মিয়ানমারের চরমপন্থি সশস্ত্র সংগঠন আরসার আগের নাম ছিল আল ইয়াকিন বা ইসলামি সংগঠন। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে কাজ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ২০১৩ সালের দিকে সংগঠনের নাম পাল্টে রাখা হয় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা, যদিও দলের একাংশ এখনো আল ইয়াকিন নামেই পুরোনো সংগঠনকে আকড়ে ধরে আছে। আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি সেসময়ে হন স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কমান্ডার ইন চিফ। এই আতাউল্লাহর জন্ম সৌদি আরবে, তার বাবা-মা আরাকান থেকে গিয়ে সৌদি আরবে স্থায়ী হন। কিন্তু জন্ম সৌদি আরবে হলেও আতাউল্লাহ পরে পাকিস্তানের করাচিতে এসে বসবাস করতেন।
রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায় করতে ঠিক কবে মিয়ানমারে তিনি ফিরে আসেন, তা জানা যায় না। তবে তা ২০১৩ সালের আগেই অর্থাৎ আল ইয়াকিন থেকে আরসার যাত্রা শুরুর আগেই হয়েছে, তা নিশ্চিত। সংগঠনটি সশস্ত্র হয়ে উঠেছে, তা প্রথম বোঝা যায় ২০১৫-১৬ সালের দিকে। লক্ষ্য ছিল, মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত আরাকান প্রদেশ দখল। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি মিয়ানমারের থানায় হামলা, পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনার পর সংগঠনটির বিরুদ্ধে প্রথম মনোযোগ দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তবে ওই বছরেই আগস্টে তার নির্দেশে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে আরকান দখল ও অস্ত্র লুট করার জন্য আবার হামলা চালায় আরসা। এ ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী আরসা নির্মূলের উদ্দেশে আরকান প্রদেশে হামলা শুরু করে। তখন উত্তপ্ত হয়ে পড়ে মিয়ানমারে মুসলমানদের গ্রামগুলোর পরিস্থিতি। ওই দেশের সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে চড়াও হয়ে অভিযান ও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হামলা ও গণধর্ষণের ঘটনা শুরুর পর নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে তাদের তখন আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ সরকার। আর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আরসার সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য না থাকার সুযোগে এসব রোহিঙ্গার সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশে চলে আসে আরসার কিছু সদস্য আর সমর্থকও।
উদ্দেশ্য তাদের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করা হলেও অস্ত্র তৈরি ও সংগ্রহ, বাহিনীর জন্য সদস্য সংগ্রহ, সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া ইত্যাদি কাজে তারা তখন থেকেই গোপনে বাংলাদেশের পাহাড়ি নির্জন এলাকাগুলো ব্যবহার শুরু করে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে তারা সেগুলোতে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সর্দার বা মাঝিদের করায়ত্ত করা বা ভয় দেখানো দিয়েই এর শুরু। একই সঙ্গে নিজেদের অর্থভাণ্ডার ঠিক রাখতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে এদেশে মাদক চোরাচালান আরও বাড়িয়ে দেয়।
শুরুতে আরসা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকলেও দিনের পর দিন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরস্পরের মধ্যে হামলা, গুলি, হত্যার ঘটনা বাড়তে থাকায় এবং বিপুল পরিমাণ মাদকসহ রোহিঙ্গা ও তাদের প্ররোচনায় স্থানীয়দের আটক বা গ্রেপ্তাদের মধ্য দিয়ে এই চরমপন্থি সংগঠন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র্যাব, এপিবিএন আরসা দমনে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে মাঝেমধ্যেই। তার পরও তাদের গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়া এবং বেশির ভাগ রোহিঙ্গা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িত হতে না চাওয়ায় আরসার নেতাসহ সদস্যরা বরাবরই আছে উৎকণ্ঠায়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরসা ছাড়াও আছে আরও কিছু সশস্ত্র গ্রুপ। তবে তারা পরস্পর যেন পরস্পরের শত্রু। আরাকানে যে বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপ আরাকানের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াই করে যাচ্ছে, আরাকান আর্মি, ওদের সঙ্গেও এসব গ্রুপের শত্রুতা রয়েছে। আরাকান আর্মি সাধারণভাবে সব আরাকানির জন্যে স্বাধীন আরাকান চায়, কিন্তু আরসাকে ওরা চিহ্নিত করে মুসলিম সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে। সব মিলিয়ে অস্থির হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিবির।
আরসার শীর্ষ নেতা অলি আকিজ দীর্ঘদিন মিয়ানমারে আত্মগোপনে থাকলেও গত ১৯ মে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিরেছেন। আরসার শীর্ষ কমান্ডার আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি এবং সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ওস্তাদ খালেদের নির্দেশে ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গ্রুপ আরসার প্রশিক্ষণ। অস্ত্র তৈরি, আত্মগোপন, মিটিংসহ নানা কর্মকাণ্ড সেখানে সংগঠিত হতো। গত রোববার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে ক্যাম্প-৪-এ গোপন বৈঠক থেকে আকিজসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি এলজি, একটি ওয়ানশুটার গান, ১০ রাউন্ড কার্তুজ, দুই কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য, তিনটি মোবাইল এবং নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা জব্দ করা হয়।
র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ১১২ জনের ওপরে আরসার ভিন্ন পদবিধারী নেতা গ্রেপ্তার করেছি। গত রোববারের আরসার শীর্ষ নেতা আকিজসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করি। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
২০১৭ সালে সীমান্ত পার হয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসে ক্যাম্প-৫-এ সপরিবারে বসবাস শুরু করেন মৌলভী আকিজ। পরে আরসার হয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর ক্যাম্প-৫-এ আরসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। নেটওয়ার্ক গ্রুপে কাজ করতেন। ক্যাম্পের বিভিন্ন তথ্য আরসা কমান্ডারদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এভাবে শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছান। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করায় ওস্তাদ খালেদের নির্দেশে রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মহিবুল্লাহকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন আকিজ। তা ছাড়া মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে ক্যাম্পে সেভেন মার্ডারে সরাসরি অংশ নেন। তাদের নেতা-কর্মী আটক হলে কিছুটা দুর্বল হয়ে যায় কিন্তু আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশাল এই জনগোষ্ঠীতে আরসা, আল-ইয়াকিনসহ অন্তত ১৫টি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সক্রিয়। ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ছয় বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে। মামলা হয়েছে পাঁচ হাজারের অধিক। এসব মামলার বেশির ভাগই হয়েছে মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে।
রোহিঙ্গা নেতা ড. জোবায়ের বলেন, আরসা রোহিঙ্গা ক্যাম্প দখল করে রাজত্ব কায়েম করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত তাদের দুই শতাধিক নেতা-কর্মী আটক হয়েছেন। আটক করলেও তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তার কারণ তাদের রোহিঙ্গা সরকার মদদ দিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যাবাসন বন্ধ রাখার জন্য মিয়ানমার সরকার তাদের ব্যবহার করে যাচ্ছে, যে কারণে তারা এতটা শক্তিশালী।
গত রোববার রাতে উখিয়ার মধুরছড়া ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আরসার শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। সে জায়গায় ভোরে ৪০-৪৫ জন আরসা সন্ত্রাসী পাহাড় থেকে সীমানার কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে ৪ নম্বর ক্যাম্পে আসে। ঘটনাস্থলে এসে ক্যাম্পে পাহারারত রোহিঙ্গা ইলিয়াছকে তারা গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাতে, পায়ে ও তলপেটে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এতে ইলিয়াস ঘটনাস্থলেই মারা যান।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে এপিবিএন সদস্যদেরও লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে সন্ত্রাসীরা।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে সংগঠিত এবং নাশকতা করার চেষ্টা করছে আরসা। মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায় আরসা সন্ত্রাসীরা। এতে তারা গুলি এবং কুপিয়ে তিন রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। আর গুরুতর আহত হয় সাতজন। হতাহতরা আরএসও সদস্য বলে জানা গেছে।
রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায় করতে আরসা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের দিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালায়। কিন্তু এটার কারণে নির্যাতনের তীব্রতায় নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা। সে কারণে আরসা রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব হয়ে উঠতে পারে নাই। বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, রোহিঙ্গাদের এ দুর্দশার জন্য আরসা দায়ী। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরসার একটা বড় গ্রুপ বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং যখন কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করেছে তখন তারা তাদের দমন করেছে। এর মধ্যে একজন ছিলেন মুহিব উল্লাহ। মুহিব উল্লাহ যখন রোহিঙ্গাদের নেতা হয়ে ওঠে বিশ্বের কাছে পরিচিত হন এবং আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্দোলন করেন তখন তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশ যখন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করে তখন রোহিঙ্গাদের রাজি করানোর জন্য মুহিব উল্লাহ সোর্স ছিল। ধীরে ধীরে মুহিব উল্লাহ প্রধান পাঁচ রোহিঙ্গা নেতার একজন হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গার মহাসমাবেশ করে তাক লাগিয়ে দেন এবং আনন্দে আত্মহারা করে দেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে লেগে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোকে। এসব কারণে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ভেঙে দেওয়ার জন্য মুহিব উল্লাহকে হত্যা করা হয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শত্রু হচ্ছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মির শত্রু হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। আবার মিয়ানমারের শত্রুও আরসা। মিয়ানমার নৌবাহিনী ঘোষণা দিয়ে বলছে আরকান আর্মি ও আরসা মিলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু মিয়ানমার আরাকানে আরকান আর্মি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সে কারণে আরসা ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে ড. রাহমান নাসির বলেন, দুই শতাধিক আরসার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার করাতেই আরসা দুর্বল হয়ে পড়েছে এমন যুক্তি হয়তো সঠিক নয়। এই চরমপন্থি দলে আরও অনেক সদস্য ও সমর্থক রয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে থাকে। আগুন নাশকতা এসব মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু ঘটনা আমরা সন্দেহ করি এগুলো নাশকতা। আমরা আরসা বলে কিছু পাইনি। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী গ্রুপ আছে। যারা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়াবে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রোহিঙ্গা ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা খিন মং বলেন, রোহিঙ্গাদের অধিকারের জন্য লড়াই করার দাবি করেছিল আরসা। তখন তাদের বিশ্বাস করেছিল রোহিঙ্গারা। কিন্তু এখন সাধারণ রোহিঙ্গারাও মনে করে আরসা মিয়ানমারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। যারা প্রত্যাবাসনের কথা বলছেন তাদের হত্যা করা হচ্ছে। তাই আরসার ওপর তাদের আর বিশ্বাস নেই।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক (ডিজি) করা হয়েছে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদকে। পাশাপাশি শিল্প পুলিশের প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. ইসরায়েল হাওলাদার।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তৌছিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন ছয় কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এসআরবির মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশকে পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি, হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদকে এসআরবির মহাপরিচালক এবং পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি মো. সায়েদুর রহমানকে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিনকে পুলিশ টেলিকম সংস্থায়, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি মীর আশরাফ আলীকে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি পদে বদলি করা হয়েছে।
আশুলিয়া ও সাভারের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক পরিচয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন।
তিনি বলেন, বোরকা ও হেলমেট পরে কারা শান্ত পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা করছে, তা শনাক্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত আছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন এসপি শামীমা পারভীন। তিনি বলেন, গত দুই দিন ধরে শ্রমিক পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি পোশাকশিল্প ধ্বংস ও দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
শামীমা পারভীন বলেন, আপনারা জানেন, গত ১৭ বছর ধরে আমরা হেলমেট বাহিনীর সঙ্গে পরিচিত। একইভাবে, বোরকা বা হিজাব ব্যবহার করে যারা অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের সম্পর্কেও আমরা অবগত। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে।
এসপি বলেন, তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মূলত কোনো দাবি-দাওয়া ছিল না। যেকোনো দাবির একটি সূচনা ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকে। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়। কিন্তু কোনো ধরনের প্রক্রিয়া ছাড়াই দুই দিন আগে হঠাৎ শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়।
‘ঢাকা জেলার সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত। ইপিজেডেও পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। আশুলিয়া ও সাভারের প্রতিটি কারখানা খোলা রয়েছে এবং শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছেন। হঠাৎ করেই শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হতে দেখা গেছে। তবে এরা প্রকৃত শ্রমিক নন। শ্রমিক পরিচয় ব্যবহার করে বাইরে থেকে আসা কিছু ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে’, বলেন তিনি।
এসপি আরও বলেন, বোরকা ও হেলমেট বাহিনীর বিষয়ে আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। কারা তাদের ইন্ধন দিচ্ছে, অর্থের জোগান দিচ্ছে এবং বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, সে বিষয়েও আমাদের কাছে তথ্য আছে। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা অবশ্যই এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করব।
শিক্ষার্থীদের দেশীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা বিকাশে এক যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নগর ভবনে উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এ সমঝোতা স্মারকের আওতায় ডিএসসিসি এলাকার সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ৩য় থেকে ১০ম শ্রেণি বা সমমানের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরসহ ঢাকার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ পাবে। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ তারিখে প্রথম পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুস সালাম বলেন, “এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হলো। আমরা চাই, ইতিহাস ও সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমিক, মানবিক ও সংস্কৃতিমনস্ক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এই উদ্যোগে সাড়া দেওয়ায় আমি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।।”
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম বলেন, “পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নান্দনিকতা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।”
স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, পরিবহন এবং খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে সংস্থাটি। অন্যদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে গাইডেড ট্যুর, প্রদর্শনী পরিদর্শন, কুইজ, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ অন্যান্য শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
শিক্ষার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনগ্রসর পরিবার ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রাথমিক অবস্থায় এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের তারিখ থেকে এক বছর কার্যকর থাকবে এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে পরবর্তীতে মেয়াদ ও পরিধি বাড়ানো হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মোঃ খয়বর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাবসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জনই ঢাকা বিভাগের।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও রোগটির উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ২৬৩ জনের মৃত্যু হল। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১ হাজার ১৫৮ জন। বাকিরা মারা যাওয়া ১০৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ৫ জন এবং বরিশাল বিভাগে একজন মারা গেছে।
এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৫১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপর সিলেট বিভাগে ২০৩ জন, চট্টগ্রামে ১১২, রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহে ৮৯, বরিশালে ৬৯, খুলনায় ৫৭ ও রংপুর বিভাগে ১৮ জন মারা গেছে।
সরকারের হাম বিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ১ হাজার ৩১৮ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এ সময় হাম শনাক্ত হয়েছে ৮২ জনের। হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৬০ জন।
এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৮৯ জন, চট্টগ্রামে ২৩৬, সিলেটে ১৪০, বরিশালে ১৩২, খুলনায় ৯৪, ময়মনসিংহে ১০০, রংপুরে ৩৫ ও রাজশাহীতে ৩৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৪২৮ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫২ জন। আর হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজারের বেশি মানুষের।
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে মাদক মামলার এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলায় বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা সিয়াম হাসান অক্ষয়সহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন নিকলী সদরের পুকুরপাড় গ্রামের ফেরদৌস মিয়ার ছেলে মো. শাহরুখ (২৭) ও একই গ্রামের মিয়া হোসেনের ছেলে মো. হিমেল (২৭)।
সিয়াম হাসান অক্ষয় খালিসাহাটি গ্রামের বাহার উদ্দিন বাচ্চুর ছেলে। তিনি নিকলী উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোরে নিকলী সদরের বড় তালাবপাড় গ্রামে শ্বশুরবাড়ি থেকে অক্ষয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। শাহরুখ ও হিমেলকে তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অক্ষয়ের নেতৃত্বে শতাধিক কিশোরের একটি দল এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। এই দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার রাত ১০টার দিকে নিকলী সদরের টিএন্ডটি মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাকিল (২২) নামের এক যুবককে ৬ পিস ইয়াবা, ইয়াবা বিক্রির নগদ ৩ হাজার টাকাসহ আটক করে পুলিশ। এ খবর পেয়ে অক্ষয় ও তার সহযোগীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে আটক শাকিলকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।
এ ঘটনায় নিকলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তুষার বাদী হয়ে অক্ষয়সহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন।
নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘মাদক, ইভটিজিং ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে। এ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
সীতাকুণ্ডে লরির ধাক্কায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিহত, এবং আরও এক শিক্ষার্থীসহ আহত ২০ যাত্রী । এই ঘটনায় মহাসড়ক ও রেললাইন অবরোধ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিনিবাসে লরির ধাক্কায় মাইশা (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানাসহ মিনিবাসের ১০ যাত্রী আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেললাইন অবরোধ করেছেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত মাইশা মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া এলাকার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন ও সালমা আক্তারের মেয়ে। আহত শিক্ষার্থী রাজিয়া ও মাইশা আক্তার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা মনির চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনায় তাদের দুই শিক্ষার্থী মাইশা ও রাজিয়া আহত হন। দুজনই ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। আহত মাইশাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেললাইন অবরোধ করেছে। এতে শত শত বাস, ট্রাক আটকা পড়ে এবং ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় ।
বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ঢাকামুখী একটি কনটেইনারবাহী লরি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট এলাকা অতিক্রম করার সময় সামনে থাকা একটি প্রাইভেটকার হঠাৎ উল্টো দিকে মোড় নেয়। এ সময় প্রাইভেটকারটিকে বাঁচাতে গিয়ে দ্রুতগতির লরিটি মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকামুখী ৮ নম্বর পরিবহনের একটি মিনিবাসকে একপাস থেকে ধাক্কা দেয়। এতে লরিটি মহাসড়কে উল্টে যায়।
দুর্ঘটনায় বাস থেকে নামা দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী চাপা পড়েন এবং মিনি বাসের ভেতরে থাকা ১০ থেকে ২০ জন যাত্রী আহত হন। পরে আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন রাজিয়া সুলতানা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চমেক ত্যাগ করেন ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দিন জানান, সীতাকুণ্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজনকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক অন্য আহত শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যান।
বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম শুভ দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে উল্টে যাওয়া লরি ও ক্ষতিগ্রস্ত বাসটি সরিয়ে থানায় নেওয়া হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে নিহতের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের অসন্তোষকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অক্ষুণ্ণ রাখতে নিরাপত্তাবলয় আরও সুসংহত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার যেখানে ১০ প্লাটুন বিজিবি নিয়োজিত ছিল, মঙ্গলবার তা বাড়িয়ে ১১ প্লাটুন করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ২১ জন থেকে বাড়িয়ে ২৫ জনে নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্রশাসনিক কর্মকর্তার দিকনির্দেশনায় বিজিবি সদস্যরা স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারি চালাচ্ছেন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাঈন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জেলা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে পুরো শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করতে বিজিবি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বিত তত্ত্বাবধানে এই নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত গাজীপুরের মহাসড়ক কিংবা আঞ্চলিক সড়কগুলোতে শ্রমিকদের কোনো অবস্থান কর্মসূচি বা অবরোধের তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং বিভিন্ন কারখানায় নির্ধারিত সময়ে শান্তিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। গত কয়েক দিনের টানটান উত্তেজনার পর এদিন পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
খুন, গুলি আর রক্তপাত—কোনোভাবেই থামছে না খুলনায় সহিংসতার ধারাবাহিকতা। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে বাড়ছে উদ্বেগ, ছড়াচ্ছে আতঙ্ক। সর্বশেষ রূপসার আঠারোবেকি নদীর চরে মিলেছে দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ। সব মিলিয়ে গত ১২ দিনে খুলনা মহানগর ও জেলায় প্রাণ গেছে সাতজনের। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও পাঁচজন। তাদের মধ্যে যুবদলের বর্তমান ও সাবেক তিন নেতা রয়েছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহের চর এলাকা থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মেহেদী হাসান (৩৫) ও রেজাউল করিম (৩০)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে আঠারোবেকি নদীর চরে প্রথমে একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে ভাটার সময় পানি কমে গেলে একই স্থানে আরেকটি মরদেহ দেখতে পান তারা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মরদেহ দুটি উদ্ধার করে।
নিহত মেহেদী রূপসার রাজাপুর এলাকার আব্দুল্লাহর ছেলে। একসময় তিনি জেলখানা ঘাটের মাঝি ছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, খুলনার অপরাধজগতে আলোচিত রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর গড়া সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘বি-কোম্পানি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন মেহেদী ও রেজাউল। তাদের দুজনের শরীরেই গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
রূপসা থানার ওসি মাসুম খান বলেন, মেহেদী ও রেজাউলকে গুলি করে হত্যার পর তাদের মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মেহেদীর চোখের ওপর ভ্রুর পাশে গুলির চিহ্ন রয়েছে। অন্যদিকে রেজাউলের থুতনির নিচে ও পিঠে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। হত্যার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
মেহেদীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন তার বাবা আব্দুল্লাহ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মেহেদী আলাদা থাকতেন। ছেলের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না।
১২ দিনে সাত হত্যাকাণ্ড; খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় নগরের আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খুন হন খুলনা মহানগর তাঁতি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির। দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।
শনিবার রাতে নগরের লবণচরা এলাকার একটি সড়ক থেকে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার পর সড়কে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে ২৫ অক্টোবর নগরের সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২৪ অক্টোবর দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় কলেজশিক্ষক ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন সকালে তেরখাদা উপজেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস।
২২ অক্টোবর সকালে নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন সন্ধ্যার পর জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলিতে প্রাণ হারান এক গৃহবধূ।
গুলির ঘটনায় আহত পাঁচজন: হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি খুলনায় গুলির ঘটনাও বেড়েছে। ২৬ অক্টোবর রাত থেকে ২৭ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত তিনটি পৃথক গুলির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বটিয়াঘাটা উপজেলার দুটি স্থানে গুলিতে আহত হন যুবদলের সাবেক দুই নেতা। অন্যদিকে খুলনা নগরে গুলিবিদ্ধ হন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। এ ছাড়া ২৪ অক্টোবর তেরখাদায় গুলিবিদ্ধ হন যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও জেলায় গুলি, ধারালো অস্ত্রের আঘাতসহ বিভিন্নভাবে ৭৫ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।
এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধের মতো কারণ রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় নগর ও জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, হত্যার কারণ উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ।
গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ.কে.এম. ফজলুল হক মিলন পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলন কর্মসূচির মধ্যে পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং তাদের সমস্যা ও দাবির কথা সরাসরি শুনতে গাজীপুরের বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা পরিদর্শন করেছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) পরিদর্শনকালে শ্রমিকদের সাথে মতবিনিময় করেন গাজীপুর-৫ আসনের এই সংসদ সদস্য।
এ সময় এ.কে.এম. ফজলুল হক মিলন জানান, সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উপযুক্ত মজুরি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
এ সময় কোনো ধরনের উসকানি, গুজব কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান না দিয়ে শ্রমিকদের ধৈর্য, সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরসহ দেশের কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি চলছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকালেও গাজীপুরের কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রসূত কর্মসূচি পালন করেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের একাধিক অংশে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গাজীপুরের বেশ কিছু পোশাক কারখানায় আজকের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১২০টি শিল্পকারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে জেলার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী, নাওজোড়, মৌচাক, কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ ও হরিণহাটিসহ বিভিন্ন এলাকায় ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলনে নামেন শ্রমিকেরা। এ সময় তারা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে দেন। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। এতে শিল্পাঞ্চলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সকাল থেকেই এসব এলাকার ১২০টি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামীকাল থেকে কারখানাগুলো চালু হতে পারে বলে জানা গেছে।
এদিকে, গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরও।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন বলেন, কারখানাগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিকেরা চালু থাকা কারখানাগুলোকে লক্ষ্য করেই হট্টগোল সৃষ্টি করেন।
তিনি আরও বলেন, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একদল শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় অবস্থান নেন। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিল্প পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যান চলাচল স্বাভাবিক করা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ শুরু করেন।
বেলা ১২টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেন। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
কিশোরগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে জেলা শহরের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম চত্বরে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কিশোরগঞ্জ জেলা কমান্ড’-এর ব্যানারে আয়োজিত এ মানববন্ধনে জেলার ১৩ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মানিক পশারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। নিজের জীবন বাজি রেখে যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, তার গার্ড অব অনার, জানাজা ও দাফন নিয়ে এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বাধীন বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা এ ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
ঘণ্টাব্যাপী এ মানববন্ধনে বক্তব্য দেন কিশোরগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব মো. হাবিবুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা বসির উদ্দিন ফারুকী, গিয়াস উদ্দিন, করিমগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান দুলাল শিকদার, হোসেনপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম, পাকুন্দিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব দেলোয়ার হোসেন মজলু, সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মো. আসাদউল্লাহ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি সারওয়ার আলম মাসুদ, সহসভাপতি শরিফ মিয়া ও উপদেষ্টা জামিল আনসারী প্রমুখ।
মানববন্ধন শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও বলেন, ‘একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। ওই মামলায় সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বক্তাদের অভিযোগ, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্র করে ক্ষোভের জেরে স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা, গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেন।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ঝিনাইদহে হয়েছে সচেতনতামূলক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ‘তারুণ্যের কণ্ঠ’। বাংলাদেশ বেতারের জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেলের আয়োজনে কাঞ্চননগর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা শহরের কাঞ্চন নগর স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রামাণ্য অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদ।
বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপক সজীব দত্তের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মোহা. মোজাম্মেল করিম, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মাহবুবা আখতার তাবীয়া, কাঞ্চননগর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রদীপ কুমার বিশ্বাসসহ সাংবাদিক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অতিথিরা বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক, এর সামাজিক প্রভাব এবং প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা বলেন, বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক সমস্যা। এটি প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তারা।
মধুমতী নদীর বুকে বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের গান আর দর্শনার্থীদের করতালিতে মুখর হয়ে উঠেছিল মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার এলাংখালী ঘাট এলাকা। ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা দেখতে নদীর দুই তীরে সমবেত হন লাখো মানুষ। গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধনে দিনব্যাপী এ আয়োজন পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়। গত রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে মধুমতী নদীতে শুরু হয় বর্ণিল এই নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সুসজ্জিত ১১টি নৌকা অংশ নেয়। রঙিন টি-শার্ট পরা মাঝিরা বাদ্যের তালে তালে গান গেয়ে বৈঠার ছন্দে নৌকা এগিয়ে নিতে থাকেন।
প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। এক পাশে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা, অন্য পাশে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা। দুই উপজেলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নদীর দুই তীর পরিণত হয় জনসমুদ্রে। করতালি ও উল্লাসে মাঝিদের উৎসাহিত করেন দর্শনার্থীরা।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে দুই দিন আগে থেকেই মধুমতীর তীরে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। শত শত অস্থায়ী দোকানে ছিল ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়। মেলায় মিষ্টি, জিলাপি, বাতাসা, কদমা, বিভিন্ন ধরনের সন্দেশ ও পিঠাপুলির পাশাপাশি শিশুদের জন্য ছিল রঙিন বেলুন, কাঠের খেলনা এবং বাঁশ-বেতের তৈরি কুটির শিল্পসামগ্রী। মাটির তৈরি নানা শৌখিন পণ্যের দোকানও ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ।
নৌকা বাইচ উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে আসেন বৃদ্ধ, তরুণ, নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। প্রতিবছর এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে মহম্মদপুর উপজেলার বিভিন্ন বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের সমাগম ঘটে। অনেক পরিবারের কাছে দিনটি ঈদের আনন্দের মতোই বিশেষ। এ উপলক্ষে পুরো উপজেলায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম সামাল দিতে নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, নদী আমাদের জীবন। নদীর প্রবাহের সঙ্গে আমাদের জীবনের প্রবাহ জড়িত। তাই নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদী বেঁচে থাকলে আমাদের সংস্কৃতিও বেঁচে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ মেলা, লাঠিখেলা ও নৌকা বাইচ বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব আয়োজন ধরে রাখা আমাদের দায়িত্ব। গ্রামবাংলার সংস্কৃতি আমাদের শেকড়ের পরিচয় বহন করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মাগুরা জেলা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন (পিপিএম-সেবা), মাগুরা জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহম্মেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদের, মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদমান আকিব, মহম্মদপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধা, কাজী সালিমা হক মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এসএম ইউনুস আলী সরদার, মাগুরা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক সাইদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফিক এবং মহম্মদপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আজিজুর রহমান টুটুলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
রাতে প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে মধুমতীর তীরে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আবারও তুলে ধরে গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা।