৫ দিন পর সিলেটের আকাশে সূর্যের দেখা মিলেছে। গতকাল সকালে রোদের দেখা পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার বানভাসি মানুষ। বৃষ্টি না হওয়ায় এবং উজানের ঢল না নামায় গতকাল সিলেট অঞ্চলে কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি। তবে নদীগুলো এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পানি কমছে ধীরে। তবে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যদিও এখনও পানিবন্দি অবস্থায় আছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। গতকাল শুক্রবার পানিবন্দি মানুষের তথ্য নিশ্চিত করেছে সিলেট জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসন জানায়, দ্বিতীয় দফার বন্যায় সিলেটে ১০ লাখ ৪৩ হাজার ১৬১ জন মানুষ পানিবন্দি। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি ওয়ার্ডে বন্যাদুর্গত প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। ৭১৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছেন ২৮ হাজার ৯২৫ জন।
জেলা প্রশাসনের তথ্যে আরও জানা যায়, জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০২টি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও ওসমানী নগর উপজেলা।
গতকাল শুক্রবার বেলা ১২টা পর্যন্ত সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া তথ্যমতে, সিলেটের প্রধান দুটি নদী সুরমা ও কুশিয়ারার কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও আগে থেকে অনেকটা কমেছে পানি।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মোহাম্মদ সজীব হোসাইন জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। একইভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও কোনো বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, শুক্রবার দুপুর ১২টায় সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ও সিলেট পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর অমলসীদ পয়েন্টে ৫৫ সেন্টিমিটার ও শেওলা পয়েন্টে পানি ৫ সেন্টিমিটার এবং একই নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১০৩ ও শেরপুর পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, নতুন করে বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত আর পাহাড়ি ঢল না হলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
তবে অনেকে অভিযোগ করছেন বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধার কার্যক্রম ও ত্রাণ সহায়তা মিলছে না। পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাও বাড়ছে। এছাড়া দেখা দিয়েছে সাপের উপদ্রব।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং ৬০০ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতাও চলমান।
হবিগঞ্জে রাস্তা ভেঙে ঢুকছে পানি, ভেসেছে ১০ সড়ক
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে হবিগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে নবীগঞ্জ, মাধবপুর, লাখাই ও আজমিরীগঞ্জের বেশ কিছু গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। খোয়াই নদীর পানি কমতে শুরু করায় হবিগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। অন্যদিকে নবীগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কসহ ১০টি পাকা সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। অনেকেই ছুটছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক। নতুন করে দক্ষিণ কসবা গ্রামের পাকা সড়ক ভেঙে দ্রুত গতিতে বিভিন্ন গ্রামে পানি প্রবেশ করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়রা জানায়, খোয়াই নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। অন্যদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে কুশিয়ারা নদীর পানি। কুশিয়ারার পানি শেরপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ২১, বানিয়াচংয়ের মার্কুলি পয়েন্টে ৩৩ ও আজমিরীগঞ্জে ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরে উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ উপচে নবীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে পানি প্রবেশ করতে থাকে। এতে ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের রাজনগর, উমরপুর, মোস্তফাপুর, দক্ষিণগ্রাম, পাঠানহাটি, মনসুরপুর, দরবেশপুর, দিঘীরপাড়, নোয়াগাঁও, চন্ডিপুর, প্রজাতপুর, লামলীপাড়, দীঘলবাক ইউনিয়নের রাধাপুর, ফাদুল্লাহ, দুর্গাপুর, মথুরাপুর, হোসেনপুর, মাধবপুর, পশ্চিম মাধবপুর, গালিমপুর, আউশকান্দি ইউনিয়নের পাহাড়পুর, পারকুল, উমরপুর, দীঘর ব্রাহ্মণগ্রাম, বড় ভাকৈর (পশ্চিম) ইউনিয়নের সোনাপুর, চরগাঁও, বড় ভাকৈর (পূর্ব), করগাঁও, কালিয়াভাঙ্গা, দেবপাড়া ও কুর্শি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কসহ ১০টি পাকা সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল। কুশিয়ারা নদী ঘেঁষা ইনাতগঞ্জ ও দীঘলবাক ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করেছে পানি। ফলে মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করছে সাধারণ মানুষ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এমন অবস্থায় বন্যাকবলিতরা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছে। ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৯টিতে প্রায় ৩০০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি খাদ্য সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর দীঘলবাক ইউনিয়নের দক্ষিণ কসবা গ্রামের পাকা সড়ক ভেঙে দ্রুতগতিতে বিভিন্ন গ্রামে পানি প্রবেশ করছে। এতে মানুষ আতঙ্কে উৎকণ্ঠায় জীবনযাপন করছে।
বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ইনাতগঞ্জে অবস্থিত শেভরন পরিচালিত এশিয়া মহাদেশের অন্যতম গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা ও পারকুলে অবস্থিত কুশিয়ারা নদী ঘেঁষা বিবিয়ানা ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে। বিবিয়ানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে ৪-৫ ফুট নিচে বর্তমানে পানি রয়েছে। তবে দ্রুতহারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্যাসক্ষেত্রে পানি প্রবেশের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
যমুনার পানিতে তলাচ্ছে ফসলি জমি, ভাঙছে ঘরবাড়ি
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জের যমুনাসহ সব কটি নদীতে পানি বাড়ছে। ফলে শুরু হয়েছে নদীপাড়ে ভাঙন। বিগত ভাঙনের পর যেটুকু সম্বল বেঁচে ছিল সেটিও হারানোর আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন নদীপাড়ের শত শত ভাঙনকবলিত মানুষ।
ইতোমধ্যে চর ও নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। দ্রুতগতিতে পানি বাড়ার কারণে যমুনা নদীর চরাঞ্চলে ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তার পাশাপাশি বন্যা আতঙ্ক বিরাজ করছে চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে।
গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা হার্ড পয়েন্টে যমুনা নদীর পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৯৭ মিটার। ২৪ ঘণ্টায় ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে, কাজিপুর মেঘাই ঘাট পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৭১ মিটার। ২৪ ঘণ্টায় ২৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ১ দশমিক ৯ মিটার নিচ প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, যমুনা নদীতে আশঙ্কাজনকভাবে পানি বাড়ায় শাহজাদপুরের জালালপুর, খুকনী ও কৈজুরী ইউনিয়নে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। কয়েক দিনের ব্যবধানে দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভাঙনকবলিতরা।
ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, শাহজাদপুরের জালালপুর, খুকনী ও কৈজুরী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা ভয়াবহ ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি-জমি হারিয়েছেন। অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রতীক্ষার পর সরকার এ অঞ্চলে ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও ঠিকাদার ও পাউবোর গাফিলতিতে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হচ্ছে না। ফলে আবার ভাঙনের কবলেই পড়েছে এসব অঞ্চল। চলতি মৌসুমে জালালপুর ও কৈজুরী ইউনিয়নের শতাধিক বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান। নদীতে সব কিছু হারিয়ে বাস্তুহারা ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন ভাঙনকবলিত এসব মানুষ।
একই উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের পাঁচিল গ্রামের কৃষক ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘চরের জমিতে চাষাবাদ করে সারা বছর চলতে হয়। প্রত্যেক বছর বন্যায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। এক বিঘা জমিতে তিলের আবাদ করেছি। এখন দেখি পানি বাড়ছে। এভাবে পানি বাড়লে ৪-৫ দিনের মধ্যে জমি তলিয়ে যাবে।’
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘এই মুহূর্তে চরের জমিতে তিল ও পাট চাষ করা রয়েছে। কয়েক দিন ধরে যমুনা নদীতে পানি বাড়ছে। আমরা সব সময় খোঁজখবর রাখছি। কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘শাহজাদপুর উপজেলায় যমুনার ডান তীর সংরক্ষণের জন্য সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। কাজের মেয়াদ যদিও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। তবে কাজ শেষ না হওয়ায় আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।’
লক্ষ্মীপুরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই অভ্যুত্থান দিবস’-এর সংবর্ধনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হট্টগোল ও উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের এই সভা চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতির তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, অনুষ্ঠান চলাকালে লক্ষ্মীপুর শহর শিবিরের নেতা সারোয়ার হোসেন তাঁর বক্তব্য প্রদানকালে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন।
এ সময় সভাকক্ষে থাকা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানালে মুহূর্তেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের হট্টগোলে পুরো অনুষ্ঠানস্থলে এক বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার আগেই সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং হস্তক্ষেপর মাধ্যমে দুই পক্ষকে শান্ত করে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আনেন। হট্টগোলের কারণে জেলা প্রশাসনের সূচিমাফিক অনুষ্ঠান কিছু সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হলেও পরবর্তীতে নিরাপত্তা জোরদার করে তা পুনরায় শুরু করা হয়।
এ ঘটনায় লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান যে, বক্তব্যের একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে কিছুটা কথা কাটাকাটির সৃষ্টি হয়েছিল। তবে পুলিশের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং কোনো বড় ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হয়নি।
নেত্রকোণায় কিশোরীকে সাথে নিয়ে ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা এনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার রাতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে নেত্রকোণা মডেল থানায় এই নিয়মিত মামলাটি দায়ের করেন। অভিযুক্ত রিপন মিয়া নেত্রকোণা সদর উপজেলার দক্ষিণ বিশিউড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং বর্তমানে নন্দুরা গ্রামে বসবাস করছিলেন। ঘটনার পর থেকেই রিপন মিয়া আত্মগোপনে রয়েছেন এবং পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত শনিবার রাতে স্কুলছাত্রীটি বাড়িতে একা থাকাকালীন রিপন মিয়া সেখানে যান এবং তাকে জোরপূর্বক পার্শ্ববর্তী একটি জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করেন। শিক্ষার্থীর চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে অভিযুক্ত ব্যক্তি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। অভিযোগ উঠেছে যে, রিপন আগে থেকেই ওই কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করতেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর গত সোমবার রাতে স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে সালিসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ওই বৈঠকে রিপন নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন বলে জানা গেছে। সালিসে রিপনকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকা ছাড়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রিপন মিয়া সালিসে উপস্থিত সবার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছেন এবং বলছেন, "ভুল তো মানুষ করেই, আমি একটা ভুল কইরাইলছি।" তবে আইনি ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে স্থানীয়ভাবে এমন সালিস আয়োজনের সমালোচনাও উঠেছে। ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান দাবি করেছেন, ভুক্তভোগী পরিবার দরিদ্র হওয়ায় তারা গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বিচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে আইনি পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছেন। অন্যদিকে, রিপন মিয়ার স্ত্রী চম্পা আক্তার তাঁর স্বামীকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন।
নেত্রকোণা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের জানিয়েছেন, পুলিশ বিষয়টি জানার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারের জবানবন্দি গ্রহণ করেছে। মামলার পর থেকে পলাতক রিপন মিয়াকে খুঁজে বের করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, কাঠমিস্ত্রি থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়া রিপন মিয়া "আই লাভ ইউ, এটাই বাস্তব" সংলাপের মাধ্যমে ফেসবুকে ১৯ লাখ ফলোয়ার অর্জন করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। বর্তমানে এই গুরুতর অপরাধের অভিযোগে তাঁর দীর্ঘদিনের অর্জিত জনপ্রিয়তা ও ক্যারিয়ার বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই বাংলাদেশে ফিরে আসবেন বলে মন্তব্য করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে সরাইল উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন।
সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, শেখ হাসিনা এই দেশেরই একজন নাগরিক এবং দেশের রাজনীতিতে তাঁর ও তাঁর দলের দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে। তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছিল অন্যতম।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি যদি দেশে ফিরে না আসেন, তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর নিজের এতদিনের রাজনৈতিক ইতিহাসের কী হবে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সাধারণ রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি ও সার্বিক দিক বিবেচনা করে তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই দেশে ফিরে আসবেন।
গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে সবার হাতেই গণমাধ্যম রয়েছে, ফলে নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে আসলে কারো বক্তব্য প্রচার বন্ধ রাখা যায় না। এর আগে বিগত সরকারের আমলে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ করার বিষয়টি যদি অগণতান্ত্রিক হয়ে থাকে, তবে বর্তমান সরকারের এই একই সিদ্ধান্তও গণতন্ত্রের পরিপন্থি।
বক্তব্যের শেষভাগে সম্প্রতি ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকেই নির্দেশ করে। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলো যে তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং দেশ পুনরায় পুরোনো বিশৃঙ্খল রাজনীতির ধারাতেই ফিরে যাচ্ছে—এই ঘটনাগুলো তারই স্পষ্ট সংকেত দেয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অমর শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দেশের অর্জিত গণতন্ত্রকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। বুধবার সকালে বরিশালের নগরীর আমতলার মোড় এলাকায় নবনির্মিত ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে’ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মন্ত্রী প্রথমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। পরবর্তীতে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ যোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষ একে একে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “যেই বীর শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি, তাঁদের রক্তের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক লড়াইয়ের প্রধান লক্ষ্যই ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের মূল অভীষ্ট হলো শহীদদের এই মহান ত্যাগকে সার্থক করতে রাষ্ট্রীয় সকল স্তরে গণতন্ত্রের চর্চাকে স্থায়ী রূপ দেওয়া।
এই বিশেষ দিবসটি উদযাপনে বরিশালের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সাধারণ নাগরিকরা শহীদদের স্বপ্নের সাম্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার শপথ গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং আহত যোদ্ধারা অংশ নিয়ে তাঁদের অকুতোভয় সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করেন। দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরতে বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এক বিশেষ আলোচনা সভা এবং সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া দিনব্যাপী জেলাজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে স্মরণ করা হচ্ছে। মূলত আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রসারে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজ একযোগে কাজ করছে।
সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) কোম্পানির দুটি বড় তামাকের গুদামে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে আশুলিয়ার নলাম এলাকায় এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। অগ্নিনির্বাপণ কাজে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি বিশেষ ইউনিট নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্প পুলিশের চারটি দল ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে।
খবর পাওয়ার পরপরই প্রথমে জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তবে তামাকের শুকনো পাতার কারণে আগুনের তীব্রতা দ্রুত বেড়ে গেলে পরবর্তীতে ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের আরও দুটি এবং পার্শ্ববর্তী অন্য একটি ইউনিটও অভিযানে যুক্ত হয়। আগুনের ভয়াবহতা দেখে আশপাশের বাসিন্দারাও ঝুঁকির আশঙ্কায় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। গুদাম দুটিতে প্রচুর পরিমাণে তামাক মজুত থাকায় আগুন পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দীর্ঘক্ষণ বেগ পেতে হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন যে, সাড়ে সাতটা থেকে তারা আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছেন, তবে তামাকজাত দ্রব্যের প্রকৃতির কারণে আগুন নেভাতে বেশ সময় লাগছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং শিল্প পুলিশ পুরো এলাকা কর্ডন করে রেখেছে। আগুন পুরোপুরি নির্বাপিত হওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও আগুনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। মূলত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই অগ্নিকাণ্ডটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
দেশের ১২টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে আজ সন্ধ্যার মধ্যে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আজ বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য এই বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হকের সই করা এই পূর্বাভাসে পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চলকে বিশেষ নজরদারিতে রাখতে বলা হয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, উল্লেখিত এলাকাগুলোতে পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে, যার সাথে প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্ভূত আবহাওয়ায় নদীবন্দরের স্বাভাবিক চলাচল ও জানমালের নিরাপত্তা বিবেচনায় এই অঞ্চলগুলোর নদীবন্দরসমূহকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। মূলত মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতার কারণে এই আকস্মিক ঝড়ো হাওয়ার সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সকল নৌযান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আবহাওয়া পরিস্থিতির দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মূলত দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই এই আগাম সতর্কবার্তা প্রদান করেছে আবহাওয়া বিভাগ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উদযাপনকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জ জেলাজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলার স্পর্শকাতর ও জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি ৫ প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বুধবার গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত করে জানান যে, সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সব ধরনের কৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে গোপালগঞ্জে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও সরকারি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
সাধারণ নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষা প্রদানে প্রশাসনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে পুলিশ সুপার আরও বলেন, “সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।” আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমনের হুঁশিয়ারিও প্রদান করেন তিনি। মূলত দিবসটির কর্মসূচিগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতেই এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান জানিয়েছেন যে, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় ৫ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।” জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন ও দায়িত্ব পালন অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে জেলাজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় পরিলক্ষিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মানহানিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বহিষ্কৃত নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ বুধবার ভোরে রাজধানীর একটি এলাকা থেকে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান যে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও উসকানিমূলক মন্তব্যের দায়ে দায়ের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
দায়েরকৃত মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের ফেসবুক আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে একটি অত্যন্ত অবমাননাকর পোস্ট শেয়ার করা হয়। বিষয়টি বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফতুন আহমেদ খান রুবেলের নজরে এলে তিনি ২ আগস্ট রাতে বগুড়া সদর থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ওই পোস্টটি প্রধানমন্ত্রীর সম্মানহানি করার পাশাপাশি জনমনে উসকানি তৈরির উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, বিতর্কিত পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সমালোচনার মুখে একপর্যায়ে পোস্টটি মুছে ফেলা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। গ্রেপ্তারকৃত গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে বগুড়ায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে এবং সেখানে পৌঁছানোর পর পুলিশ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করবে। মূলত সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশের চার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ৭০ জনেরও বেশি, আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যক্ষসহ অন্তত ৭ জন, ঢাকা কলেজে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী এবং রংপরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ৭ জন মারাত্মকভাবে আঘাত পেয়েছেন। সব মিলিয়ে একদিনে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, সাংবাদিক, জকসুর শীর্ষ প্রতিনিধি ও ছাত্রনেতাসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি): জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী অনুষ্ঠান চলছিল। এ সময় জকসুর কয়েকজন প্রতিনিধি ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবা উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
এতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দিলে বাগবিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তা ব্যাপক সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস ও জবি শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি আব্দুল আলীম আরিফ, জবি ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহীন মিয়া, ছাত্রদল নেতা ইয়াসিন সাইফ এবং কয়েকজন সাংবাদিকসহ ৭০ জনেরও বেশি আহত হন। সংঘর্ষটি ক্যাম্পাস থেকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত গড়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারেও ভাঙচুর চালানো হয়।
জকসু জিএস ও ছাত্রশিবির সভাপতি আব্দুল আলীম আরিফ বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি তুলে ধরতে গেলে আমাদের বাধা দেওয়া হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায় এবং মেডিকেল সেন্টারে ভাঙচুর করে। এ হামলার পেছনে কয়েকজন শিক্ষকেরও মদদ ছিল। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিচার ও প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করছি; অন্যথায় আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
জবি শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন বলেন, জকসুর ব্যর্থতা ও সারাদেশে জামায়াত-শিবিরের অপকর্ম ঢাকার জন্য তারা এসব করছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো তারা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও মব করার চেষ্টা করছে। ৫ই আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তারা মব কালচার চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিরোধ করেছে, কারণ তারা আবাসন সুবিধা থেকে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করতে চেয়েছিল।’
জবি ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহীন মিয়া বলেন, হামলায় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন। আমার মুখে, নাকে, পায়ে ও হাতে লাথি মারা হয়েছে। তারা নির্বিচারে আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখসহ কয়েকজন সদস্যকে আহত করেছে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসীভ বলেন, প্ল্যাকার্ড নিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যানের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। প্রশাসনের নীরব ভূমিকার কারণেই ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এই দখলদারত্বের রাজনীতি বন্ধে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক নাসির উদ্দীন বলেন, অডিটোরিয়ামে জুলাইয়ের একটি প্রোগ্রাম চলাকালে বাইরে একটি গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। আমরা ধারণা করছি, জুলাইবিরোধী শক্তি এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। এতে ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হবে।’
ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. মকবুল হোসেন বলেন, মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৭০ জনেরও বেশি আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং আরও আহত রোগী আসছেন।
সূত্রাপুর থানার ওসি মতিউর রহমান বলেন, সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে।
ঢাকা কলেজ: মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসের গ্যালারি-২ এলাকায় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ হয়। পরবর্তীতে বেলা দেড়টার দিকে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে মিছিল ও মূল ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ মামুন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে কলেজের গ্যালারি-২-এ শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেকের নেতৃত্বে ৫ ও ৬ নম্বর গ্যালারিতে সাজসজ্জার কাজ চলছিল। এ সময় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভেজ মোশারফের নেতৃত্বে ২০-২৫ জন এসে মারধর করে। এতে আব্দুল মালেক মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং তাকে পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ছাত্রদল কর্মী রাসেল বলেন, সকালে শিবিরের একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বহিরাগত শিবির কর্মীরা ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে উসকানিমূলক কথাবার্তা বলে এবং ছাত্রদলের এক কর্মীকে মারধর করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করে। পরে শিবিরের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে ধাওয়া দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া (আলিয়া মাদ্রাসা): মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে বকশীবাজারে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া চত্বরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে সামনের সড়কে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। এতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হকের মাথায় আঘাত লাগে এবং সাংবাদিকসহ অন্তত ৭ জন আহত হন।
আহত ছাত্রদল নেতা নিছার উদ্দিন রাব্বি বলেন, আমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নই। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাদ্রাসা চত্বরে বসে থাকাকালে শিবিরের নেতাকর্মীরা অতর্কিত লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা চালায়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি): গত সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোটা নিয়ে সংঘাত চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে শিবির এবং পার্ক মোড়-সংলগ্ন সড়কে ছাত্রদল অবস্থান নিলে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ছাত্রদলের সহসভাপতি আশিকুর রহমান রক্তাক্ত হওয়াসহ অন্তত সাতজন আহত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক শিবলী সাদিক বলেন, আমাদের ‘জুলাই জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ প্রদর্শনীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার কয়েকজন নেতার ছবি ছিল। ছাত্রদল জোর করে ব্যানার নামিয়ে ফেলতে চাপ দেয়। আমরা প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে বললেও তারা তা না মেনে হামলা চালায়। পরে প্রক্টর এলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়, কিন্তু তারা আবার বহিরাগত মহানগর ছাত্রদল নিয়ে এসে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলা হলে আমরা প্রতিহত করব, নতুবা বহিরাগতরা চলে গেলে আমরাও প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ক্যাম্পাস ত্যাগ করব।
বেরোবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন বলেন, শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাসে শিবিরের প্রদর্শনীতে খালেদা জিয়ার ছবির পাশে গোলাম আজম, কাদের মোল্লা ও মতিউর রহমান নিজামীর মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের ছবি টাঙানো হয়েছিল। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার বলা হয়। ছবিগুলো সরাতে বললে তারা চেয়ার নিক্ষেপ ও হামলা চালিয়ে আমাদের সহসভাপতি আশিককে রক্তাক্ত করে। পরবর্তীতে কারমাইকেল কলেজ থেকে বহিরাগত শিবির এনে হামলা চালানো হয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই নিয়ে কোনো আপস করব না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, সংঘর্ষে জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হবে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাজহাট থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ দ্রুত ক্যাম্পাসে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি, তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দুই পক্ষের নেতাদের নিয়ে উপাচার্য বৈঠক করছেন।
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকায় দুই তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের দায়ে ছয় যুবককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) এ রায় ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. এরশাদ আলম (জর্জ) বলেন, আমৃত্যু কারাদণ্ড হলো সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বাকি জীবন কারাগারে কাটাতে হবে।
কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন রাহুল মো. ডায়মন্ড, আফসার উদ্দিন অনিম, পারভেজ হক পলাশ, মিনহাজ ওরফে মিনহাজ আবেদীন এবং মিনহাজ ওরফে বাবু ওরফে মিনহাজ বাবু। তাদের সবার বয়স ২৫ এর নিচে।
দণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে দেওয়ার জন্য ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ ও অপরাধের ধরন বিবেচনায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এ কারণে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রাহুল পলাতক রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। রায় শেষে অপর আসামিদের সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, দুই তরুণীসহ তাদের কয়েকজন বন্ধু ২০২২ সালের ২৫ জুন বিকেলে এক বন্ধুর জন্মদিন উদ্যাপন করতে ঘুরতে বের হন। রাত পৌনে ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জের পানকৌড়ি রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া শেষে বাসায় ফিরতে শুভাঢ্যা এলাকায় অটোরিকশা খুঁজছিলেন তারা। এ সময় একটি অটোমিশুক নিয়ে আসামিরা তাদের পথরোধ করে। আসামিরা তাদের মারতে মারতে রতনের খামার নামক স্থানে নিয়ে দুই তরুণীর বন্ধুদের মারধর করে টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। এরপর ওই দুই তরুণীকে ধর্ষণ করে আসামিরা। ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে তারা। এদিকে দুই তরুণীর বন্ধুরা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানান। পুলিশ গিয়ে দুই তরুণীকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় এক তরুণীর বাবা ২০২২ সালের ২৯ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলার পর মিনহাজ আবেদীনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তার কাছ থেকে এক তরুণীর মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। মোবাইলে ভুক্তভোগী দুই তরুণীর ধর্ষণের ভিডিও পাওয়া যায়।
মামলার তদন্ত শেষে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক শরজিৎ কুমার ঘোষ ৬ যুবকের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। মামলার বিচার চলাকালে ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার রাড়িপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম চান্দেরখোলা গ্রামে নিজ বসতঘর থেকে একই পরিবারের তিনজনের গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে মরদেহ উদ্ধারের পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কচুয়া থানার ওসি হারুন আর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিহতরা হলেন- আহাত হাওলাদার (২২), তার মা মনিরা বেগম (৫৫) এবং নানি রাশিদা বেগম (৮৫)। আহাত কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা আব্দার হাওলাদারের ছেলে। মনিরা বেগম মৃত রশিদ শেখের মেয়ে এবং রাশিদা বেগম মৃত রশিদ শেখের স্ত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দা বুলু বেগম জানান, বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বের হতে দেখে তার সন্দেহ হয়। পরে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ঘরের ভেতরে গলিত মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে কচুয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
ওসি হারুন আর রশিদ বলেন, মরদেহগুলোর মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি দুই থেকে তিন দিন আগে ঘটেছে বলেও ধারণা করছি। বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা না থাকায় বিষয়টি এতদিন কারও নজরে আসেনি।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
মাসে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় মানবপাচারের অভিযোগে এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত সোমবার (৩ আগস্ট) রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- খুলনা মহানগরীর মহেশ্বরপাশা মধ্যপাড়ার মো. জিহাদ আলী লস্কর এবং তার স্ত্রী সুমাইয়া সুমি ওরফে সুমি আক্তার। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) তাদের আদালতে হাজির করা হলে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআই জানায়, জিহাদ আলী লস্কর দীর্ঘদিন কম্বোডিয়ায় অবস্থান করে স্থানীয় কয়েকজনকে মাসে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির আশ্বাস দেন। তার কথায় বিশ্বাস করে প্রতিবেশী মোসতাকীম হাসান কাজী ও শেখ মনিরুল ইসলাম মুকুল জনপ্রতি ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা করে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা জিহাদ ও তার স্ত্রীর কাছে দেন।
পরবর্তীতে তাদের কম্বোডিয়ায় নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নিয়ে ভুক্তভোগীদের মেয়েদের পরিচয়ে কণ্ঠ পরিবর্তন করে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে অনলাইনে প্রতারণামূলক কথোপকথনসহ বিভিন্ন অবৈধ কাজে বাধ্য করা হয়। এ সময় তাদের কোনো বেতন দেওয়া হয়নি এবং অমানবিক পরিবেশে রাখা হয়।
একপর্যায়ে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে ভুক্তভোগীরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে স্বজনদের সহায়তায় দেশে ফিরে এসে তারা পৃথকভাবে খুলনার দৌলতপুর থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৭/২২ ধারায় দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলাগুলোর তদন্তভার পায় পিবিআই খুলনা।
তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে হেমায়েতপুর থেকে অভিযুক্ত দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআইয়ের তদন্তে আরও জানা গেছে, একই কৌশলে এলাকার আরও কয়েকজনকে কম্বোডিয়ায় পাঠিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। এ ঘটনায় একই এলাকার আরও দুই ব্যক্তি পৃথক দুটি মামলা করেছেন।
পিবিআই খুলনার বিশেষ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, ‘বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে পিবিআই ‘‘জিরো টলারেন্স’’ নীতিতে কাজ করছে। এ ধরনের অপরাধে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’ তিনি জানান, মামলার অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌপুলিশ। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুর ও বিকালে পৃথকভাবে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একজনের পরিচয় শনাক্ত হলেও অপরজনের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
নৌপুলিশ জানায়, মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওয়াশপুর ঝাউচর খেয়াঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে বসিলা নৌপুলিশ ফাঁড়ি। পরে তার পরিচয় শনাক্ত হয়। নিহতের নাম হৃদয (৩৪)। তিনি বসিলা উত্তর মোড়া এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে। হৃদয় স্টেট ফাস্ট কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বসিলা নৌপুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক ওমর আলী জানান, মরদেহটি প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করা হয়। পরে নিহতের পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের সিম কার্ডের সূত্র ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মর্গে এসে হৃদয়ের পরিচয় নিশ্চিত করেন।
মরদেহ উদ্ধারকারী বসিলা নৌপুলিশের এএসআই আজহার আলী জানান, নিহতের ছোট ভাই আকাশের ভাষ্য অনুযায়ী, হৃদয় দুই দিন আগে কাজের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
অন্যদিকে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার কোন্ডা ইউনিয়নের কান্দাপাড়া খেয়াঘাটসংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝখান থেকে ভাসমান অবস্থায় এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পাগলা নৌপুলিশ ফাঁড়ি।
পাগলা নৌপুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ মালেক বিশ্বাস জানান, স্থানীয়দের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর।
সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহতের ডান পা বিচ্ছিন্ন, বাম পা ও ডান হাত ভাঙা ছিল। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। উদ্ধারের সময় মরদেহে কোনো পোশাক ছিল না।
নৌপুলিশ জানায়, দুটি মরদেহই ময়নাতদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় বসিলা ও পাগলা নৌপুলিশ বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় পৃথক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।