মৎস্য খাতের বিদ্যমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও সার্বিক কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ শেষে বাংলাদেশ থেকে মৎস্য খাতে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল নিয়োগের ব্যাপারে তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সভায় মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু-ইকোনমি উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক ড. মোহাম্মদ শরিফুল আজম পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে অধিদপ্তরের অধীনে থাকা ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট, প্রশিক্ষণ কারিকুলাম, অবকাঠামো এবং বিদ্যমান জনবলের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। পাশাপাশি চট্টগ্রামস্থ 'বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ একাডেমি'র প্রশিক্ষণ অবকাঠামো ও কোর্স কারিকুলাম সম্পর্কেও ওমানের প্রতিনিধিদলকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ খালেদ কনক বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে মৎস্য খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করছে এবং তারা সুনামের সাথে বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। তিনি ওমানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষিত জেলে বা ডেকহ্যান্ড, স্কীপার, মৎস্য প্রকৌশলী এবং অ্যাকুয়াকালচার বিষয়ে বিশেষায়িত ডিপ্লোমাধারীদের ওমানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
এছাড়াও, তিনি প্রতিনিধিদলকে দেশের মৎস্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেরিন ফিশারিজ একাডেমি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ক্যাডেট ও ডিপ্লোমাধারীদের দক্ষতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
সভা শেষে ওমানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের মৎস্য খাতের কারিগরি মান এবং জনবলের দক্ষতার বিষয়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।
নওগাঁর মহাদেবপুরে অ্যাম্বুলেন্সের ধাক্কায় নীরেন চন্দ্র বর্মন ওরফে হীরেন (৪৫) নামে এক ভ্যানচালক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পরেশ চন্দ্র বর্মন (৫৮) নামে ভ্যানের এক যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার নওগাঁ-নজিপুর আঞ্চলিক সড়কের এনায়েতপুর গ্রামের মদিনা পেট্রোল পাম্প এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
নিহত নীরেন চন্দ্র বর্মন মহাদেবপুর উপজেলার মগরইল গ্রামের মৃত ধীরেন চন্দ্র বর্মনের ছেলে। আহত পরেশ চন্দ্র বর্মন একই গ্রামের মৃত অধীর চন্দ্র বর্মনের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে হীরেন ভ্যানে করে পরেশকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় নজিপুরের দিক থেকে আসা একটি অজ্ঞাত অ্যাম্বুলেন্স পেছন থেকে ভ্যানটিকে ধাক্কা দেয়। এতে চালক ও যাত্রী সড়কে পড়ে গুরুতর আহত হন।
স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নীরেন চন্দ্র বর্মনকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত পরেশকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মহাদেবপুর থানার ওসি ওমর ফারুক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জেলার মির্জাপুরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত ও বাসি খাবার সংরক্ষণ করে বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধে পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে মোট ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সোমবার দুপুরে উপজেলার সোহাগপুর ও গোড়াই এলাকায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের টাঙ্গাইল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেলের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান সূত্রে জানা যায়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত এবং বাসি খাবার সংরক্ষণ করে বিক্রির অভিযোগে সোহাগপুর বিসমিল্লাহ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণের দায়ে গোড়াই এলাকার মোল্লা ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল কেয়ারকে ৫ হাজার টাকা এবং গোড়াই ওয়াল সেতুর নিচে অতিরিক্ত দামে ফল বিক্রির অভিযোগে তিন ফল বিক্রেতাকে মোট ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের টাঙ্গাইল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল জানান, অভিযানে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
প্যাকেটে ফুটো, কোথাও দুধ জমে দইয়ের মতো—এমন অবস্থায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির দুধ পান করে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষার্থী। সোমবার দুপুরে দুধ পান করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই কয়েকজন শিক্ষার্থী পেট ব্যথা, মাথা ঘোরা ও খিচুনিসহ বিভিন্ন উপসর্গে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে দুধ পরীক্ষা করা হবে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের ভাষ্য, গতকাল সোমবার দুপুরে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে রংপুর ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টস লিমিটেডের ‘আরডি’ ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত দুধ বিতরণ করা হচ্ছিল। এ সময় কয়েকটি প্যাকেটে ফুটো দেখতে পান শিক্ষকরা। আবার কিছু প্যাকেটের দুধ জমাট বেঁধে দইয়ের মতো হয়ে থাকতে দেখা যায়।
বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান শিক্ষক ও স্কুল ফিডিংয়ের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেনকে জানানো হয়। শিক্ষকরা দুধ বিতরণ না করার কথাও বলেন। দুধের প্যাকেটের ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে ওই কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়।
পরে খবর পেয়ে বিদ্যালয়ে আসেন মনোয়ার হোসেন। শিক্ষকরা দুধ নিয়ে আপত্তি জানালেও তিনি নিজে দুধ পান করে পরীক্ষা করেন এবং এতে কোনো সমস্যা নেই বলে জানান। এরপর শিক্ষার্থীদের দুধ পান করতে বলা হয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, দুধ পান করার প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের কারও পেট ব্যথা, কারও মাথা ঘোরা, আবার কারও খিচুনির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। দ্রুত তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এরপর একে একে আরও শিক্ষার্থী হাসপাতালে আসে।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনির হোসেন বলে, ‘দুধ খাওয়ার পর থেকেই আমার মাথা ও পেট ব্যথা শুরু হয়। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। পরে আমাকে হাসপাতালে আনা হয়।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষক তসলিমা খাতুন বলেন, ‘দুধ বিতরণের সময়ই কয়েকটি প্যাকেটে ফুটো এবং কিছু দুধ দইয়ের মতো দেখতে পান তারা। বিষয়টি প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছিল। দুধ বিতরণ না করার জন্যও বলা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এসে নিজে দুধ পান করে শিক্ষার্থীদেরও তা পান করতে বলেন। এরপরই শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হতে শুরু করে।’
দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. বিমল দেবনাথ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৬-১৭ জন শিক্ষার্থী হাসপাতালে এসেছে। আমরা তাদের চিকিৎসা দিচ্ছি। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল। অনেকেই ভালো আছে। তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’
ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত সাহা। তিনি অসুস্থ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার খোঁজ নেন।
ইউএনও বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি হাসপাতালে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা দেখেছেন। দুধের নমুনা পরীক্ষা করতে ঢাকায় পাঠানো হবে। পরীক্ষায় কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মতো শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি কর্মসূচিতে বিতরণের আগেই দুধের প্যাকেটে ত্রুটি চোখে পড়ার পরও কেন তা শিক্ষার্থীদের পান করতে দেওয়া হলো—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। দুধের পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের অসুস্থতার প্রকৃত কারণ এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি ছিল কি না, তা আরও স্পষ্ট হবে।
শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎও নির্মাণ করেন। সেই শিক্ষকদের মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানেই দেশজুড়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬। সোমবার (৫ অক্টোবর) মাগুরা থেকে মৌলভীবাজার, গাজীপুর থেকে পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া থেকে ময়মনসিংহ—বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় র্যালি, আলোচনা সভা, গুণী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সম্মাননা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়।
এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়া’। ১৯৬৬ সালে আইএলও ও ইউনেসকোর শিক্ষকদের মর্যাদা-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সুপারিশ গ্রহণের ৬০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখেই এবারের আয়োজন। বাংলাদেশেও ৫ অক্টোবর দিবসটি এখন নিয়মিত জাতীয় কর্মসূচির অংশ।
মাগুরা: জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বর থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোতাকব্বীর আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মামুনুর রশীদ। সভায় শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
কুমিল্লার মুরাদনগর: উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে র্যালি বের হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে নজরুল মিলনায়তনে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষকদের শুধু পাঠ্যজ্ঞান নয়, নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির কাজও করতে হয়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মৌলভীবাজার: জেলা শিক্ষা অফিসের আয়োজনে এম. সাইফুর রহমান অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা ও বর্ণাঢ্য আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, শিক্ষকরা সমাজ পরিবর্তনের মূল কারিগর। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া: আলোচনা সভার পাশাপাশি পাঁচজন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়। কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের এসব শিক্ষকের দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। এর আগে উপজেলা এলাকায় র্যালি হয়।
গাজীপুরের শ্রীপুর: বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ৩২ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সম্মাননা ও উপহার সামগ্রী দেওয়া হয়। আয়োজকেরা তাদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবদান স্মরণ করেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের যেন মামলা, হামলা ও হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়েও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রায় ৭০০ শিক্ষক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
গাজীপুরের কাপাসিয়া: উপজেলা পরিষদ চত্বরে শোভাযাত্রা শেষে আলোচনা সভা হয়। বক্তারা জানান, জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক সম্মাননার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ শিক্ষকসমাজের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক। এবারের নীতিমালা অনুযায়ী জাতীয়ভাবে ১০০ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার কথা জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া: চৌরাস্তা বাজারের তেতুলতলা থেকে র্যালি বের হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে সহস্রাধিক শিক্ষক অংশ নেন। পরে মুক্তমঞ্চে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, শিক্ষকরাই জাতি গঠনের কারিগর। শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দুইজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে সম্মাননাও দেওয়া হয়।
পঞ্চগড়ের বোদা: উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে র্যালি বের হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভায় শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নীলফামারী: জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে র্যালি বের হয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মানসম্মত শিক্ষার প্রধান কারিগর শিক্ষক। তাদের সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মপরিবেশ উন্নয়ন জরুরি। অনুষ্ঠানে গুণী ও প্রবীণ শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম এবং নীলফামারী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আফজালুল হক নান্নুকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা: উপজেলা চত্বর থেকে র্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে উপজেলা অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভায় ইউএনও আমিরুল আরাফাত বলেন, মেধাভিত্তিক ও আদর্শ জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা মুখ্য। শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও: উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে র্যালি বের হয়ে পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে মওলানা সামছুল হুদা পাঁচবাগী হলরুমে আলোচনা সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আইসিটিনির্ভর কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শ্রেণিকক্ষে পাঠপরিকল্পনা ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরির ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
দেশের এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে—শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু পাঠ্যক্রম বা প্রযুক্তির উন্নয়নে সম্ভব নয়; শিক্ষকের মর্যাদা, নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আয়োজন তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শিক্ষকতার মর্যাদা পুনর্বিবেচনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে শিক্ষকদের আরও শক্তিশালী ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রত্যয়েরও প্রকাশ।
কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় বীজতলা তৈরি, চারার পরিচর্যা ও পানি দেওয়া। কেউ চারা তুলছেন, কেউ ক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত চারা গাড়িতে তুলে দিতে। শীতের আগমুহূর্তে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সমেশপুরে এখন চলছে সবজির চারা বিক্রির ব্যস্ত মৌসুম।
ময়নামতি রানীর বাংলো পেরোলেই চোখে পড়ে এই কর্মব্যস্ততা। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে এ এলাকায় সবজির চারা উৎপাদন হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে সমেশপুরের চারা। চলতি মৌসুমে প্রায় ১৫ থেকে ২০ একর জমিতে উৎপাদিত চারা বিক্রি করে ৫০ কোটি টাকার বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন চাষিরা।
ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মরিচ, শিম, লাউ, কুমড়া ও ব্রকলিসহ অন্তত ২৩ ধরনের সবজির চারা উৎপাদন হচ্ছে এখানে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পলিথিনে ঢাকা ছোট ছোট তাবুর ভেতর মাচার ওপর সারিবদ্ধ ট্রেতে কোকোপিটে বেড়ে উঠছে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা চারা কিনে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন।
চারা উৎপাদনকারী আবদুল কুদ্দুস বলেন, ১৯৬৬ সাল থেকে সমেশপুরে সবজির চারা উৎপাদন হচ্ছে। এখানকার চারা দেশের অন্তত ৩৪টি জেলায় যায়। গ্রামের প্রায় দেড়শ পরিবার চারা উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
আরেক চারা উৎপাদনকারী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে অন্তত ৫০ কোটি টাকার চারা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চারা উৎপাদন ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় কাটছে।
চাষি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বুড়িচংয়ে ধানের পর চারা উৎপাদন কৃষকদের অন্যতম বড় আয়ের উৎস। তবে কৃষি অফিস থেকে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না। ভালো বীজ ও মাটি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চাষিরা জানান, মূল মৌসুমে সেচসংকট দেখা দিয়েছে। আবার বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে চারা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানসম্মত বীজ ও সার সংগ্রহ এবং মাটি পরীক্ষা নিয়েও নানা জটিলতা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. আফরিন আক্তার বলেন, চারা উৎপাদনকারীদের সমস্যাগুলো শুনেছেন। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সমেশপুরের চারা উৎপাদন আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের সবজি উৎপাদনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এ জনপদ।