মিয়ানমারের চরমপন্থি সশস্ত্র সংগঠন আরসার আগের নাম ছিল আল ইয়াকিন বা ইসলামি সংগঠন। রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে কাজ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ২০১৩ সালের দিকে সংগঠনের নাম পাল্টে রাখা হয় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা, যদিও দলের একাংশ এখনো আল ইয়াকিন নামেই পুরোনো সংগঠনকে আকড়ে ধরে আছে। আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি সেসময়ে হন স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কমান্ডার ইন চিফ। এই আতাউল্লাহর জন্ম সৌদি আরবে, তার বাবা-মা আরাকান থেকে গিয়ে সৌদি আরবে স্থায়ী হন। কিন্তু জন্ম সৌদি আরবে হলেও আতাউল্লাহ পরে পাকিস্তানের করাচিতে এসে বসবাস করতেন।
রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায় করতে ঠিক কবে মিয়ানমারে তিনি ফিরে আসেন, তা জানা যায় না। তবে তা ২০১৩ সালের আগেই অর্থাৎ আল ইয়াকিন থেকে আরসার যাত্রা শুরুর আগেই হয়েছে, তা নিশ্চিত। সংগঠনটি সশস্ত্র হয়ে উঠেছে, তা প্রথম বোঝা যায় ২০১৫-১৬ সালের দিকে। লক্ষ্য ছিল, মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত আরাকান প্রদেশ দখল। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি মিয়ানমারের থানায় হামলা, পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনার পর সংগঠনটির বিরুদ্ধে প্রথম মনোযোগ দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তবে ওই বছরেই আগস্টে তার নির্দেশে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে আরকান দখল ও অস্ত্র লুট করার জন্য আবার হামলা চালায় আরসা। এ ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ সেনাবাহিনী আরসা নির্মূলের উদ্দেশে আরকান প্রদেশে হামলা শুরু করে। তখন উত্তপ্ত হয়ে পড়ে মিয়ানমারে মুসলমানদের গ্রামগুলোর পরিস্থিতি। ওই দেশের সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে চড়াও হয়ে অভিযান ও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হামলা ও গণধর্ষণের ঘটনা শুরুর পর নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে তাদের তখন আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ সরকার। আর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আরসার সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য না থাকার সুযোগে এসব রোহিঙ্গার সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশে চলে আসে আরসার কিছু সদস্য আর সমর্থকও।
উদ্দেশ্য তাদের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করা হলেও অস্ত্র তৈরি ও সংগ্রহ, বাহিনীর জন্য সদস্য সংগ্রহ, সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া ইত্যাদি কাজে তারা তখন থেকেই গোপনে বাংলাদেশের পাহাড়ি নির্জন এলাকাগুলো ব্যবহার শুরু করে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে তারা সেগুলোতে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সর্দার বা মাঝিদের করায়ত্ত করা বা ভয় দেখানো দিয়েই এর শুরু। একই সঙ্গে নিজেদের অর্থভাণ্ডার ঠিক রাখতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে এদেশে মাদক চোরাচালান আরও বাড়িয়ে দেয়।
শুরুতে আরসা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকলেও দিনের পর দিন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরস্পরের মধ্যে হামলা, গুলি, হত্যার ঘটনা বাড়তে থাকায় এবং বিপুল পরিমাণ মাদকসহ রোহিঙ্গা ও তাদের প্ররোচনায় স্থানীয়দের আটক বা গ্রেপ্তাদের মধ্য দিয়ে এই চরমপন্থি সংগঠন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র্যাব, এপিবিএন আরসা দমনে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে মাঝেমধ্যেই। তার পরও তাদের গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়া এবং বেশির ভাগ রোহিঙ্গা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িত হতে না চাওয়ায় আরসার নেতাসহ সদস্যরা বরাবরই আছে উৎকণ্ঠায়। রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরসা ছাড়াও আছে আরও কিছু সশস্ত্র গ্রুপ। তবে তারা পরস্পর যেন পরস্পরের শত্রু। আরাকানে যে বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপ আরাকানের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াই করে যাচ্ছে, আরাকান আর্মি, ওদের সঙ্গেও এসব গ্রুপের শত্রুতা রয়েছে। আরাকান আর্মি সাধারণভাবে সব আরাকানির জন্যে স্বাধীন আরাকান চায়, কিন্তু আরসাকে ওরা চিহ্নিত করে মুসলিম সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে। সব মিলিয়ে অস্থির হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিবির।
আরসার শীর্ষ নেতা অলি আকিজ দীর্ঘদিন মিয়ানমারে আত্মগোপনে থাকলেও গত ১৯ মে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিরেছেন। আরসার শীর্ষ কমান্ডার আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি এবং সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ওস্তাদ খালেদের নির্দেশে ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র গ্রুপ আরসার প্রশিক্ষণ। অস্ত্র তৈরি, আত্মগোপন, মিটিংসহ নানা কর্মকাণ্ড সেখানে সংগঠিত হতো। গত রোববার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে ক্যাম্প-৪-এ গোপন বৈঠক থেকে আকিজসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি এলজি, একটি ওয়ানশুটার গান, ১০ রাউন্ড কার্তুজ, দুই কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য, তিনটি মোবাইল এবং নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা জব্দ করা হয়।
র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ১১২ জনের ওপরে আরসার ভিন্ন পদবিধারী নেতা গ্রেপ্তার করেছি। গত রোববারের আরসার শীর্ষ নেতা আকিজসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করি। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
২০১৭ সালে সীমান্ত পার হয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসে ক্যাম্প-৫-এ সপরিবারে বসবাস শুরু করেন মৌলভী আকিজ। পরে আরসার হয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর ক্যাম্প-৫-এ আরসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। নেটওয়ার্ক গ্রুপে কাজ করতেন। ক্যাম্পের বিভিন্ন তথ্য আরসা কমান্ডারদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এভাবে শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছান। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করায় ওস্তাদ খালেদের নির্দেশে রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মহিবুল্লাহকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন আকিজ। তা ছাড়া মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে ক্যাম্পে সেভেন মার্ডারে সরাসরি অংশ নেন। তাদের নেতা-কর্মী আটক হলে কিছুটা দুর্বল হয়ে যায় কিন্তু আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশাল এই জনগোষ্ঠীতে আরসা, আল-ইয়াকিনসহ অন্তত ১৫টি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সক্রিয়। ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ছয় বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে। মামলা হয়েছে পাঁচ হাজারের অধিক। এসব মামলার বেশির ভাগই হয়েছে মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে।
রোহিঙ্গা নেতা ড. জোবায়ের বলেন, আরসা রোহিঙ্গা ক্যাম্প দখল করে রাজত্ব কায়েম করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত তাদের দুই শতাধিক নেতা-কর্মী আটক হয়েছেন। আটক করলেও তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তার কারণ তাদের রোহিঙ্গা সরকার মদদ দিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যাবাসন বন্ধ রাখার জন্য মিয়ানমার সরকার তাদের ব্যবহার করে যাচ্ছে, যে কারণে তারা এতটা শক্তিশালী।
গত রোববার রাতে উখিয়ার মধুরছড়া ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আরসার শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। সে জায়গায় ভোরে ৪০-৪৫ জন আরসা সন্ত্রাসী পাহাড় থেকে সীমানার কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে ৪ নম্বর ক্যাম্পে আসে। ঘটনাস্থলে এসে ক্যাম্পে পাহারারত রোহিঙ্গা ইলিয়াছকে তারা গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাতে, পায়ে ও তলপেটে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এতে ইলিয়াস ঘটনাস্থলেই মারা যান।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে এপিবিএন সদস্যদেরও লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে সন্ত্রাসীরা।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে সংগঠিত এবং নাশকতা করার চেষ্টা করছে আরসা। মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায় আরসা সন্ত্রাসীরা। এতে তারা গুলি এবং কুপিয়ে তিন রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। আর গুরুতর আহত হয় সাতজন। হতাহতরা আরএসও সদস্য বলে জানা গেছে।
রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায় করতে আরসা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের দিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালায়। কিন্তু এটার কারণে নির্যাতনের তীব্রতায় নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা। সে কারণে আরসা রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব হয়ে উঠতে পারে নাই। বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, রোহিঙ্গাদের এ দুর্দশার জন্য আরসা দায়ী। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আরসার একটা বড় গ্রুপ বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং যখন কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করেছে তখন তারা তাদের দমন করেছে। এর মধ্যে একজন ছিলেন মুহিব উল্লাহ। মুহিব উল্লাহ যখন রোহিঙ্গাদের নেতা হয়ে ওঠে বিশ্বের কাছে পরিচিত হন এবং আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্দোলন করেন তখন তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশ যখন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করে তখন রোহিঙ্গাদের রাজি করানোর জন্য মুহিব উল্লাহ সোর্স ছিল। ধীরে ধীরে মুহিব উল্লাহ প্রধান পাঁচ রোহিঙ্গা নেতার একজন হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গার মহাসমাবেশ করে তাক লাগিয়ে দেন এবং আনন্দে আত্মহারা করে দেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে লেগে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোকে। এসব কারণে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ভেঙে দেওয়ার জন্য মুহিব উল্লাহকে হত্যা করা হয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শত্রু হচ্ছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মির শত্রু হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। আবার মিয়ানমারের শত্রুও আরসা। মিয়ানমার নৌবাহিনী ঘোষণা দিয়ে বলছে আরকান আর্মি ও আরসা মিলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু মিয়ানমার আরাকানে আরকান আর্মি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সে কারণে আরসা ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে ড. রাহমান নাসির বলেন, দুই শতাধিক আরসার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার করাতেই আরসা দুর্বল হয়ে পড়েছে এমন যুক্তি হয়তো সঠিক নয়। এই চরমপন্থি দলে আরও অনেক সদস্য ও সমর্থক রয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে থাকে। আগুন নাশকতা এসব মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু ঘটনা আমরা সন্দেহ করি এগুলো নাশকতা। আমরা আরসা বলে কিছু পাইনি। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী গ্রুপ আছে। যারা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়াবে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রোহিঙ্গা ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা খিন মং বলেন, রোহিঙ্গাদের অধিকারের জন্য লড়াই করার দাবি করেছিল আরসা। তখন তাদের বিশ্বাস করেছিল রোহিঙ্গারা। কিন্তু এখন সাধারণ রোহিঙ্গারাও মনে করে আরসা মিয়ানমারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। যারা প্রত্যাবাসনের কথা বলছেন তাদের হত্যা করা হচ্ছে। তাই আরসার ওপর তাদের আর বিশ্বাস নেই।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের মামলার চার্জশিট এখনো না হওয়া ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতের ফরেনসিক রিপোর্ট প্রাপ্তিতে ধীরগতি হওয়ায় ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। তবে, মামলার অগ্রগতির নিমিত্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির জন্য আবেদন করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো সরবারহ করেনি বলে জানা গেছে।
জানা যায়, গত ৫ মার্চ এ ঘটনায় ইবি থানায় ফজলুকে প্রধান আসামিসহ মোট চারজনকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের স্বামী ইমতিয়াজুর সুলতান। পরে পুলিশ অভিযুক্ত ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করলেও ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক কর্মচারী ও উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমানকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা।
হত্যাকাণ্ডের পর কয়েক দিনের মধ্যে সিআইডি স্পেশাল ফোর্স ঘটনাস্থল থেকে আলামতগুলো উদ্ধার করে পরবর্তীতে সেগুলো ফরেনসিকের জন্য প্রেরণ করা হয়। এখনো রিপোর্ট আসেনি বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।
বিভাগের শিক্ষার্থী বাঁধন বিশ্বাস স্পর্শ বলেন, ‘ম্যামের হত্যাকাণ্ডের সাড়ে চার মাস হয়ে গেছে। তবুও প্রশাসনের অসম্পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছে। এখনো পর্যন্ত ম্যামের হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। ম্যামের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। ম্যামের পাওনাকৃত অর্থ (পেনশন) দেওয়া হয়নি। ম্যামের পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। চার্জশিট এখনো পর্যন্ত জমা করা হয়নি। ফরেনসিক রিপোর্ট এখনো পর্যন্ত আসেনি। ম্যামের নামে হলের নামকরণ করা হয়নি। শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ম্যামের সন্তানরা অনেক সহ্য করে আছে। কিন্তু ম্যামের প্রতি, পরিবারের প্রতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রশাসনের এত অন্যায়; কিন্তু সৃষ্টিকর্তাও মেনে নেবে না। আমি প্রশাসনকে বলতে চাই, আমাদের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেবেন না। অযৌক্তিক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে আহ্বান করছি। অন্যথায় এবার যদি ম্যামের সন্তানদের মাঠে নামতে হয়, তাহলে কিন্তু প্রশাসনের ব্যক্তিদের গদি লইড়া যাবে।’
বিভাগের শিক্ষার্থী পাভেল জামান আকাশ বলেন, ‘আমরা আন্দোলনে নামলে প্রশাসনের নজরে আসে অন্যথায় তারা বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে নেয় না। আন্দোলন কঠোর রূপ ধারণ করলে প্রশাসন পদক্ষেপ নেয়। ম্যামের হত্যাকারী দৃশ্যমান তবুও বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা সুস্পষ্ট যা ক্ষোভ তৈরি করছে। আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হব।’
নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজুর সুলতান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বা তদন্ত কর্মকর্তার নিকট থেকে তেমন আপডেট পাই না। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে মামলার অগ্রগতি হচ্ছে বলে আশ্বস্ত করেন।’
অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ সাইদ বলেন, ‘মামলা আদালতের গতানুগতিক ধারায় চলমান রয়েছে। আসামির পক্ষে কেউ এখনো জামিন ধরেনি। ফলে অভিযুক্ত ফজলু জেলে আটক রয়েছেন। মামলার শুনানি কবে শুরু হবে বা অভিযুক্ত ফজলু রিমান্ড চলাকালীন সময়ে কি জবানবন্দি দিয়েছে সেসব আদালতের গোপনীয় বিষয়। এগুলো এই মুহূর্তে জানার কোনো সুযোগ নাই আমাদের।’
এ বিষয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির জন্য আবেদন করেছি। সে রিপোর্টের তথ্য সমন্বয় করলে মামলার অগ্রগতিতে সহায়তা হবে। ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ফরেনসিক টিম গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করে আমাদের নিকট হস্তান্তর করেছিলেন। এ ছাড়া ঘটনার সময়কালীন একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গিয়েছিল। ফুটেজগুলো জব্দ করে প্রকৃত কি না পরীক্ষার জন্য ঢাকা সিআইডির ফরেনসিক ইউনিটে বিজ্ঞ আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে প্রেরণ করা হয়েছে। এখনো আমরা ফরেনসিক রিপোর্ট পাইনি। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে বিজ্ঞ আদালতে পেশ করব।’
চার্জশিটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মূল হত্যাকারী জেলহাজতে আছেন এবং মামলা চলমান। বাকি যারা আছে তারা পলাতক। তাদের আনুষঙ্গিক তথ্যাদি সংগ্রহসহ তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন থানা ও অন্যান্য সংস্থায় চিঠিও দেওয়া আছে। যাতে পলাতকদের গ্রেপ্তার করতে পারে। হত্যাকারী ফজলুর রহমানকে আরও অন্য কেহ হত্যার প্ররোচনা দিয়েছিল কি না সে বিষয়ে নিয়েও কাজ করছি। হত্যার মোটিভ উদঘাটনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল স্টেকহোল্ডারের সাথে কথা বলে তাদের নিকট থেকে সাক্ষ্য নিচ্ছি। আমরা কোনো ধরনের তড়িঘড়ি করছি না যাতে মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে বাধাগ্রস্ত হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘আসমা সাদিয়া রুনার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট সিন্ডিকেটে উত্থাপিত হয়েছে এবং সিন্ডিকেট মনে করেছে উচ্চতর তদন্ত হওয়া উচিত সেই জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা কাজ করছে। সুতরাং যতক্ষণ তদন্তাধীন জিনিস থাকবে ততক্ষণ পূর্বের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নাই।’
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা অবিলম্বে কার্যকর, শ্রম অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবিতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে গণবিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা-বাগানে ‘বাংলাদেশের সাধারণ চা-শ্রমিক ও ছাত্র-যুবক’ এর যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচিতে স্থানীয় চা-বাগানের শ্রমিক, ছাত্র-যুবকসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
মিরতিংগা চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মন্টু অলমিকের সভাপতিত্বে এবং ইমরান নাজিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, চা শ্রমিক নেতা জনক লাল দেশোয়ারা (জনি), শমশেরনগর চা-বাগানের ছাত্রনেতা গোপাল যাদব, জগদীশ বাউরী, দেওরাছড়া চা-বাগানের ছাত্রনেতা অনুরাগ কর্মকার রাজু, গিয়াসনগর চা-বাগানের ছাত্রনেতা মুমিন আহমেদ এবং চা-ছাত্র যুব পরিষদ মনু-ধলই ভ্যালীর যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিরতিংগা চা-বাগানের শ্রমিক সন্তান মানিক প্রসাদ পাল।
সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের বাজারে বর্তমান মজুরি দিয়ে চা-শ্রমিকদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জাতীয় সংসদে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা বাস্তবায়নের বিষয়টি উত্থাপিত হলেও তা আটকে আছে।’ বক্তারা এই দাবি অবিলম্বে কার্যকর করার জোর আহ্বান জানান।
এ ছাড়া শ্রম অধিদপ্তরের অযাচিত ও অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ করে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান তারা। বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন যে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিলে পরবর্তীতে চা-শিল্পে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।’
অন্যান্যর মধ্যে সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন লাইন চৌকিদার সুজন মাল, মহিলা দফার সর্দারনি নিয়তি গৌর, গীতা পাইনক্কাসহ বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সমাবেশ থেকে নেতারা সতর্কবার্তা দিয়ে জানান, তাদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেনে না নেওয়া হলে পুরো চা অঞ্চলজুড়ে কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভদ্রা খালে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও অবৈধ মৎস্য আহরণ প্রতিরোধে এক বিশাল যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানের মাধ্যমে খাল থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকারক নেট-পাটা ও রিং জাল (চায়না দুয়ারি) অপসারণ করে তাৎক্ষণিকভাবে তা জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এ উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা মৎস্য দপ্তর এবং ডুমুরিয়া থানা পুলিশ যৌথভাবে অংশ নেয়।
দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণির অসাধু জেলে ও দখলদার ভদ্রা খালের বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁশের বেড়া বা নেট-পাটা দিয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আটকে রেখেছিল। এ ছাড়া ক্ষতিকারক ‘চায়না দুয়ারি’ জালের অবাধ ব্যবহারে রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে শুরু করে ছোট আকারের দেশীয় প্রজাতি যেমন—টেংরা, পুঁটি, খোলসে ও বাইম মাছের রেনু পোনাও ধ্বংস হচ্ছিল। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে পুরো ভদ্রা খালজুড়ে এই বিশেষ অভিযান চালায়।
ডুমুরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অমিত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘স্থানীয় কিছু অসাধু লোক খালের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও পানিপ্রবাহ আটকে অবৈধ নেট-পাটা ও চায়না দুয়ারি জাল বসিয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারি নির্দেশনানুযায়ী আমরা কোনো প্রকার বেআইনি কাজ সহ্য করব না। ডুমুরিয়ার কোনো খাল বা উন্মুক্ত জলাশয়ে কোনো অবৈধ জাল বা নেট-পাটা থাকবে না। জলাশয়গুলো জনসাধারণের, এখানে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আগামীতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে এবং প্রয়োজনে কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, ‘চায়না দুয়ারি এবং নেট-পাটা মাছের জন্য এক ধরনের ‘‘নীরব ঘাতক’’। এর ফাঁদ এতই ছোট যে, পানির একদম তলদেশ দিয়ে চলাচলকারী মাছের ডিম ও রেনু পোনা পর্যন্ত এতে আটকে মারা যায়। ডুমুরিয়া উপজেলাকে মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ রাখতে হলে এই ক্ষতিকর প্রবণতা বন্ধ করতেই হবে।’
অভিযান চলাকালে ভদ্রা খালের দুই পারের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের এ ধরনের শক্ত পদক্ষেপে তারা আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় এক বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আগে কখনো এমন অভিযান দেখিনি। অফিসে বসে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তারা এখন সরাসরি খালে-বিলে নেমে এই ক্ষতিকর জালউচ্ছেদ করছেন, যা প্রশংসার দাবিদার। খালটি মুক্ত হলে দেশি মাছ যেমন বাঁচবে, তেমনি পানির প্রবাহও ঠিক থাকবে।’
সংশ্লিষ্ট পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য দপ্তরের এই যৌথ উদ্যোগ নিয়মিত বজায় থাকলে ভদ্রা খালসহ আশেপাশের জলাশয়ে অবৈধ মৎস্য আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি ও দক্ষিণাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
মাদারীপুর সদরের দত্ত কেন্দুয়ায় জমি লেখে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ৭০ বছরের বৃদ্ধ পিতাকে মারধর করার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
জানা যায়, সদর উপজেলার দত্ত কেন্দুয়ার বৃদ্ধ করম আলী ঘরামি (৭০) তার মেঝ ছেলে আজিজুল ঘরামীকে বাড়ির পাশের একটি জমি লেখে দেন। এতে তার অন্য দুই ছেলে আ. সোবহান ও ইমামুল এবং এক পুত্রবধূ আকলিমা বেগম ক্ষিপ্ত হয়ে পিতা করম আলীকে লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে এবং বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
বৃদ্ধ পিতাকে অমানুষিক মারধরের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করে বলেন, ‘জমি লেখে দেওয়ার বিষয়টি পারিবারিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে ফায়সালা করা যেত; কিন্তু সে জন্য সন্তান কর্তৃক বৃদ্ধ পিতাকে মারধর করা অমানবিক কাজ।’
আহত করম আলী ঘরামী জানান, আক্রমণ করা তার ওই দুই ছেলে তাকে ভরণ-পোষণ দেয় না বরং প্রায়ই মানষিক ও শারিরীক নির্যাতন করে, অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে।
ওই ঘটনায় মেঝ ছেলে আজিজুল ঘরামীর স্ত্রী মুক্তা বেগম অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। বিষয়টি হাসপাতালে কর্তব্যরত পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আ রাজ্জাক ‘হাসপাতাল ইন্সিডেন্ট রিপোর্ট’ হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী পরিবার কর্তৃক লিখিত অভিযোগ পেলে সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ।
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় নকল দুধ তৈরির এক কারিগরকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাতে উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে এই রায় দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুজ্জামান। দণ্ডপ্রাপ্ত আশরাফুল আলী (৪২) ওই গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে। এ সময় সেখান থেকে নকল দুধ তৈরির উপাদান তিন ড্রাম জেলি ও বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালসহ ২০০ লিটার নকল দুধ জব্দ করে তা ধ্বংস করা হয়। এ সময় উপজেলা সেনেটারি ইন্সপেক্টর নুরুল ইসলামসহ পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, আশরাফুল নিজ বাড়িতে সিলিং সেন্টার বসিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ নকল দুধ তৈরি করে আসছিল। এসব দুধ তিনি এলাকার বিভিন্ন সিলিং সেন্টারে সরবরাহ করতেন। আর এভাবে তিনি নকল দুধ তৈরি করে অল্প দিনের মধ্যেই হয়ে গেছেন কোটিপতি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাত ৯টার দিকে সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুজ্জামান। অভিযানে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর ৫০ ধারা অনুযায়ী ওই ব্যক্তিকে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রাতেই তাকে থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করা হয়।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুর্কী ও ভাবখণ্ড বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে শিশুদের নকল প্রসাধনী ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির দায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় একটি প্রতিষ্ঠান সিলগালাও করা হয়। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেলের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানে জামুর্কী বাজারের মহন্ত স্টোর থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুদের প্রসাধনী জব্দ করা হয়। এ অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার করে ল্যাব পরিচালনার দায়ে জামুর্কী বাজারের মির্জাপুর পপুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই বাজারে জামুর্কী লাইফ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ৫ হাজার টাকা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির দায়ে একটি ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অপরদিকে উপজেলার ভাবখন্ড বাজারে পরিচালিত পৃথক অভিযানে একটি ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির দায়ে আরও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল শিশুদের প্রসাধনী জব্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।’ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’ এই প্রতিপাদ্যে যথাযোগ্য মর্যাদায় মানিকগঞ্জে বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম মানবপাচার, লোক চোরাচালান এবং সাইবার প্রতারণা প্রতিরোধ ৪-দফা কাঠামো প্রকল্পের উদ্যোগে মানিকগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে থেকে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়। পরে মানিকগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী নূর অতএব আহম্মদ, বিশেষ অতিথি হিসেবে জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের সহকারী পরিচালক আওলাদ হোসেন, স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ব্র্যাক ডিসট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. শফিকুল ইসলাম এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এমআরএসসি কো-অর্ডিনেটর রোমানা আফরোজা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ প্রকৌশলী নূর অতএব আহম্মদ বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানবপাচার রুখে দেওয়া সম্ভব। তথ্য প্রযুক্তির যুগে অনলাইন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দায়িত্বশীল ও সতর্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মানবপাচারের ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারি।’
এ ছাড়াও মুক্ত আলোচনায় এনজিও প্রতিনিধিরা, মানবপাচারের শিকার সারভাইভার, সম্ভাব্য অভিবাসী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে মানবপাচার প্রতিরোধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে নিজ নিজ মতামত ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে চলন্ত বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বগি থেকে মোটর খুলে নিয়ে পালানোর সময় দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে কুলিয়ারচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের আটক করেন। এ সময় চুরি হওয়া এসির মোটরটিও উদ্ধার করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন- ভৈরব নিউটাউন এলাকার মৃত মানিক মিয়ার ছেলে মো. দুলাল মিয়া (২৫) এবং একই এলাকার মো. বাবু মিয়ার ছেলে মো. আরিফ (১৬)।
রেলওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ভৈরব স্টেশন অতিক্রম করে কুলিয়ারচরের দিকে যাচ্ছিল চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুরগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস। এ সময় ট্রেনের একটি এসি বগির মোটর খুলে ফেলেন দুই ব্যক্তি। পরে চুরি করা মোটর নিয়ে তারা চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন।
বিষয়টি কয়েকজন যাত্রীর নজরে এলে তারা ট্রেনের স্টাফদের জানান। পরে জরুরি ভিত্তিতে কুলিয়ারচর স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই খরকমারা এলাকায় ট্রেনটি থামানো হয়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ধাওয়া করে চুরি করা মোটরসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, আটক দুজন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন থেকেই চুরির উদ্দেশে এসির মোটর খোলার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে ট্রেনে উঠেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
আটকের পর স্থানীয় কিছু লোকজন তাদের মারধর করেন। পরে ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাদের হেফাজতে নেন। উদ্ধার করা হয় চুরি হওয়া এসির মোটর।
পরে আটক দুজনকে ওই ট্রেনেই কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে (জিআরপি) থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী বলেন, ‘চলন্ত ট্রেন থেকে এসির যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে। প্রথমে যাত্রীরা বিষয়টি টের পান। পরে তারা ট্রেনের স্টাফদের জানালে এসির যন্ত্রাংশ খোলার সরঞ্জামসহ দুজনকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
দীর্ঘ ১৭ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত থাকার পর অবশেষে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজে চারতলা ভিতবিশিষ্ট একতলা একাডেমিক ভবনের উদ্বোধন করা হয়েছে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) বেলা ১১টায় কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভবনটির উদ্বোধন করেন ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) আহ্বায়ক ও নীলফামারী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু।
উদ্বোধন শেষে কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হওয়ায় দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কলেজটি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ এবং শ্রেণিকক্ষ সংকট দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বক্তারা আরও বলেন, নবনির্মিত একাডেমিক ভবন চালু হওয়ায় কলেজের শ্রেণিকক্ষের সংকট অনেকটাই দূর হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হবে। ভবিষ্যতে কলেজের সার্বিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ মনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাজেরুল ইসলাম এবং প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিনের সহধর্মিণী তামান্না ইয়াসমিন।
অনুষ্ঠানে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয়গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
২৮ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ২৩০০ একরের পাহাড়ী ক্যাম্পাসে পড়াশোনার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়।
স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তাদেরকে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। ২৮ হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মাত্র ১৪ টি আবাসিক হল যেখানে মাত্র ৯ হাজার শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা ভোগ করতে পারে। মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২১% আবাসন সুবিধা পেয়ে থাকে বাকিদেরকে থাকতে হয় বাহিরের বিভিন্ন কটেজ কিংবা মেচ ভাড়া করে। সেখানেই তাদেরকে সত্যিকার জীবনযুদ্ধ টা করতে হয়। কোনোরকম থাকার মত একটি সিট জোগার করতেই শিক্ষার্থীদের গুনতে হয় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এরপর খাবারের জন্য হোটেল এবং ক্যান্টিনগুলোতে ভিড় করতে হয়। হোটেল ব্যবসায়ীরা এ ফাঁকে ফায়দা লুটে নেয়। অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের খাবার বিক্রি করে চরম মূল্যে। এ যেন মরার উপর খঁড়ার গা।
ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা টিউশনের জন্য ২৫ কিলোমিটার শাটল ট্রেনে চড়ে শহরে যেতে হয়, সেখানেও টিউশন মিডিয়ার বলির পাঠা হতে হয়। ৩ হাজার টাকার টিউশন নিতে মিডিয়াকে দিতে হয় ৬০% পর্যন্ত ফি।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ভোগান্তিটা তুলনামূলক বেশি হয়। শাটলে করে আসা যাওয়ার জন্য প্রতিদিন ৪ ঘন্টা ব্যয় হয়। শাটল ট্রেনেও শিক্ষার্থীরা মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকেন, দূর্বৃত্তদের ছোরা পাথরে আহত হয় অসংখ্য শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চবি শিক্ষার্থীদের জন্য যাতায়াতের একমাত্র বাহন শাটল ট্রেন, সেটিরও প্রতিদিন শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। দূর্বল ইঞ্জিন দিয়ে ঠিকমত সেবা দিতে পারে না শাটল।
অন্যদিকে শিক্ষক- কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে স্পেশাল বাস সেবা। শিক্ষকবাসে আবার শিক্ষার্থীদের উঠা সম্পূর্ণ নিষেধ।
এছাড়া ক্যাম্পাসে রয়েছে স্থানীয়দের একক আধিপত্য, শিক্ষার্থীরা অটো রিকশায় যাতায়াত, দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে ঝামেলা পোহাতে হয়।
২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী আশফাক বলেন, "সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস দেখে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু এখন বুজতেছি ঠিকে থাকা কতটা মুশকিল।"
২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী রাহাদ বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের সুযোগ সুবিধার কথা কেবল চিন্তা না করে আমাদের জন্য চাইলে কিছু করতে পারে। কয়েকটা হল নির্মাণ করলে আমরা এতটা ভোগান্তির মধ্যে থাকি না।”
ধান চাল উৎপাদনে বরাবরই শীর্ষে উত্তরের জেলা নওগাঁ। এখানকার উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বিশেষ কদর রয়েছে সারাদেশের খুচরা এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। এক মাসের ব্যবধানে চাল বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। কেজিতে এবার ২-৪ টাকা নয় বেড়েছে ৮০ টাকা সুগন্ধি (আতপ) চালের দাম। শুধু তাই নয়, সুগন্ধীর পাশাপাশি বেড়েছে কাটারীসহ সব ধরনের সরু চালের দামও। দেশের বৃহত্তর চালের মোকাম নওগাঁয় ঠিক এমনই টালমাটাল চালের বাজার।
ক্রেতা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় কিছু মিল আর প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর মজুদ সিন্ডিকেটের কারনেই বাড়ছে চালের দাম। তবে মিল মালিক আর ব্যবসায়ী নেতাদের দাবী, সরকারীভাবে রপ্তানী আর হাটে ধানের বাড়তি দামের কারণেই উর্ধ্বমুখী চালের দাম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং এর কথা বললেও বাস্তবে দেখা মিলেনি কারোই।
নওগাঁ পৌর খুচরা চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে সকল প্রকার সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। বাজারে মোট বিক্রির ৮০ শতাংশই হয় কাটারি চাল। শর্টার ও নন শর্টারসহ সব ধরনের কাটারিরর দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। ৭৬ টাকা কেজির চাল ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ৫৮ টাকা। তবে স্মরণ কালের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সুগন্ধি (আতপ) চাল। একমাস আগেও এই চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১২০ টাকা কেজিতে। কিন্তু প্রতিদিনই বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে ৮০ টাকা। চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে। বাজারে চাল কিনতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
আতপ চাল কিনতে আসা ইসমাইল হোসেন বলেন, গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৩ কেজি আতপ চাল কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে শুনি সেই চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এভাবে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে যাওয়াই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
আব্দুর রহিম নামে আরেক ক্রেতা ৫ কেজি ভাতের চাল কিনতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন। বলেন, এভাবে দাম বাড়লে যারা দিন এনে দিন খান তাদের জন্য চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ৪০ বছর ধরে চালের ব্যবসা করে আসছি। আমার ব্যবসার জীবনে এতটা দাম বৃদ্ধি কখনও দেখিনি। বিশেষ করে আতপ চালের দাম এতটা বৃদ্ধির পিছনে যৌক্তিক কোন কারণ আছে বলে মনে হয়না। প্রতিদিনই ক্রেতাদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে আমাদের।
আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ার অভিযোগ করে বলেন, কিছু বড় মিলার ও প্রাইভেট কোম্পানীর ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই চাল কিনে মজুদ করেছেন। তারাই মূলত এখন বাজার নিয়ন্ত্রন করছেন।
ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাজারে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
মফিক উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম জানান, সরকার কয়েক মাস ধরেই আতপ চাল রপ্তানীর অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। দেশ থেকে এবার বড় পরিসরে আতপ রপ্তানী হচ্ছে। যার কারণেই আতপের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। আর আতপের যোগান কমে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য সরু চালে। মানুষ আতপের চাহিদার অনেকটাই কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল দিয়ে মিটাচ্ছেন। যার কারনেই সরু ও আতপের দাম কিছুটা বেশি।
নওগাঁ চাউলকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘চিনিগুড়া একটি বিশেষায়িত সুগন্ধি চাল। এর উৎপাদন সীমিত হলেও চাহিদা অনেক বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দাম বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া ধান বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমানে হাটগুলোতে প্রতি মন কাটারি ১৮০০ আর আতপ কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৭’শ টাকায়।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ফরহাদ খন্দকার বলেন, মূলত রপ্তানীর কারনেই দাম বেড়েছে কিছুটা। নওগাঁয় অটোমেটিক ও হাসকিং মিলিয়ে সাড়ে ৪’শ রাইস মিল রয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতিনিয়তই মিলগুলোতে নজর রাখছে। অবৈধ মজুদ অনুসন্ধানে মাঠে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
হুমায়ুন কবীর ছিলেন পুলিশের কনস্টেবল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিবহন বিভাগে জলকামান চালাতেন। ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জে নিজ বাড়ির সামনে থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। আর এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন তারই স্ত্রী। তদন্ত শেষে ১১ জনকে আসামি করে এ বছরের মার্চে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন হত্যা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আওলাদ হুসাইন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্ত্রী সালমা বেগমের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক জানাজানি হওয়া এবং হুমায়ুনের কাছ থেকে একজন আত্মীয়ের ধার নেওয়া ১০ লাখ টাকা ফেরত না দেওয়া—এ দুই উদ্দেশ্যে খুন হন এই পুলিশ সদস্য। মাস দুয়েক ধরে চলে পরিকল্পনা। একাধিকবার খুনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে হুমায়ুনকে অচেতন করা হয়। গভীর রাতে হাত-পা বেঁধে রশি দিয়ে তাকে শ্বাসরোধে খুনের পর মরদেহ বাড়ির সামনে ফেলে দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর হাকিম সারাহ ফারজানা হক গত ১ জুলাই অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়েছেন। এখন অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
হুমায়ুনের স্ত্রী সালমা বেগম ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—রাজীব হোসেন, মরিয়ম বেগম (মলি), পলি বেগম, কায়েস হাওলাদার, ফজলে রাব্বি শুভ, রাফি খান, আকাশ, আশিক, সজীব ও সাব্বির।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আর আর্থিক লেনদেন থেকে হুমায়ুনকে খুন করা হয়। ১১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ৪ জন পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে আকাশ, আশিক, সজীব ও সাব্বির শুরু থেকেই পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ১৩ আগস্ট আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।
সালমা, পলি ও রাফি কারাগারে আছেন। রাজীব, মলি, কায়েস ও শুভ জামিনে আছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আওলাদ হুসাইন বলেন, ‘এটি একটি চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আর আর্থিক লেনদেন থেকে হুমায়ুনকে খুন করা হয়। ১১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।’
হুমায়ুন কবীর ও সালমা বেগমের বিয়ে হয়েছিল ২০১০ সালে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, নিকটাত্মীয় হওয়ায় তাদের বাসায় প্রায়ই যাতায়াত করতেন রাজীব হোসেন। প্রায় বছরখানেক আগে রাজীবের সঙ্গে সালমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে গত বছরের ২৫ এপ্রিল দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠক হয়। সালিশে সালমা ওই সম্পর্ক থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দেন।
ওই সালিশের তিন দিন পর ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল সকালে দয়াগঞ্জে নিজের ভাড়া বাসার ফটকের সামনে থেকে হুমায়ুনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন হুমায়ুনের ছোট ভাই খোকন হাওলাদার যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, যাত্রাবাড়ীতে হুমায়ুনের ভাড়া বাসার ভবনের চারতলায় থাকেন মরিয়ম বেগম (মলি)। তিনি সালমা বেগমের আত্মীয়। তার স্বামী বাবুল মুন্সী প্রবাসে থাকেন। তিন-চার বছর আগে হুমায়ুনের কাছে ১০ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন বাবুল। সেই টাকা ফেরত দেননি। সময়মতো টাকা ফেরত না দেওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ হয়।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, হুমায়ুন বেঁচে থাকলে একদিকে সালমা ও রাজীবের সম্পর্কে বাধা থাকত, অন্যদিকে মলির ধারের টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ থাকত। এ কারণে পারস্পরিক যোগসাজশে হুমায়ুনকে চিরতরে সরিয়ে ফেলার ছক কষা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, খুনের ঘটনার মাস দুয়েক আগে থেকে ভাড়াটে খুনি খোঁজা শুরু হয়। মলির মাধ্যমে পলি বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পরে পলির ভাগনে কায়েস হাওলাদারের মাধ্যমে শুভ, আশিক, সজীব, রাফি, আকাশসহ কয়েকজনকে পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়।
একপর্যায়ে খুনের জন্য দা, রশি, গ্লাভসসহ নানা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়। কয়েকবার সুযোগ পেলেও তা সফল হয়নি। পরে হুমায়ুনের প্রতিদিনের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে পরিকল্পনা বদলে ফেলা হয়। ভোরবেলায় বাসার সামনে মানুষ বেশি থাকে। তাই বাইরে নয়, বরং বাসার ভেতরেই খুন করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সালমা ও পলি স্থানীয় একটি ফার্মেসি থেকে ঘুমের ওষুধ কেনেন। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে হুমায়ুন বাসায় ফিরলে তার খাবারে সেই ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। রাত গভীর হলে মলি, পলি, শুভ ও রাফি ওই বাসায় যান। তখন হুমায়ুন সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন। তার হাত-পা গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে কয়েকজন মিলে দুই পাশ থেকে টান দেন। সালমা তার স্বামীর পা চেপে ধরে রাখেন। হুমায়ুনের মৃত্যু নিশ্চিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, খুনের পর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে হুমায়ুনের মরদেহ কাঁধে করে তিনতলা থেকে ভবনের নিচে নামিয়ে আনা হয়। বাইরে কোথাও নিয়ে সেটি ফেলে দিতে চেয়েছিলেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। কিন্তু হুমায়ুনের বাসার সামনে একটি রিকশার গ্যারেজ তখনো খোলা ছিল। তাই মরদেহ বাইরে নেওয়া সম্ভব হয়নি। মরদেহটি বাসার সামনে গেটের কাছে ফেলে দেওয়া হয়।
এরপর আসামিরা হুমায়ুনের বাসায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যান। তদন্তে বলা হয়েছে, খুনের সঙ্গে সালমা নিজে জড়িত, এটা যাতে কেউ বুঝতে না পারে, সেজন্য এমনটা করা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর শুভ ও রাফিকে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী, বাকি টাকা হুমায়ুনের মৃত্যুর পর পাওয়া পেনশনের টাকা থেকে পরিশোধ করার কথা ছিল।
তবে আসামিদের পরিকল্পনা কাজে আসেনি। পুলিশের সন্দেহ হলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হুমায়ুনকে খুন করার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আওলাদ হুসাইন বলেন, ‘কয়েক দফা পরিকল্পনা বদলে হুমায়ুনকে খুন করা হয়েছিল। খুনের আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ওই বাসাতেই অবস্থান করছিলেন।’
মামলার বাদী খোকন হাওলাদারের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নম্বরটি খোলা পাওয়া যায়নি।
আসামি সালমা বেগমের আইনজীবী কামাল হোসেন জানান, আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। আসামি সালমা কারাগারে আছেন। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন আদালত।
দেশজুড়ে দ্বিমুখী সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে অতি-সংক্রামক ব্যাধি হামের অগোচরে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহতা, অন্যদিকে সময়ের আগেই ডেঙ্গুর অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি—এই দুই রোগে রাজধানীসহ সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হামে শিশুদের প্রাণহানি যেমন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তেমনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দৈনিক ভর্তি ও মৃত্যুর মিছিল থামছেই না।
হাম পরিস্থিতি: দেশে এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৩৫ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৩৯ জন মারা গেছে। আর হামে মারা গেছে ৯৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জানিয়েছে, হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩২২ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১০৮ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৯১, ময়মনসিংহে ৭০, চট্টগ্রামে ৬১, বরিশালে ৪৪, খুলনায় ৩২ ও রংপুর বিভাগে ১১ জন মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত পরিসংখ্যানে মৃতদের বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে। তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়।
সরকারের তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে ৮৭০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেল ১ লাখ ২৭ হাজার ৪১০ জনের। গত একদিনে ল্যাব পরীক্ষায় নতুন করে আরও ১৩৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৮৭৪ জন।
হাসপাতালে ভর্তির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ১৮২ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৩ জন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি: দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬৩ জন রোগী।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন আক্রান্ত ৪৬৩ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৮৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৯ জন, খুলনা বিভাগে ৬২ জন, বরিশাল বিভাগে ৬৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১ জন, রংপুর বিভাগে ২০ জন এবং সিলেট বিভাগে তিন জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে দুইজন এবং খুলনা বিভাগে একজন রয়েছেন।
চলতি বছরের এক জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পর্যন্ত দেশে মোট ১৫ হাজার ১৫৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৩ হাজার ৯৩১ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সর্বমোট ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চ ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সর্বমোট এক হাজার ১৬৯ জন ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই ভর্তি আছেন ৪৩৮ জন রোগী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এবং ডেঙ্গুর জোড়া ধাক্কা সামলাতে অবিলম্বে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সামলাতে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি পরিবার পর্যায় থেকে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। ডাবল সংক্রামক ব্যাধির এই আঘাত প্রতিরোধে সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক পদক্ষেপই পারে বড় বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গু একই সময়ে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ফলে অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। তার মতে, আতঙ্ক নয়, দ্রুত পরীক্ষা এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, প্রতি বছর ডেঙ্গুর সময় সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জনবল, বৈজ্ঞানিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী সতর্ক করেছেন, বর্তমানে ডেন-৩ (DENV-3) সেরোটাইপের বিস্তার বাড়ছে। এই ধরনটি রোগীর মধ্যে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোম সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্বরকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এডিস মশা পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, ছাদের কোণা, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা পানির ড্রাম-এসবই এডিসের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। সূর্যোদয়ের পরের দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘণ্টা এডিস সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। ফলে ব্যক্তিগত সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াও একই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। যদিও চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুহার তুলনামূলক কম, তবে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গিঁটের ব্যথা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একই মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দুটি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হলেও বাস্তবে সেই সমন্বিত উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই বলে আসছে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর। হামের ক্ষেত্রে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার এবং জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এসব রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।