শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে রোববার ঝিনাইদহ, নাটোর, নওগাঁ, নড়াইলসহ সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ঝিনাইদহে ৩০, নড়াইলে ২০, ঢাকার কেরানীগঞ্জ ৫০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় থানায় হামলা, পুলিশ বক্স ভাঙচুর, পোস্ট অফিস, পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন
নাটোর: নাটোরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শহরের ভবানীগঞ্জ মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী দুপুর ১২টায় শহরের মাদ্রাসা মোড় এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় তারা। সকাল থেকে অল্প অল্প করে আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে শুরু করে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে প্রায় দুই শতাধিক আন্দোলনকারী জমায়েত হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মীরা তাদের প্রতিহত করতে ধাওয়া দেয়। এ সময় আন্দোলনকারীরাও তাদের ধাওয়া দিলে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে মারধর করে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
অন্যদিকে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার দিকে দয়ারামপুর বাজার এলাকায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ জনতা সড়কে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দেয়।
নওগাঁ: নওগাঁয় বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছে আন্দোলনকারীরা। রোববার সকাল ১০টা থেকে শহরের কাজীর মোড়ে জড়ো হতে শুরু করেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে অংশ নেন আরও অনেকে। পরে আন্দোলনকারীরা প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় এক দফা দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে শোনা যায় তাদের। এতে বন্ধ হয়ে যায় প্রধান সড়ক দিয়ে যানচলাচল।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা শহরের সরিষাহাটির মোড়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় পথচারীদের। বিশেষ করে অটোরিকশা চালকদের। অনেক পথচারীকে হেঁটে বিকল্প রাস্তা দিয়ে যেতে দেখা যায়। মোটকথা পুরো শহরে আতঙ্কের পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে যাত্রীদের চলাচলের জন্য ভারী যানবাহন।
এদিকে সাধারণ পথচারীদের সতর্ক করতে দোকান বন্ধ করে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছিল দোকানদার আকাশসহ অনেক ব্যবসায়ী। তারা জানান, পথচারীরা যেন কোনো বিপদের সম্মুখীন না হয়, তাই তাদের সতর্ক করে বিকল্প পথে যেতে বলছি।
দুপুরের দিকে পার্টি অফিস থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীদের দিকে আসতে চাইলে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) গাজিউর রহমান বলেন, আন্দোলন ও বিক্ষোভের শুরু থেকেই পুলিশ তাদের সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলন করার জন্য বলেছে। তাদের প্রতি পুলিশ সহনশীল আচরণ করছে। শিক্ষার্থীদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে জন্য তাদের নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। মোটকথা শহরে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার সময় পুলিশসহ ৩০ জন আহত হয়েছেন। আন্দোলনকারীরা রোববার বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সারা শহরে তাণ্ডব চালায়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা যোগ দেয়।
শিক্ষার্থীরা সকালে শহরের মুজিব চত্বর থেকে এবং বিএনপি হাটের রাস্তা থেকে মিছিল বের করেন। তারা পায়রা চত্বরে এসে একসঙ্গে মিলিত হয়। মিছিল থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর, থানায় হামলা, পুলিশ বক্স ভাঙচুর, পৌরসভা, ছবি তোলার সময় সাংবাদিক কাজী আলী আহমেদ লিকুর ওপর হামলা চালায়। এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সফিকুল ইসলাম অপুর বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ইটপাটকেল ছুড়ে হামলা চালায়। পুলিশ বাঁধা দিলে শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া। সে সময় পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানি গ্যাস ও শর্টগানের গুলি ছোড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। একপর্যায়ে সারা শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। ইটের আঘাতে পুলিশের এসআই শরিফুজ্জামানের মাথা ফেটে গেছে। আহতদের মধ্যে ২৪ জনকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন। সকাল থেকে যানবাহন চলাচল করেনি। দোকানপাট খোলেনি। পুলিশি নিরাপত্তায় অফিস-আদালত চলেছে এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নড়াইল: বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে রোববার বেলা ১১টায় নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের মাদ্রাসা বাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। মিছিলে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী যোগ দেয়। মিছিলটি শহরে প্রবেশের চেষ্টা করলে চিত্রা নদীর শেখ রাসেল সেতুর ওপর উঠলে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বাধা দেয়। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এতে ২০ জনের মতো আহত হন। এ সময় ঢাকা-বেনাপোল ভায়া নড়াইল মহাসড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সংঘর্ষে পুলিশের টিয়ারসেল নিক্ষেপের পাশাপাশি কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। এত আল নাহিয়ান প্রিন্স নামে এক যুবলীগ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রিন্স নড়াইল পৌরসভার আলাদাতপুর গ্রামের শেখ আবু বক্করের ছেলে।
সীমাখালী গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী মিজান মোল্লা, মিলি খানম, শিমুল হাসান জানান, সেতুর দক্ষিণ পাশেই আমার বাড়ি। অনেক বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের ছেলেরা রাস্তার ওপর ইট ভেঙে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারছিল। এদের হাতে হ্যান্ড মাইকও ছিল। পানি খেতে চাইলে আমরা তাদের পানি পানের ব্যবস্থা করেছি। ওরা পানি পানের সময় বসে পান করছিল। ওদের কাউকে চিনি না।
প্রিন্স জানান, ‘চিত্রা নদীর উত্তর প্রান্তে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেয়। আর সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে বিএনপি-জামায়াত শিবিরের নেতা-কর্মী অবস্থান নেয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপের একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এ সময় অন্য প্রান্ত থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয়। একটি বুলেট আমার পেটে লেগে বের হয়ে যায়। সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আকাশ ঘোষ রাহুলসহ উভয়পক্ষের ২০ জন আহত হন।
এদিকে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন এমন খবর ভেসে বেড়ালেও এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা): ঢাকার কেরানীগঞ্জে আন্দোলনকারী ছাত্রদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে মডেল থানার ঘাটারচর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এ সময় আন্দোলনকারীরা বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ি, ব্যক্তিগত অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে নেতাদের অবরুদ্ধ করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় আওয়ামী লীগের ডজনখানেক নেতা-কর্মী গুরুতর এবং বেশ কিছু আন্দোলনকারী সামান্য আহত হয়। এর আগে (রোববার) সকালে কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন ঘাটারচর এলাকায় গত ২১ জুলাই কোটা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত ইস্পাহানি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী রিয়াজ নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ও অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে কেরানীগঞ্জের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা আটি ভাওয়াল উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাতে বাধা দেয়। বাধা উপেক্ষা করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা মিছিল নিয়ে সামনে অগ্রসর হলে বড় মনোহরিয়া চৌরাস্তা এলাকায় ছাত্রদের মিছিলের ওপর পেছন থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। এতে মুহূর্তেই সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে তারা সংগঠিত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া দিলে নেতা-কর্মীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে বিভিন্ন দোকানপাটের ভেতরে আশ্রয় নেয়। এ সময় মডেল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবু সিদ্দিক ও তারানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন ফারুক অবরুদ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ছয়টি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও পাঁচটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। এ ছাড়া স্থানীয় চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ফারুক এবং আওয়ামী লীগ নেতা আবু সিদ্দিকের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে তাদের ব্যবহৃত গাড়ি পুড়িয়ে দেয়।
এর কিছুক্ষণ পরে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা পুনরায় সংগঠিত হয়ে আবারও ছাত্রদের ধাওয়া দিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধাওয়া দিলে তারা ঘাটারচর এলাকায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের ভেতরে আশ্রয় নেয়। পরে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ঘেরাও করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং প্রধান ফটকে আগুন লাগিয়ে দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ভবনের দ্বিতীয় তলার ছাদের ওপর গিয়ে আশ্রয় নিলে উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা ছাদের গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাদের গণধোলাই দেয়। এ সময় হুড়োহুড়ি করে ভবনের ভেতর ঢুকতে গিয়ে ও ভবনের ওপর থেকে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ছোড়া ইটের আঘাতে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। পরে ভবনে আটকে থাকা অন্তত ১০-১৫ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী আন্দোলনকারীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
খুলনা: খুলনায় আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। রোববার বেলা ১২টার দিকে খুলনার শঙ্খ মার্কেটের জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও জাতীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে নানা রকম স্লোগান দিতে থাকেন। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা নগরীর শিববাড়ি মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। বর্তমানে ওই মোড়ে প্রায় ৫/৭ হাজারের কাছাকাছি শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একদল শিক্ষার্থী শিব বাড়ি থেকে মিছিল সহকারে খুলনার আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে রওনা হয়ে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটায়।
সিলেট: সিলেটের বন্দরবাজারের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ চলছে। বেলা ১২টার দিকে এ সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যাপক টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেণেড ছুঁড়ছে। জানা যায়, অসহযোগ চলাকালে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বেলা ১১টার দিকে নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় জড়ো হয় আন্দোলনকারীরা। এতে শিক্ষার্থীদের সাথে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষও যোগ দেন। এই এলাকায়ই জেলা প্রশাসক কার্যালয়, পুলিশ সুপার কার্যালয়, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস রয়েছে। আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেওয়ার আগে থেকেই এ এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সাজোয়া যান নিয়ে অবস্থান নেয়। বেলা ১২টার দিকে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের থামাতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেণেড ছুঁড়ছে। এক পর্যায়ে পুলিশের বাধা পেয়ে মূল সড়ক ছেড়ে আশপাশের গলিতে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা।
মোংলা (বাগেরহাট): মোংলা-খুলনা মহাসড়কের ফয়লা এলাকায় (বাগেরহাটের রামপাল) আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। চলমান ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন দেয় আন্দোলনকারীরা। এ সময় সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে আহত হয়েছেন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সাংবাদিক সবুর রানা ও সুজন মজুমদার।
এদিকে অসহযোগ আন্দোলনের অংশ নিয়ে মোংলা-খুলনা মহাসড়কের ভাগা এলাকায় সকালে বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। রবিবার বেলা সাড়ে ১১টায় বের হওয়া মিছিল শেষে মহাসড়কে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। পরে পুলিশ ও আন্দোলনকারীরা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া জড়িয়ে পড়েন।
দিনাজপুর: জাতীয় সংসদের হুইপ ও দিনাজপুর সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম এমপি ও বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের বাসা ভাংচুর ও আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধরা। এ সময় পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যানে আগুন জ্বালিয়ে দেয় তারা। রাবার বুলেট ও কাঁদলে গ্যাস ছুটছে পুলিশ। সদর হাসপাতাল, জোড়া ব্রীজ, ফুলবাড়ি বাসস্ট্যান্ড, লিলির মোড়, বাহাদুর বাজার, স্টেশন রোড, কাচারী রোড, মডার্ণ মোড়, বুটিবাবুর মোড়, মুন্সীপাড়াসহ সারা শহরে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। শত শত রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল ছুড়েছে পুলিশ। এসব ঘটনায় ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছে অর্ধশত ব্যক্তি।
সকাল ১০টায় দিনাজপুর ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে আন্দোলনকারী জমায়েত হতে শুরু করে। তারা মিছিল নিয়ে শহরের হাসপাতাল মোড়স্থ হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি ও বিচারপতি ইনায়েতুর রহিমের বাড়ির দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে পুলিশের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। দিনাজপুরের পুলিশ সুপার শাহ ইফতেখার আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশ আন্দোলনকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। দীর্ঘসময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা হুইপ ও বিচারপতির বাড়ীতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তারা বাড়ীতে থাকা কয়েকটি মোটরসাইকেল বের করে বাসার গেটে এনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। জানা গেছে, ধাওয়া পাল্টা দেওয়ার সময় এবং রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। ১০ জনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সারা শহরজুড়ে থেমে থেমে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। শহরের মোড়ে মোড়ে এখন আগুন জ্বলছে। এসব ঘটনা চলাকালে শহরের কোথাও সেনা সদস্য বা বিজিবির উপস্থিতি দেখা যায়নি। এর আগে শহরের পলিটেকনিক মোড়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও গ্রাফিতি অঙ্কন করে শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিল নিয়ে শহরের দিকে অগ্রসর হলে এ সংঘর্ষে সুত্রপাত হয়।
নেত্রকোনা: নেত্রকোনায় রোববার সকাল ১০টা থেকে সরকার বিরোধী আন্দোলনকারী ও সরকারের পক্ষের সমর্থক সহ নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। শহরের সাতপাই, নাগড়া সহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জেলার শ্যামগঞ্জ বাজারের একাধিক বাসিন্দা জানান, নেত্রকোণা-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে আন্দোলনকারীরা। এসময় পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে আন্দোলনকারীরা।
নোয়াখালী: নোয়াখালীতে রোববার সকাল থেকেই জেলা শহর মাইজদীর প্রধান সড়কে অবস্থান নেয় বিক্ষোভকারীরা। এসময় তাদের বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে রাস্তায় আগুন দিতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় এখন কোথাও পুলিশি তৎপরতা দেখা যায়নি। সকাল ১০ টার দিকে নোয়াখালী-৪(সদর-সুবর্ণচর) আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী তার অনুসারী নেতা-কর্মীদের নিয়ে পুড়ে যাওয়া জেলা আওয়ামী লীগ অফিস দেখতে আসেন। এসময় বিক্ষোভকারীদের সাথে তাদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনা যায়। একপর্যায়ে এমপি একরাম সহ তার অনুসারীরা ব্যর্থ হয়ে জেলা শহর থেকে চলে যান। শহরেরর সব কটি সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবস্থান করে বিক্ষোভকারীরা।
বেলা সাড়ে ১১টার সময় সেনাবাহিনীর গাড়ী টহল দেওয়ার সময় আন্দোলনকারীরা ‘এ মুহূর্তে দরকার সেনাবাহিনীর সরকার’- স্লোগান দেয়।
কালিয়াকৈর (গাজীপুর): গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গতকাল রোববার দিনব্যাপী সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগানে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা ৩টি পুলিশ বক্স, আওয়ামী লীগের অফিস, থানার সামনে রাখা গাড়িসহ বেশকিছু যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে। এক পর্যায় পুলিশ ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের হামলায় ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও পুলিশের গুলিতে শিশুসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। থমথমে বিরাজ করছে কালিয়াকৈর।
চুয়াডাঙ্গা: চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে কর্মসূচি পালন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। এসময় জেলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে গেলে বাধার মুখে পড়েন তারা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ তোলেন। রোববার সকাল থেকে জেলাজুড়ে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সকাল থেকে চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সড়কের ভালাইপুর বাজারে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। এসময় তারা একদফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যান চলাচল বন্ধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। সড়কের দু’পাশে সৃষ্টি হয় যানজট।
একই সাথে শহরের কোর্টমোড় এলাকাতেও বিক্ষোভ করতে গেলে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এসময় তাদের ব্যানার ছিড়ে ফেলা হয়। শহরের হাসপাতাল সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। দর্শনা শহরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীরা বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হলে তাদের ওপরেও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এছাড়া জেলার বদরগঞ্জ, জীবননগর ও আলমডাঙ্গাতেও সড়কে নামে আন্দোলনকারীরা। এমন পরিস্থিতিতে জেলাজুড়ে আতঙ্ক ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
ভৈরব (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আন্দোলনকারীদের সাথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ প্রায় শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। এসময় কমপক্ষে অর্ধশত আহত হয়। রোববার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও স্থানীয় বাসস্ট্যান্ড, জগনাথপুর এবং কালিকাপ্রসাদ এলাকায় এ সংঘর্ষ চলে। এসময় আন্দোলনকারীরা কয়েকটি বাড়ীঘর দোকানপাট ভাংচুর করে। তবে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দেখা যায়নি। স্থানীয় বিএনপির কিশোর যুবকদের আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায়। তারা দুপুর দেড়টার দিকে ভৈরব থানা আক্রমণ করতে চেষ্টা করলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মিলে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদি হত্যা মামলার চার্জশিটে নির্দেশদাতা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পি বর্তমানে ভারতের কলকাতায় পুলিশ পরিচয়ে আত্মগোপনে রয়েছে বলে এরই মধ্যে নিশ্চিত করেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
ডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাপ্পি এখন কলকাতায় আছে। তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অবৈধপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দ্বিতীয় বিয়ে করে। মাদারীপুরের শিবচরের এক মেয়েকে বিয়ে করে তাকে নিয়ে আবারও অবৈধপথে ভারতে চলে যায়। সেখান থেকেই হাদি হত্যার পুরো মিশন পরিচালনা করে।’
ডিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বাপ্পি ভারতে পালিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতা তার সঙ্গে রয়েছে। কলকাতার রাজারহাটের ওয়েস্ট বেড়াবেড়ি মেঠোপাড়া এলাকার ঝনঝন গলির একটি চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনি আত্মগোপনে আছেন। গত ৬ জানুয়ারি রাতেও তিনি সেখানেই ছিলেন বলে ডিবি সূত্রে জানা যায়।
এর আগে গত ৬ জানুয়ারি আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে বাপ্পি ছাড়াও শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনসহ ৫ জন পলাতক রয়েছেন। চার্জশিটে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণেই এ হত্যাকাণ্ড।
ডিবি কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্তরা অবৈধ পথে ভারতে গেছে। তাদের অবস্থানের অফিসিয়াল তথ্য-প্রমাণ নেই। ফলে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় ইন্টারপোলের কাছে সহায়তা চাওয়া যাচ্ছে না। আদালতের অনুমতি পেলে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় হাদির মাথায় গুলি করা হয়। গুরুতর আহত হাদিকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এরপর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের করা মামলায় তদন্ত চালিয়ে ডিবি এ চার্জশিট দাখিল করে।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, হামলার পর শুটার ফয়সাল ও আলমগীরকে নির্বিঘ্নে ভারতে পালানোর ব্যবস্থা করে বাপ্পি।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ব্রিজ নির্মাণের আগে মাটি পরীক্ষায় গ্যাস বের হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় গ্যাস নির্গমন আপাতত বন্ধ করে রাখা হয়েছে। গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বিকেলে উপজেলার চরকিং ইউনিয়নের ভৈরব বাজার-সংলগ্ন এলাকার একটি খালের পাড়ে এ ঘটনা ঘটে।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হেলফ প্রকল্পের আওতায় ৪৫ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ব্রিজ নির্মাণের কাজ পেয়েছেন ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম শেখ। কাজটি তদারকি করছে হাতিয়া উপজেলা এলজিইডি। গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তুতি হিসেবে ওই স্থানে প্রায় ১১২ ফুট গভীর সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করেন ঠিকাদারের শ্রমিকরা। সয়েল টেস্ট শেষে তারা স্থান ত্যাগ করেন। পরদিন শুক্রবার বিকেলে হঠাৎ ওই স্থান থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। ওই সময় স্থানীয়রা আগুন ধরালে গ্যাসে আগুন জ্বলে ওঠে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক-জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়।
স্থানীয় বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আসলে এটা কীভাবে হচ্ছে বা এটি সত্যিকারের গ্যাস কি না আমরা বুঝি না। নিজের চোখে আগুন জ্বলতে দেখেছি। লোকজন আগুন ধরিয়ে দেখান। যদি এটা সত্যিই প্রাকৃতিক গ্যাস হয়, তাই বিষয়টি পরীক্ষা করা জরুরি।’
হাতিয়া উপজেলা প্রকৌশলী এমদাদুল হক গ্যাস বের হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘গ্যাস বের হওয়ার পর তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বিষয়টি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড—বাপেক্সকে জানানো হবে।’
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আলাউদ্দিন বলেন, ‘একটি জায়গা থেকে বোরিং করার পরে সেখান থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না অনেক বেশি গ্যাস জমা আছে। তবে নিচে অবশ্যই কিছু শক্তি জমা আছে, এটা তারই প্রতিফলন। এখন এটা এক্সপার্ট ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেছেন, সবাই যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হলে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হলে এ দেশে আর কোনো স্বৈরাচারী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বঞ্চনা ও নির্যাতনের ফল।’ গতকাল শনিবার দুপুরে রক্তদান সংগঠন সন্ধানী কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ইউনিটের পুনর্মিলনী ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ড. সায়মা ফেরদৌস বলেন, ‘দেশের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ বিরল দৃষ্টান্ত। রাজপথে তার দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার অবস্থানের কারণেই আজ আমরা স্বৈরাচারমুক্ত দেশ গড়ার পথে এগোতে পেরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আবু সাঈদের বিশ্বাসে ভরা বুক, মুগ্ধের তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি খাওয়াতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ এবং ওয়াসিমের আত্মত্যাগ—এসবের যথাযথ মূল্যায়ন আমাদের করতেই হবে। জুলাইকে হেরে যেতে দেওয়া যাবে না।’
ড. সায়মা ফেরদৌস বলেন, ‘এ দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় বারবার রক্ত দিয়েছে। আমরা পরিবর্তনের কথা বলি, কিন্তু সেই পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়। যার যার অবস্থান থেকে সৎভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করলেই পরিবর্তন সম্ভব।’
ভোটাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভোটের অধিকার মানে—আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকেই দেব। এটি প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার, যা দীর্ঘদিন ধরে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।’ তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ভোটের গুরুত্ব বোঝতে হবে। যারা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন করবে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখবে, পাহাড় ও সমতলের মানুষকে একই বাংলাদেশি প্ল্যাটফর্মে আনবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে—বিবেচনা ও বিবেকের আলোকে তাদেরই ভোট দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশপ্রেম তখনই জাগ্রত হয়, যখন রাষ্ট্র দেশপ্রেমকে মূল্যায়ন করে।’
কুমিল্লার প্রতি আবেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি গর্ববোধ করি আমি কুমিল্লার মেয়ে। কুমিল্লায় যতবারই আসি, ততবারই মনে হয় নিজের ঘরে ফিরে এসেছি।’
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান তাইবুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সন্ধানী কুমেক ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক আসিফ মোস্তফা। শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন ডা. সাঈদ মো. সারোয়ার।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম, সিনিয়র সহসভাপতি আমিরুজ্জামান ভুঁইয়া এবং মহানগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রিয়াজুদ্দিন রিয়াজ।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন কুমেকের উপাধ্যক্ষ ডা. সজীবুর রশিদ, ড্যাব কুমেক শাখার সভাপতি ডা. মিনহাজুর রহমান তারেক, সাধারণ সম্পাদক ডা. রফিকুর রহমানসহ চিকিৎসক ও সাবেক সন্ধানিয়ান নেতারা।
শেরপুর ও জামালপুরের সাংবাদিকদের নিয়ে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) উদ্যোগে দুদিনব্যাপী নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতাবিষয়ক প্রশিক্ষণের সমাপনী ও সনদ বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বিকেলে শেরপুর জেলা প্রশাসনের তুলশীমালা ট্রেনিং সেন্টারে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ।
ওই সময় তিনি বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকালীন সময়ে কোনোভাবে সাংবাদিকদের দ্বারা যাতে কোনো বিচ্যুতি না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষিত করা বা আইন-কানুনে আরও দক্ষ করতে পিআইবি এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকর্মীদের অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। সেটি সঠিকভাবে পালনে তাদের ভূমিকা রাখতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্ম যে সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ করেছেন তার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। এই লড়াইয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে, এ সাহসিকতা ধারণ করেই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে।’
প্রশিক্ষণে রিসোর্স পারসন হিসেবে ছিলেন- পিআইবির প্রশিক্ষক জিলহাজ উদ্দিন নিপুন, এটিএন বাংলার চিফ রিপোর্টার একরামুল হক সায়েম ও জাতীয় দৈনিকের সিনিয়র রিপোর্টার বাহারাম খান। ওই সময় আরও বক্তব্য রাখেন, শেরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কাকন রেজা, সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হাসান বাদল প্রমুখ। এ সময় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেরাজ উদ্দিন, কার্যকরী সভাপতি আব্দুর রফিক মজিদ, সিনিয়র সহসভাপতি মুগনিউর রহমান মনি, সহসভাপতি শাহরিয়ার মিল্টন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রশিক্ষণে নির্বাচনকালীন রিপোর্টিংয়ের প্রয়োজনীয়তা ও সমাজে এর প্রভাব, নির্বাচনকালীন সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের করণীয় ও বর্জনীয়, সাংবাদিকতার নীতিমালা, নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা ও প্রাসঙ্গিক আইন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। প্রশিক্ষণে শেরপুর ও জামালপুর জেলায় কর্মরত ৫০ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন।
৬ হাজার ৪৩৭ একর আয়তন বেষ্টিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর মুজিবনগর। এই চরটি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আওতাধীন। পুরো চরঘেরা তেঁতুলিয়া নদী। নদীপথে খেয়া পারাপারেই এখানকার বাসিন্দাদের একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম। চরের বাসিন্দারা জেলে পেশা ও কৃষিকাজে জড়িত। এই দ্বীপে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসতি হলেও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য একটি ক্লিনিকও নেই। তারা দীর্ঘবছর ধরে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্য খাতে চরম অবহেলার কারণে দ্বীপবাসীর দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
জানা যায়, মুজিবনগর দ্বীপে একটি ক্লিনিকও নেই। কোনো ধরনের ওষুধ সরবরাহ নেই। ফলে সাধারণ রোগেও মানুষকে নির্ভর করতে হয় স্থানীয় ঝাড়ফুঁক বা অনভিজ্ঞ চিকিৎসার ওপর। দ্বীপটির মূল ভূখণ্ড থেকে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে নৌকাই একমাত্র ভরসা। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর স্রোত ও নৌযানের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। যদি রাতে কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে একেবারেই নদী পার হওয়া যায় না। এতে করে জরুরি রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও নেই।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই। অনেক নারী ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঘরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, বারবার জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলেও দ্বীপবাসী তা থেকে বঞ্চিত। একজন বাসিন্দা বলেন, ‘অসুস্থ হলে আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া আর কোনো উপায় পাই না।’
স্থানীয় ফজল মাঝি বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর আগ থেকে মুজিনবগর ইউনিয়নে বসবাস করে আসছি। প্রথম থেকে এখনো অব্দি একটি ক্লিনিকও সরকার স্থাপন করেনি। মূল ভূখণ্ডে যেতে আমাদের নদী পার হতে হয়। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। আমরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুণছি। কারণ কোনো একজন ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ্য হলে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না।’
বিবি কলছুম বলেন, ‘২০২৪ সালে হঠাৎ আমার প্রসব বেদনা শুরু হয়। পরে অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে যায় কিন্তু সেদিন গভীর রাত হওয়াতে আমার পরিবারের লোকজন মূল ভূখণ্ডে আমাকে নিতে পারেনি। কারণ চরফ্যাশন সদর হাসপাতালে যেতে নদী পার হতে হয়। তবে সেইদিন রাতেই একজন ধাত্রী মহিলা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাচ্চা ডেলিভারি করাই।’
দ্বীপবাসীর আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং মুজিবনগরের মানুষও অন্য এলাকার মতো মৌলিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তা না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ইউপি সদস্য মনির হাওলাদার বলেন, ‘দ্বীপটিতে দ্রুত একজন স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানাই।’
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, ‘দেশের নাগরিক হিসেবে মুজিবনগর দ্বীপের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। আমি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট বিষয়টি অবগত করব।’
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জয়পুরহাটে গাছিদের খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরির ধুম পড়ে গেছে। মধ্যরাত থেকে তারা খেজুরের রস সংগ্রহ করতে শুরু করেন। এরপর শুরু হয় গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ। এ ছাড়া এ অঞ্চলের খেজুরের রস মিষ্টি হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে তা পান করতে আসেন। ফেরার পথে খাঁটি গুড় সঙ্গে নিয়ে যান। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে কাঁচা রস খেতে নিষেধ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে জেলা থেকে ২৭২ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে জানা যায়, বিভিন্ন জেলা থেকে অন্তত ৬০০ গাছি এ জেলায় খেজুরের রস সংগ্রহ করতে এসেছেন। তারা তীব্র শীত উপেক্ষা করে ভোর রাতে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। এরপর টিনের বড় তাওয়ায় রেখে জ্বাল দেওয়া হয় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। আরও কয়েকটি প্রক্রিয়া শেষে প্রস্তুত হয় সুস্বাদু পাটালি ও লালি গুড়, যা বিক্রি হচ্ছে জয়পুরহাটসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায়। অনেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন শীতের পিঠাপুলি খাওয়ার জন্য। প্রকারভেদে প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে।
জয়পুরহাট সদরের কুঠিবাড়ী ব্রিজ এলাকার গাছি আব্দুল হান্নান বলেন, ‘রাত ৩টার দিকে আমরা গাছে উঠে রস সংগ্রহ করি। এরপর ভোরের দিকে সেই রস নিয়ে এসে বড় তাওয়ায় ঢালা হয়। তারপর ৪ ঘণ্টার মতো জ্বাল দিতে হয়। একপর্যায়ে ঘন হলে সেই রস নামিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। এরপর এই গুড় বাজারে বিক্রি করি। অনেকে এখান থেকে কিনে নিয়ে যায়।’
একই এলাকার গুড় বিক্রেতা আনছের আলী বলেন, ‘পাটালি গুড় ভালোটা ৪০০ টাকা আর নরমালটা ২০০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। লালি গুড় ভালোটা ৪০০ টাকা ও নরমালটা ২০০ টাকা কেজি। এ ছাড়া রস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। আমাদের এই গুড় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী গুড় সরবরাহ করতে পারছি না।’
কালাই উপজেলার পুনট থেকে খেজুরের গুড় কিনতে এসেছেন আবু রায়হান। তিনি বলেন, বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসবে। এ জন্য খেজুরের গুড় কিনতে এসেছি। গুড় দিয়ে পিঠাপুলি করা হবে। এ জন্য ভালো পাটালি গুড় তিন কেজি ও লালি গুড় এক কেজি কিনেছি।’
সদর উপজেলার গতন শহর এলাকা থেকে গুড় কিনতে এসেছেন আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখানে খেজুরের রস থেকে খাঁটি গুড় পাওয়া যাচ্ছে শোনে কিনতে এসেছি। বাজারে অনেক সময় ভেজাল পাওয়া যায়। এ জন্য বাড়িতে পিঠা বানানোর জন্য এখান থেকে চার কেজি গুড় কিনলাম।’
নওগাঁ জেলার ধামুরহাট থেকে এসেছেন হাবিব হাসান বলেন, ‘এখানে খেজুরের রস খাওয়ার জন্য এসেছিলাম। রস খেয়ে অনেক ভালো লাগল। এখানে রস থেকে খাঁটি গুড় তৈরি করা হচ্ছে। তাই বাড়িতে পিঠা বানানোর জন্য দুই কেজি কিনলাম।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘জয়পুরহাট জেলায় প্রায় ২৬ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে গাছিরা রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন। চলতি মৌসুমে জেলায় ২৭২ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছি গাছে হাঁড়ি বসানোর সময় যেন নেট দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। বাদুড় বা অন্য কোনো প্রাণীর সংস্পর্শে না আসে এবং হাঁড়ির মধ্যে যেন চুনের প্রলেপ দেয়। এতে কাঁচা রস কোনো জীবাণুর মাধ্যমে সংক্রমিত হবে না। এতে আমরা নিরাপদ রস পাব।’
জয়পুরহাট জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা সুমাইয়া আফরিন জিনিয়া বলেন, জেলায় যেসব জায়গায় গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে সেসব জায়গা নিয়মিত তদারকি করা হয়ে থাকে। আমরা কীটের মাধ্যমে ভেজাল গুড় শনাক্ত করে থাকি। যারা ভেজাল গুড় তৈরি ও বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যদি কেউ ভেজাল গুড় তৈরি করে বা বিক্রি করে তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জয়পুরহাট সিভিল সার্জন ডা. মো. আল মামুন বলেন, ‘বাদুড়ের সংস্পর্শের কারণে খেজুরের রস খেলে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি থাকে। এতে মানুষের জীবনের ঝুঁকি থাকে। স্বাস্থ্য বিভাগের মাসিক সভায় আমি সকল কর্মকর্তাকে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। তারা মানুষকে সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের আমার পরামর্শ কেউ যেন কাঁচা রস না খায়। খেলেও ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অন্তত ১৫ মিনিট ফুটিয়ে খেতে হবে।’
নীলফামারীতে শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন বাংলাদেশ পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) কেন্দ্রীয় সভানেত্রী আফরোজা হেলেন। শনিবার (১০ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় জেলা শহরের পুলিশ লাইন্সের ড্রিল শেডে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।
এতে নীলফামারী পুনাকের সভানেত্রী শাহরিন হোসেনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে পুনাক রংপুর রেঞ্জের উপদেষ্টা শাহানা আক্তার, কেন্দ্রীয় পুনাকের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদিকা ওয়াহিদা ওয়াহাব, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সভানেত্রী মাহমুদা হোসেন, কেন্দ্রীয় পুনাকের যোগাযোগ সম্পাদিকা মাসরফা তাসনিম, কার্যনির্বাহী সদস্য কাজী বন্যা আহম্মেদ এবং কার্যনির্বাহী সদস্য ফাহমিদা আক্তার বক্তব্য দেন।
এ সময় বক্তারা বলেন, ‘শীতবস্ত্র বিতরণের মাধ্যমে অসহায় মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে পুনাক সব সময় মানবিক ভূমিকা রেখে আসছে। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো সমাজের প্রত্যেকের দায়িত্ব। তারা আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ সমাজে সহমর্মিতার চর্চা বাড়াবে এবং সামর্থ্যবানদেরও এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।’
এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহসিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এ.বি.এম ফয়জুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ সুপার (ডোমার সার্কেল) নিয়াজ মেহেদীসহ পুনাকের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট মডার্ন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন-এর শুভ উদ্বোধন করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জনাব নাসিমুল গনি । শনিবার (১০ জানুয়ারি) বেলা ১১-০০ ঘটিকায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেটে নবনির্মিত এই মডার্ন ফায়ার স্টেশনটির শুভ উদ্বোধন করেন তিনি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, পরিচালকগণ, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, আনসারের উপপরিচালকসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাগণ, গণমাধ্যমকর্মী, স্থানীয় ভলান্টিয়ারগণ এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এতে উপস্থিত ছিলেন।
সকাল ১১টায় অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ফায়ার স্টেশন প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রধান অতিথিকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং তাঁকে নিয়ে অভিবাদন মঞ্চ আরোহন করেন। এ সময় ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মোঃ জহিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল চৌকস অগ্নিসেনা প্রধান অতিথিকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। অভিবাদন গ্রহণ করার পর সিনিয়র সচিব শিবু মার্কেট মডার্ন ফায়ার স্টেশনের শুভ উদ্বোধন ফলক উন্মোচন করেন। এ সময় দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় দোয়া পরিচালনা করা হয়। এরপর তিনি স্টেশন প্রাঙ্গণে একটি আম্রপালির বৃক্ষ রোপণ করেন। বৃক্ষরোপণের পর প্রধান অতিথি অনুষ্ঠান মঞ্চে আরোহন করেন।
আলোচনা অনুষ্ঠানের শুরুতেই নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কাজের প্রশংসা করেন। এরপর অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তাঁর বক্তব্যে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
উপস্থিত অতিথি ও গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে কিশোর বয়সে ফায়ার সার্ভিস হতে প্রশিক্ষণ নেয়ার স্মৃতিচারণা করে নিজেকে ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন ভলান্টিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি ফায়ার স্টেশন উদ্বোধন করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও ভূমিকম্প মোকাবিলায় ভলান্টিয়ারের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য পরামর্শ প্রদান করেন। জনগণকে সচেতন করার জন্য প্রচারণা কর্যক্রম বাড়ানোর লক্ষ্যে তিনি মিডিয়া উইংকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জনগণের সেবায় সবসময় নিজেদের অবস্থান সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। এরপর প্রধান অতিথি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
এরপর প্রধান অতিথি ফায়ার স্টেশনের ব্যারাক ভবন, গাড়ি-পাম্প ও অন্যান্য স্থাপনা পরিদর্শন করেন, পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন এবং মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করেন। খবর : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মিডিয়া সেল।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে পারিবারিক কলহের জেরে ছেলের ছুরিকাঘাতে বাবা নিহত হয়েছেন।
আজ শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে উপজেলার চাঁনপুর ইউনিয়নের পশ্চিম মন্ডলভোগ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তির নাম মো. বজলুর রহমান (৬০)। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা। ঘটনার পর থেকে তাঁর ছেলে জুবায়ের (২৫) পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দুপুরে পারিবারিক বিষয় নিয়ে বজলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ছেলে জুবায়েরের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে জুবায়ের ছুরি দিয়ে বাবাকে আঘাত করে পালিয়ে যায়। জুবায়ের পেশায় অটোরিকশাচালক।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় লোকজন বজলুর রহমানকে উদ্ধার করে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চাঁনপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহিদুল হক উজ্জ্বল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পারিবারিক বিষয় নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে ঝগড়া হয়।
একপর্যায়ে ছেলে বাবাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জেরেই ঘটনাটি ঘটেছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
রাজধানীর বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে চাল ও ডালের দাম অনেকটা বেড়েছে। বিশেষ করে দেশি (ছোট দানা) মসুর ডালের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে নতুন চাল আসার প্রাক্কালে পুরোনো চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় অস্বস্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। এদিকে, রমজানের আরও দেড় মাস বাকি থাকলেও বেড়ে যাচ্ছে মাংস ও ডিমের দাম। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ডিমের দাম বাড়ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। আর গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা দায়ী করছে ভারতীয় গরু না আসাকে। তবে, শাকসবজিসহ নিত্যপণ্যের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের দামের এই চিত্র দেখা গেছে।
বাজারে বেড়েছে ছোট দানার মসুর ও মুগ ডালের দাম। উভয় ধরনের ডালের দাম কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। তবে মোটা মসুরের দাম কেজিতে ১০ টাকা কমে হয়েছে ৯০ টাকায়। বাজারে চা-এর দামও বেড়েছে।
সপ্তাহের ব্যবধানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত। প্রতি কেজি মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দাম ৩-৪ টাকা বেড়ে ৮৩ থেকে ৮৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া রশিদ মিনিকেটের দাম ৭২ টাকা থেকে বেড়ে ৭৫ টাকা, নন-ব্র্যান্ডের মিনিকেট ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় এবং দামি মিনিকেট মোজাম্মেলের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়ে ৮৫ থেকে ৮৬ টাকা হয়েছে।
একইভাবে বেড়েছে নাজিরশাইল চালের দামও। ধরনভেদে দেশি নাজিরশাইল চাল বিক্রি হয়েছে ৭২ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে, যা সপ্তাহখানেক আগে ৩ থেকে ৪ টাকা কম ছিল। আর আমদানি করা নাজিরশাইলের দাম কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা হয়েছে।
বছরের এই সময়ে আউশ, আমন ও নাজিরশাইল চাল বাজারে আসার কথা। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সাধারণত প্রতিবছর এসব চাল বাজারে আসার পরে পুরোনো চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বাড়ে। কিন্তু এবার নতুন চাল বাজারে আসার আগেই পুরোনো চালের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খুচরা দোকানে নতুন চাল বিক্রি হতে শুরু করবে। বিক্রেতাদের আশঙ্কা, নতুন চাল আসার পরে পুরোনো চালের দাম আরও বাড়তে পারে।
গত সপ্তাহের চেয়ে ডজন প্রতি ডিমের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। আগে বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকা; শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) কিনতে হয়েছে ১২০ টাকায়। দাম বাড়ার কারণ হিসেবে পুরান ঢাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, ডিম কম পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য দাম বাড়ছে। এ ছাড়া সপ্তাহের ব্যবধানে ফার্মের মুরগির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। যা দুদিন আগেও ৭৫০ টাকায় বিক্রি হতো। দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে রায়সাহেব বাজারের মাংস বিক্রেতা জালাল বলেন, ‘বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়ান গরু না আসার কারণে দাম বাড়ছে। বাংলাদেশের গরু কম। দাম কমাতে হলে ইন্ডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে হবে।’
ওই বাজারে মাংসের দরদাম করতে থাকা একজন ক্রেতা বলেন, মাংস খুব কম কিনি। কারণ, দাম আগের থেকেই বেশি। আজকে শুক্রবার, এ জন্য ভাবছি একটু মাংস খাই। কিন্তু, দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়ে গেলো। এ দেশে দাম শুধু বাড়ে, কমে না।
ডিম ও মাংসের দাম বাড়লেও আগের দরেই বিক্রি হচ্ছে মাছ, বড় জাতের রুই মাছ কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা, পাঙ্গাশ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, হাইব্রিড কৈ মাছ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। তবে, বরাবরের মত নাগালের বাইরে রয়েছে দেশি মাছের দাম। প্রতি কেজি দেশি শোল মাছ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা করে। প্রতি কেজি দেশি কৈ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, চাষের মাছের দাম কেজি প্রতি ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
বাজারে এখন নতুন মৌসুমের মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি। পাশাপাশি ভারত থেকে আমদানি করা এবং দেশীয় পুরোনো পেঁয়াজও বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ৬৫-৭০ টাকা। আর দেশি পুরোনো পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেশি; প্রতি কেজি ৮০-৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি মুলা ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং শালগম ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গোল ও লম্বা বেগুনের দাম কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত কমে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় নেমেছে। এ ছাড়া শিম ও মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা এবং পেঁপে ৪০ টাকায় মিলছে। ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতি পিস ৩০ থেকে ৪০ টাকা ও করলা ৫০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে।
বাজারের দেশি গাজরের কেজি ৪০ টাকা, কাঁচকলার হালি ৪০ টাকা ও ছোট সাইজের প্রতিটি লাউ ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে পাকা টমেটোর কেজি এখনো ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় মিলছে। বাজারে মটরশুঁটির দাম কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত কমে ১০০ টাকায় নেমেছে।
ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারগুলোতে নেতিবাচক প্রবণতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এই খাতের রপ্তানি পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। নতুন বাজারের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, চিলি, ভারত, জাপান, কোরিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্ক এবং অন্য দেশেও রপ্তানি কমেছে। তবে চীন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাজারে বেড়েছে।
ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হলো— বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, চেক, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া এবং সুইডেন। এদিকে, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, লাটভিয়া, স্লোভেনিয়া এবং কিছু ছোট দেশগুলোতে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি সামান্য হ্রাস (-০.১০ শতাংশ) রেকর্ড করা হয়েছে, যা বড় বাজারের জন্য সতর্কবার্তা। কানাডা ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে তা মোট হ্রাসের চাপকে ভারসাম্য করতে যথেষ্ট নয়।
উল্লেখ্য, শুধু ২৬টি দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কেনা কমায়নি, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫), রপ্তানি প্রত্যাশিত গতিতে বৃদ্ধি পায়নি।
রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা এবং বাংলাদেশ পোশাক ব্যবসায়ি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৯,৩৬৫ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দাম কমানোর চাপ— সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শ্রম বাজার এবং রপ্তানিকারকদের আয়— সবকিছুর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জুলাই-ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ইইউতে রপ্তানি হয়েছে ৯,৪৫৯ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক। তবে আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় রপ্তানি আয় ৪.১৪ শতাংশ কমেছে।
বড় বাজারগুলোতে যেমন- জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামে উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে— জার্মানি: ২৪৬৮ থেকে ২১৮৭ মিলিয়ন (-১১.৪ শতাংশ), ফ্রান্স: ১০৯১ থেকে ৯৭২ মিলিয়ন (-১০.৮৯ শতাংশ), ডেনমার্ক: ৫৫৭ থেকে ৪৯৮ মিলিয়ন (-১০.৫৪ শতাংশ), বেলজিয়াম: ২৯৫ থেকে ২৬৮ মিলিয়ন (-৯.২২ শতাংশ)। তবে সব দেশে পতন হয়নি। কিছু বাজারে উল্টো বাড়তি রপ্তানিও দেখা গেছে। যেমন- স্পেন: ১৬৯৯ থেকে ১৮০৪ মিলিয়ন (+৬.১৮ শতাংশ), নেদারল্যান্ডস: ১০৫৭ থেকে ১০৭৭ মিলিয়ন (+১.৮৫ শতাংশ), পোল্যান্ড: ৭৯০ থেকে ৮৬৪ মিলিয়ন (+৯.৪৩ শতাংশ)।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় বাজারে ক্রেতারা সংবেদনশীল। অর্ডার দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু দাম কমানোর চাপও আছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ইউরোপীয় বাজারে সতর্কতা অবলম্বন এখন অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল মালিক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কয়েক মাস ধরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বের রপ্তানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ধাক্কা খাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ভারত ও চীনসহ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ওই বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না, তারা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে অর্ডার নেওয়ার জন্য মূল্য কমিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা একই ধরনের পণ্যের অর্ডার নিতে পারছেন না। তবে ভারত সরকার তাদের ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ সহায়তা দিচ্ছে। সম্প্রতি তারা ৭ হাজার কোটি রুপির নতুন সহায়তা অনুমোদন করেছে।
হাতেম যোগ করেন, অপরদিকে আমাদের সরকার আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যুক্তি দেখিয়ে রপ্তানি খাতের নগদ সহায়তা এবং অন্যান্য সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। যে সামান্য সহায়তা অবশিষ্ট ছিল, তার মেয়াদও ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। আমরা ইতোমধ্যে সরকারকে নবায়নের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি, যা রপ্তানিকারকদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে। না হলে স্পিনিং মিল বন্ধ এবং একের পর এক গার্মেন্টস বন্ধ হওয়া রপ্তানি খাতের জন্য মারাত্মক সংকেত।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বিশ্ববাজারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের রফতানি মন্দা দেখা দিয়েছে। তবে বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারে চাহিদা বাড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে যারা গুলি করেছেন, তারা তার পরিচিত বলে এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যে উঠে এসেছে। মুছাব্বির কিলিং মিশনে ৫ জন অংশ নেয়। তারা পেশাদার ও ভাড়াটে শুটার।
প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডটি ‘পরিকল্পিত’ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টার দিকে কারওয়ান বাজারে স্টার হোটেলের পাশের গলিতে মুছাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা তেজগাঁও থানা ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ গুলিবিদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন।
বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে এই ঘটনার তদন্ত চলছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, র্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছেন এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে।
সুরতহাল প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোছাব্বিরের পেটের ডান পাশে আধা ইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্র। ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে একটা ছিদ্র। বাম পায়ের হাঁটুতে ছিল জখম। ধারণা করা হচ্ছে, গুলি লাগার পর তিনি পড়ে গিয়ে পায়ের হাঁটুতে আঘাত পান।
প্রত্যক্ষদর্শী মন্টু বলেন, গুলির আওয়াজ শোনার দুই-তিন সেকেন্ড পরে মুসাব্বির ভাই দৌড় মারছে। দৌড়ের মধ্যে ভাই বলতেছিলেন, ‘তোরা করলিডা কি আমারে?’। এই কথা বলতে বলতে একটু সামনে মোড়ে মুদি দোকানের সামনে গিয়ে পড়ে যায় ভাই।’
দৌড়ে গিয়ে মুছাব্বিরকে ধরেন মন্টু। তিনি তাকে বলেন, ‘আমাকে তোরা মেডিকেলে নে।’
এর পরে আর কথা বলেননি মুছাব্বির।
পাশের দোকান থেকে পানি নিয়ে মোছাব্বিরের মাথায় পানি দেন মন্টু। কিছুটা পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। তবে পানি পান করতে পারছিলেন না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি, ফার্মগেটে গ্যারেজ দখল ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে সামনে রেখে এই হত্যা হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নকে সামনে রেখেই চলছে তদন্ত।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত দুটি মোটিভ কাজ করেছে–স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারওয়ান বাজারের দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ে বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিলিং মিশনে মোট পাঁচজন অংশ নেয়। গলির ভেতরে অস্ত্রধারী তিনজন সরাসরি গুলি চালায় এবং স্টার হোটেলের সামনে মূল সড়কে আরও দুজন মোছাব্বিরের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। এরা পেশাদার ভাড়াটে শুটার এবং কেউই স্থানীয় নন বলে দাবি গোয়েন্দাদের।
ঘটনার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো.আব্দুল মজিদ মিলন ও যুবদলের সহসভাপতি মো. ফারুক হোসেনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মিলনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও ফারুককে এখনো আটক রাখা হয়েছে। অন্যদিকে র্যাব রনি ও মন্টু নামে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে এবং তেজগাঁও থানা পুলিশও জিজ্ঞাসাবদের জন্য তিনজনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া তেজগাঁও থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্যসচিব আবদুর রহমানকেও এ ঘটনায় খুঁজছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই আবদুর রহমান ও তার অনুসারীরা পলাতক বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ট্রেন চলন্ত অবস্থায় দেশে চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যা, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই গুলি করে অন্তত চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে জনসংযোগে হামলা, গুলি হয়েছে। সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল পথে এগুচ্ছে।
এদিকে, ঢাকার অপরাধ জগতের বড় সন্ত্রাসী বা তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে তেমন কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। আবার যারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অস্ত্র ভাড়া দেয়, তাদের থেকেও উদ্ধারের ঘটনা খুব বেশি নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৩টি এখনো উদ্ধার হয়নি। অবৈধ অস্ত্রও নির্বাচনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আবার সরাসরি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা হামলা না হলেও মব সন্ত্রাসের ঘটনা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধের অভাব তৈরি করেছে। যেমন গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে মোটরসাইকেলের সঙ্গে গাড়ির ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ‘মব’ তৈরি করে আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সবশেষ রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকার অদূরে তেজতুরী বাজারে বুধবার রাতে গুলি করে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করে তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পান। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে শরীয়তপুরের জাজিরায় একটি ঘরে বিস্ফোরণে দুই যুবক নিহত হন। পুলিশ বলছে, ককটেল তৈরির সময় এই বিস্ফোরণ হয়। এসব ককটেল নির্বাচনী প্রচারে হামলা বা নাশকতার জন্য তৈরি হচ্ছিল কি না, সে সন্দেহও রয়েছে।
এর আগে ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে একতলা ভবনের দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে লক্ষ্মীপুরে দরজায় তালা লাগিয়ে ও পেট্রল ঢেলে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে আগুনে পুড়ে ওই নেতার সাত বছর বয়সি এক মেয়ের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হন বিএনপি নেতাসহ তার আরও দুই মেয়ে।
গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একইদিন সন্ধ্যায় যশোরের মনিরামপুরে এক বরফ কল ব্যবসায়ীকে গুলি করে এবং রাত ৯টায় নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় আরেক ব্যবসায়ীকে বাড়ির ফটকে গুলি হত্যা করা হয়েছে।
এসব ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশে নতুন করে ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এসব ঘটনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারাটা ভোটের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘিরে। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদির মাথায় গুলি করা হয়। এ ঘটনার পরও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি করে হত্যার অন্তত আটটি ঘটনা ঘটেছে।
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়। ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হন। তবে এই অভিযানেও চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। তা ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। এই সময়ে মোট অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র বলছে, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার মধ্যেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই ১৩ ডিসেম্বর সারা দেশে ইসির মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশনা দেয় ইসি। এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন, চার নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে ইসি।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ দুভাবে কাজ করছে। নির্বাচনের আগে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, সে জন্য পেশাদার অপরাধী গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার এবং নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রার্থী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়ে ভোটের দিনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।