বর্ষার শেষে দেশে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। আশ্বিন মাসের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ মাসে থেমে থেমেই ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিন ধরেই সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পর এবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে।
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও ফুলপুরসহ কয়েকটি উপজেলায় গত কয়েকদিন ধরেই বন্যার দেখা দিয়েছে। আজ পর্যন্ত সেসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে জানা যায়। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে সেখানকার আরও অন্তত ৫০টি গ্রাম। এতে তিন উপজেলার ২৩ ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সোমবার দুপুরে এসব তথ্য জানিয়ে জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানান, তিন উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এখন নারী শিশুসহ দুই হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এসব উপজেলায় ৬৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ সাত লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া রান্না করা খাবারও দেওয়া হচ্ছে বন্যা দুর্গতদের।’ ধোবাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, ‘টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ১২৭ কিলোমিটার রাস্তা পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ কিলোমিটার রাস্তা চলাচলের একেবারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানি কমলে পুরো ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা নির্ণয় করে মেরামতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইইএনও) নিশাত শারমিন বলেন, সোমবার নতুন করে উপজেলার দুটি ইউনিয়নের ২৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তবে উজানের পানি কিছুটা কমছে। আশা করা যাচ্ছে, দুই-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। এদিকে বন্যায় শেরপুরে গত চারদিনে বন্যার পানিতে নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলায় মোট ৯ জন মারা গেছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার ছনধরা, রামভদ্রপুর, সিংহেশ্বরও, ফুলপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ ও অন্যান্য ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ সব এলাকার আমন ফসল ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে; ভেসে গেছে মাছের খামার।
খবর নিয়ে জানা গেছে, হালুয়াঘাটের প্রায় ১২টি ইউনিয়ন শুক্রবার থেকে প্লাবিত হয়েছিল। ওইসব এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে নতুন করে আরও ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান, সবজি ক্ষেত। সঙ্গে পুকুরের মাছও। পানিবন্দি হয়ে আছে হাজার হাজার মানুষ। ঘরের মধ্যে পানি ঢোকার কারণে রান্নার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে মানুষ।
হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এরশাদুল আহমেদ বলেন, উজানে প্লাবিত হওয়া গ্রামের পানি নামতে শুরু করেছে। উপজেলার নড়াইল, কৈচাপুর, ধুরাইল এবং আমতৈল ইউনিয়ন দিয়ে পানি ফুলপুর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নতুন কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হলেও সার্বিক পরিস্থিতি ভালো।
শেরপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি
দৈনিক বাংলার শেরপুর প্রতিনিধির পাঠানো খবর থেকে জানা যায়, টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরে সৃষ্ট বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সোমবার দুপুরের পর থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় এ উন্নতি হয়েছে। জেলার চারটি পাহাড়ি নদীর পানি আরও কমেছে। এসব নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ব্রহ্মপুত্র, দশানী ও মৃগী নদীতে। পানি বৃদ্ধি পেলেও এসব নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বন্যায় গত চারদিনে বন্যার পানিতে নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলায় মোট ৯ জন মারা গেছেন।
সোমবার সকাল ৯টায় শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ভোগাই নদীর পানি ১৩৮ সেন্টিমিটার, চেল্লাখালী নদীর পানি ৭৭ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বিপৎসীমার ৫৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়াও অপর দুটি পাহাড়ি নদী মহারশি ও সোমেশ্বরীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
তবে জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কমেনি দুর্ভোগ। এখনও প্রতিটি এলাকায় খাদ্য সংকট রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতসহ রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অনেক দুর্গম এলাকায় এখন পর্যন্ত ত্রাণ পৌঁছেনি। আর বিশুদ্ধ পানির সংকট, শৌচাগারের সমস্যায় ভোগছেন।
কৃষি বিভাগ ও মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ৪৭ হাজার হেক্টর আবাদি জমির আমন ধান ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ১ হাজার হেক্টর জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর মাছের ঘের তলিয়ে গেছে ৬ হাজারেরও বেশি। এতে মাথায় হাত পড়েছে আমন ও মৎস্যচাষীদের। সব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। এ বন্যায় অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক, মাদরাসা, কারিগরি, কলেজ বন্ধ রয়েছে।
জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৪১টি। এর মধ্যে বন্যাকবলিত হয়েছে ৩০১টি বিদ্যালয়। এর মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ২৪২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ৫৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা সব জায়গায় ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছি। আমাদের এ কাজে সেনাবাহিনী সার্বিক সহযোগিতা করছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ব্যবসায়ীসহ সবাই এগিয়ে এসেছেন। সবাই মিলে আমরা এ দুর্ভোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হব।’ শেরপুর জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে ১০ হাজারের মতো ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে বন্যা দুর্গত এলাকায়। আরও ২৫ হাজারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার পাওয়া গেছে তা বিতরণ করা হবে।
এদিকে শেরপুরে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সেনবাহিনী। জেলার পাঁচটি উপজেলাতেই সেনাপ্রধানের নির্দেশে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে উদ্ধার অভিযান এবং খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম চলছে। বন্যাকবলিতদের উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শেরপুরে এখন পর্যন্ত চার হাজার পরিবারের কাছে ত্রাণসামগ্রী পোঁছে দেওয়া হয়েছে। যাদের বাসায় রান্না করার ব্যবস্থা নেই, তাদেরকে রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নে ও নকলা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রান্না করা খাবার এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন সেনাসদস্যরা। ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সারিকালিনগর, দড়িকালিনগর ও হাতিবান্ধা ইউনিয়নের মিরপাড়া এলাকায় ২ শতাধিক দুর্গতের মধ্যে ময়মনসিংহ সেনানিবাসের ১৩ বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট জোহায়ের খাবার বিতরণ কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করেন।
নেত্রকোনার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, দেখা দিয়েছে বিভিন্ন দুর্ভোগ
দৈনিক বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানায়, জেলায় কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। এতে স্বস্তি ফিরছে বানভাসিদের। তবে সংকট দেখা দিয়ে সুপেয় পানির। ভেসে উঠছে ভেঙে যাওয়া রাস্তার খানাখন্দ। এতে দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েক হাজার পরিবারের। এর আগে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে জেলার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও পূর্বধলা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। শতাধিক বিদ্যালয়ে পাঠদান সমায়িক বন্ধ রাখা হয়। ১৭ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান তলিয়ে যায়। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে। কমতে শুরু করেছে পানি।
এদিকে পূর্বধলার নাটেরকোনা এলাকায় একটি ফসলরক্ষা বাঁধ রোববার (৬ অক্টোবর) বিকেলে ভেঙে গিয়ে ৭-৮টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। তবে গতকাল সোমবার সেসব স্থান থেকেও পানি নামতে শুরু করেছে।
সোমবার পানিবন্দী এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, জেলার সবগুলো নদ-নদীতে পানি কমতে শুরু করেছে। ডুবন্ত রাস্তাগুলো ভেসে উঠছে। দৃশ্যমান হচ্ছে রাস্তার ভাঙা অংশ ও বড় বড় গর্ত। বন্যার্তদের জেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ত্রাণ সহায়তা করছে।
জেলার শিক্ষা ও কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১৭ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান বন্যায় তলিয়ে গেছে। ২-৩ দিনের মধ্যে পানি কমে গেলে ধানের ক্ষতি অনেকটা কমে যাবে। এ ছাড়া পানি ওঠায় জেলায় ১৮৬টি বিদ্যালয়ে পাঠদান সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।
সপ্তাহজুড়ে থাকবে বৃষ্টি
রাজশাহী ছাড়া দেশের সব বিভাগেই সপ্তাহজুড়ে কম-বেশি বৃষ্টির আভাস দিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এরপর গরম কিছুটা বাড়বে। আর বৃষ্টি-গরমের এই পর্ব শেষে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে শীতের দেখা মিলতে পারে দেশে।
আজ সোমবার আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাজশাহীতে একটু কম বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া সব বিভাগেই আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিনই এক পশলা-দুই পশলা করে বৃষ্টিপাত হবে। এরপর কিছুটা গরম পড়বে। তবে, বৃষ্টির পরপরই শীত পড়ার আভাস নেই। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে শীত নামতে শুরু করবে।’
সোমবার আবহাওয়ার নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয়। এর অক্ষের বর্ধিতাংশ ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এটি মাঝারি অবস্থায় আছে। এর প্রভাবে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কিসমত তেকাটিয়া মৌজার বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপের অপারেটর গোলাম রাব্বানীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার (৪ মে) সংস্থার নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপনার (গোলাম রাব্বানী) দ্বারা পরিচালিত নিম্ন তফসিল বর্ণিত গভীর নলকূপ স্কিম পরিচালনায় বর্ণিত ত্রুটি/অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় আপনাকে গভীর নলকূপ অপারেটর পদ হতে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। আগামী তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট স্কিমের দায়িত্বরত মেকানিক/সহকারী মেকানিকের নিকট গভীর নলকূপের যাবতীয় মালামাল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’
অপারেটর গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি নলকূপের আওতাভুক্ত জমিতে বোরো ধান চাষের জন্য পানি না দিয়ে মাছ চাষের জন্য পুকুরে পানি দিচ্ছিলেন।
এ বিষয়ে গত শনিবার (২ মে) এ বিষয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান ওই এলাকা পরিদর্শনে যান। তিনি কিসমত তেকাটিয়া ও কিসমত বগুড়া গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং নলকূপের আওতাভুক্ত মাঠ পরিদর্শন করে প্রতিবেদনের সত্যতা খুঁজে পান।
চলতি বোরো মৌসুমে অপারেটর গোলাম রাব্বানী দুর্গাপুর উপজেলার কিসমত বগুড়া গ্রামের ৫৮ জন চাষির প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে সেচ দেননি। ফলে চাষিরা বোরো চাষ করতে পারেননি। এর আগে তিনি তাদের পাকা শর্ষের ক্ষেত পানি দিয়ে নষ্ট করে দিয়েছেন। এ নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে মারামারি করেছেন। মুজিবুর রহমান নামের একজন চাষির হাত ভেঙে দিয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজন সমিতির মাধ্যমে গভীর নলকূপ চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। অপারেটর তাদের সিদ্ধান্ত অমান্য করে দ্বিগুণ দামে চাষিদের কাছে পানি বিক্রি করছিলেন। এ ব্যাপারে বোরো ধান রোপণের সময় এলাকাবাসী বিএমডিএ বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। কর্তৃপক্ষ তাকে একাধিকবার নোটিশ দিলেও তিনি উপস্থিত হননি। যথাসময়ে জবাবও দেননি।
বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এখন থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হবে। সেই কমিটির মাধ্যমে ওই গভীর নলকূপ পরিচালিত হবে।’
রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বিশাল এলাকাজুড়ে নির্মিত হলেও সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে মূলত একতলা ভবনে। হাসপাতালের নথিপত্রে মোট পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে তিনটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। বাকি দুটি সচল থাকলেও চালক রয়েছেন মাত্র একজন। ফলে জরুরি রোগী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী থাকার কথা পাঁচজন, আছেন মাত্র দুজন। বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প হিসেবে থাকা জেনারেটরটিও দীর্ঘদিন ধরে বিকল। আবাসিক চিকিৎসক হাসপাতালে অবস্থান করেন না- এমন অভিযোগও রয়েছে। রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নানা সমস্যায় জর্জরিত। অ্যাম্বুলেন্স সংকট, জনবল ঘাটতি,
অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে প্রতিষ্ঠানটি যেন নিজেই রোগাক্রান্ত।
সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের বাইরে একটি টিনশেডের নিচে পড়ে আছে কোটি টাকা মূল্যের একটি বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স। করোনা মহামারির সময় ভারত সরকারের দেওয়া আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন এই অ্যাম্বুলেন্সটি গ্রহণের পর থেকে কখনও ব্যবহার করা হয়নি বলে জানা গেছে। অবকাঠামোগত নকশাগত ত্রুটি ও অবস্থানগত কারণে পুরো হাসপাতাল চত্বরে সারাবছরই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ বিরাজ করে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আবদুল করিম বলেন, বছরের পর বছর একই অবস্থা চলছে। চিকিৎসা পেলেও পরিবেশ ভালো না।
সন্তানের চিকিৎসা নিতে আসা কহিনুর আক্তার বলেন, হাসপাতালে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। জলাবদ্ধতা নিরসনে আশপাশের সড়ক উঁচু করা দরকর। সম্পা রানী প্রীতি বলেন, বর্ষা মৌসুমে হাসপাতাল চত্বর পানিতে ডুবে যায়। এতে রোগী ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সরেজিমন পরিদর্শনে আরও দেখা যায়, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য থাকা ৯টি আবাসিক ভবনের বেশির ভাগই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনগুলো
লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। ভেতরের সড়কগুলো কাদাপূর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী। বসবাসরত কয়েকজনের অভিযোগ, এলাকায় বিষধর সাপের উপদ্রব রয়েছে। একই সঙ্গে মশা-মাছির উপদ্রবও ব্যাপক। হাসপাতালের বিভিন্ন
ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীদের খাটের নিচে বিড়ালের অবাধ বিচরণ। টয়লেটগুলো নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর, অনেকগুলোর দরজা ভাঙা।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নতুন নিয়োগে চিকিৎসক সংকট কিছুটা কাটলেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন পদ এখনও শূন্য। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, একতলা নকশায় নির্মাণ হওয়ায় সারা বছরই পানি জমে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হয়, যা বর্ষায় আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অ্যাম্বুলেন্সগুলো সচল করার উদ্যোগ না নিলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও অবনতির দিকে যাবে বলে মন্তব্য করেন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় অনিমেষ পরমান্য (৪৬) নামের এক পশু চিকিৎসককে অপহরণের পর তার পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ ওঠেছে। গত শনিবার (২ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার বংশীপুর এলাকা থেকে তাকে অপহরণ করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপহৃত অনিমেষ পরমান্য শ্যামনগর উপজেলার কৈখালি ইউনিয়নের বৈশখালি গ্রামের নিতাই পরমান্যের ছেলে। তিনি দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে স্থানীয় এলাকায় পশু চিকিৎসক হিসেবে কাজ করে আসছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত শনিবার (২ মে) সকাল ৮টার দিকে অনিমেষ বাড়ি থেকে বের হন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাকে হরিণগরের সুন্দরবন বাজার এলাকায় এবং পরে বংশীপুর এলাকায় দেখা যায়। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সন্ধ্যা ৭টার দিকে অপহৃতের মোবাইল ফোন থেকে তার স্ত্রী সবিতা পরমান্যের কাছে কল করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
একই সঙ্গে বিষয়টি প্রশাসন বা গণমাধ্যমকে জানালে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে গত শনিবার (২ মে) রাত ও রোববারও একাধিকবার ফোন করে টাকা দাবি করা হয়।
এ ঘটনায় অপহৃতের ভাই প্রিয়নাথ পরমান্য গত শনিবার (২ মে) রাত ৯টার দিকে শ্যামনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।
এ বিষয়ে শ্যামনগর থানার ওসি মো. খালেদুর রহমান বলেন, ‘নিখোঁজের বিষয়টি জানার পরপরই পুলিশ সুপার ও র্যাবকে অবহিত করা হয়েছে। অপহৃতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে এবং স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।’
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ফজরের নামাজ চলাকালে সিজদারত অবস্থায় হাফিজ উল্লা (৮০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় দেখা দিয়েছে শোক ও আতঙ্ক আর ক্ষোভ। ঘটনার একদিন পেরিয়ে গেলেও স্থানীয়দের মাঝে এখনো বিরাজ করছে ভয়। তারা দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার এলাকাবাসী।
সোমবার (৪ মে) সরেজমিনে পশ্চিম লইয়ারকুল কুমিল্লাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার রেশ কাটেনি এখনো। মসজিদের ভেতরে নামাজ আদায়ের সময় এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বিস্মিত ও শোকাহত মুসল্লিরা। অনেকেই আতঙ্কে একা মসজিদে যেতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানান।
নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠেছে পরিবেশ। বারবার অজ্ঞান যাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
নিহতের ছেলে শাহিন মিয়া বলেন, ‘আমার বাবা কারও কখনো কোনো ক্ষতি করতেন না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, মানুষের উপকার করতেন। এমন মানুষকে মসজিদের ভেতরে এভাবে হত্যা করা হবে এটা আমরা ভাবতেই পারছি না। আমরা এর সুষ্ঠ বিচার চাই।’
স্থানীয়রা জানান, অভিযুক্ত জসিম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং প্রায়ই উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতেন। তার বিরুদ্ধে আগেও নানা অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।
এদিকে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত জসিম মিয়াকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শিগগিরই তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ চলছে এবং প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে এ ঘটনার পর মসজিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন স্থানীয়রা। অনেকেই মসজিদে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
ধর্মীয় উপাসনালয়ের মতো পবিত্র স্থানে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, সমাজে মাদকাসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গলের এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এখন সবার একটাই প্রত্যাশা দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হোক এবং এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণে গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, কমলগঞ্জ শাখার আয়োজনে ‘রেমিট্যান্স উৎসব’, বিজয়ী গ্রাহক সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে। সোমবার (৪ মে) এ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করে ভাগ্যবান বিজয়ীদের হাতে বিশেষ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, কমলগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক যীশু কৃঞ্চ দেবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক শরীফ মো. তাহাওয়ার হোসাইন।
রেমিট্যান্স কর্মকর্তা ফারহান ভুঁইয়ার সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, সিলেট বিভাগীয় নিরীক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম। মৌলভীবাজার মুখ্য আঞ্চলিক কার্যালয়ের মুখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. কামাল হোসেন। মৌলভীবাজার মুখ্য আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. নাসির উদ্দীন।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত গ্রাহকদের মধ্যে বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামাল উদ্দিন এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জামাল হোসেন ও পুরস্কার বিজয়ী গ্রাহক মো. ইসমাইল মিয়া।
অনুষ্ঠানে বক্তারা দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো কেবল দেশপ্রেমের পরিচয় নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার অন্যতম হাতিয়ার। কৃষি ব্যাংক প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ দ্রুত এবং নিরাপদে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’ বক্তারা প্রবাসীদের হুন্ডির মতো অবৈধ পথ পরিহার করে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর আহ্বান জানান।
আলোচনা সভা শেষে রেমিট্যান্স ড্র-তে বিজয়ী গ্রাহকদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার গ্রহণকালে বিজয়ী মো. ইসমাইল মিয়া ব্যাংকের সেবার মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এমন আয়োজনের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
আসন্ন ঈদুল আজহায় এবার কোরবারির পশু সংকট নেই। চাহিদার তুলনায় পশু উৎপাদন বেশি থাকায় এবার দামও ক্রেতাদের নাগালে থাকার আশা করা হচ্ছে। খুলনা বিভাগে এবার ১০.৭৯ লাখ পশুর চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৪.৪৭ লাখ কোরবানির পশু রয়েছে।
জানতে চাইলে খুলনা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিওএলএস) পরিচালক ড. মোহাম্মদ গোলাম হায়দার বলেন, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১০.৭৯ লাখ, যেখানে গত বছর তা ছিল প্রায় ৮.২৯ লাখ। কিন্তু এ বছর পবিত্র ঈদুল আজহার আগে কোরবানির পশুর দাম কমানোর জন্য ১৪.৪৬ লক্ষ পশু প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি বলেন, এখন স্থানীয় পশু দিয়েই শতভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে, কারণ বিভাগে মোট ৩,৬৭,৩৬০টি উদ্বৃত্ত পশু থাকবে, যা চাহিদার চেয়ে ৭৪.৬১ শতাংশ বেশি। ঈদুল আজহার আগেই বিভাগের ১০টি জেলা এবং খুলনা শহরের অস্থায়ী পশুর হাটে বিপুল পরিমাণে কোরবানির পশু আনা হবে। ফলে খুলনার চাহিদা মেটাতে অন্য দেশ থেকে পশু আমদানি করার কোনো প্রয়োজন নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভাগের দশ জেলায় ১০,৭৯,৪৪৯টি কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে ৩,৬৭,৩৬০টি উদ্বৃত্ত রেখে মোট ১৪,৪৬,৮০৯টি কোরবানির পশু স্থানীয়ভাবে পালন করা হয়েছে।
এ বছরের কোরবানির পশুগুলোর মধ্যে রয়েছে ষাঁড় ১,৩০,৪২৭টি, বলদ ৩২,০২৭টি, গরু ৮২,৩০২টি, মহিষ ৪,০৮৯টি, ছাগল ৮, ৫১,৩৭০টি, ভেড়া ৫১,১৭৩টি এবং অন্যান্য ২১৬টি।
রূপসা উপজেলার সামন্তসেনা গ্রামের এক খামারের মালিক সাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান, পশুখাদ্যের দাম বাড়ার কারণে এ বছর পশুর দাম কিছুটা বেশি হবে।
ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক মো. দিদারুল আলম বলেন, তিনি প্রায় এক বছর ধরে শুধু ঘাস, ভুট্টা, গমের ভুসি ও স্থানীয় পশুখাদ্য ব্যবহার করে সাতটি দেশি গরু পালন করছেন, পশুগুলোকে সুস্থ এবং ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন।
লিয়াকত হোসেন নামে আরেকজন কৃষক তার পারিবারিক পশুপালনের ঐতিহ্য বজায় রেখেছেন এবং পরে টিপনা গ্রামে তার ভাইদের সাথে আট কাঠা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এই চাষাবাদ শুরু করেন। তাদের খামারে এখন গরুর পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি ছাগলও রয়েছে।
জানতে চাইলে কেসিসির বাজার শাখা কর্মকর্তা শেখ শফিকুল হাসান দিদার বলেন, কোরবানির পশুর হাটের দর ওঠানো হয়েছে দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা। তিনবার আহ্বান করা হয়েছে। সাড়া মেলেনি।
তিনি বলেন, যদি কোনো ঠিকাদার অংশ না নেয় তাহলে হাট পরিচালনার দায়িত্ব নেবে সিটি করপোরেশন। গত বছরও টেন্ডার আহ্বান করা হলেও কেউ সাড়া দেয়নি। ফলে কেসিসি দায়িত্ব নিয়ে হাট পরিচালনা করে দুই কোটি সাত লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছিল। গত বছরে হাসিলের পরিমান ছিল ৪ শতাংশ। এবারও হাসিলের পরিমাণ একই থাকবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, হাটে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকবে। পশু ও মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য রাখা হবে মেডিকেল টিম। হাটে এসে কেউ যেন প্রতারণার শিকার না হয় সেজন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর জোর টহল থাকবে।
তাছাড়া নকল টাকা প্রতিরোধে থাকবে বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ। এক সপ্তাহ আগে থেকে হাট শুরু করতে হবে। ইতোমধ্যে হাট পরিচালনা করার জন্য কেসিসি সচিব (ভারপ্রাপ্ত) রহিমা খাতুন বুশরাকে আহ্বায়ক ও বাজার শাখার কর্মকর্তা শেখ শফিকুল হাসান দিদারকে সদস্যসচিব করে ৩২ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেছেন, খাল খননের মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। এই খালকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে এই অঞ্চলে আর কখনো পানির অভাব হবে না। গ্রামীণ জনপদকে উন্নয়ন করার জন্য বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। সোমবার (৪ মে) সকালে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় দুটি খাল খনন কাজের উদ্বোধন শেষে তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশ যদি মাছ চাষ ও কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় তাহলে কারও দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।’
নারীদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘নারীদের উন্নয়নে সব ধরনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সারাদেশে প্রায় লক্ষাধিক দ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে ৮০ শতাংশ নারী থাকবে।’
এ সময় বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান, উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রায় শতবছরের পুরোনো পরিত্যক্ত ভবন অপসারণ না করা এবং সীমানা পাঁচিল ধসে যাওয়ায় হাসপাতালের মূল ভবনটি এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা রোগীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চারপাশের সীমানা পাঁচিলটি জরাজীর্ণ হয়ে অধিকাংশ জায়গায় ভেঙে পড়েছে। পাঁচিলের যে অংশটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, তাও বিপজ্জনকভাবে হেলে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় পাঁচিল ধসে পড়ার ভয়ে থাকেন তারা। বিশেষ করে শিশুরা এই ভাঙা পাঁচিলের আশেপাশে খেলাধুলা করায় বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র চত্বরে থাকা পুরোনো ভবনটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও তা এখনো অপসারণ করা হয়নি। বর্তমানে এই ভবনটি ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। স্থানীয়রা জানান, জঙ্গল ও ভাঙা দেয়ালের ভেতরে এখন বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এতে করে মূল ভবনে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও দায়িত্ব পালনরত চিকিৎসকদের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
সীমানা পাঁচিল না থাকায় হাসপাতালের আঙিনাটি এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। এতে করে হাসপাতালের পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি সরকারি সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যা হলেই এই পরিত্যক্ত স্থানে বহিরাগত ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়, যা এলাকাবাসীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শারমিন আক্তার জানান, বিষয়টি জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে তিনবার জেলা সিভিল সার্জন অফিসে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য লিখিত প্রতিবেদন প্রেরণ করেছি।’
হাটবোয়ালিয়ার সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের দাবি, অনতিবিলম্বে এই জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে অপসারণ করা হোক এবং নতুন সীমানা পাঁচিল নির্মাণের মাধ্যমে হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। জনস্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে নিরাপদ ও সেবামুখী পরিবেশে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আশরাফুল ইসলাম লালের আঙুর বাগান ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনার গল্প। ২০২৪ সালে মাত্র ৩ বিঘা জমিতে আঙুর চাষ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে তার বাগান বিস্তৃত হয়েছে ২০ বিঘায়, যার মধ্যে ৭ বিঘাজুড়ে রয়েছে আঙুরের চাষ।
জীবননগর উপজেলার হাসাদহ ইউনিয়নের হাসাদহ গ্রামের তালপুকুর মাঠে গড়ে ওঠা এই বাগানে প্রতিদিনই চলছে আঙুর সংগ্রহ। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ ক্যারেট আঙুর উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তা লাল। জেলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে আঙুর কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আঙুর বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকা দরে, আর খুচরা বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায়।
লাল জানান, তার এই বাগানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক দৈনিক চুক্তিতে এবং আরও ১৫ জন মাসিক চুক্তিতে কাজ করছেন। ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
কুষ্টিয়া থেকে আসা পাইকার শরীফ বলেন, ‘অনলাইনে বাগানটি দেখে এখানে এসেছি। দেশের বাইরে থেকে যে আঙুর আসে, এর মানও প্রায় একই রকম। তাই এখান থেকে কিনে নিয়ে গিয়ে আমার খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করব।’
কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল লতিফ জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরে আঙুর চাষের পরিকল্পনা করছিলাম। আজ লাল ভাইয়ের বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। ১,৫০০টি চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছি, নিজের বাগান তৈরি করার জন্য।
এদিকে স্থানীয়দের মধ্যেও বাগানটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্কুলছাত্র আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের বাড়ি পাশের গ্রামে। মাঝে মাধ্যেই আমরা বাগানে আসি। এখানে এসে আঙুর খেতেও পাই, খুব ভালো লাগে।’
খয়েরহুদা গ্রামের গৃহবধূ সপ্না তার ছোট মেয়ে লাবনীকে নিয়ে বাগান দেখতে এসে বলেন, ‘অনলাইনে দেখে আজ সরাসরি এলাম। বাগান খুব সুন্দর। গাছ থেকে আঙুর খেয়েছি, যাওয়ার সময় কিছু কিনেও নিয়ে যাব।’
তরুণ উদ্যোক্তা আশরাফুল ইসলাম লালের এই সফলতা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। আধুনিক পদ্ধতিতে ফল চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার এ উদ্যোগ এলাকাজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কয়েক দিনের ব্যবধানেই উৎসবমুখর ধান কাটার দৃশ্য বদলে গিয়ে হাহাকারে পরিণত হয়েছে। বিরতিহীন বৃষ্টি আর সীমান্ত পেরিয়ে আসা উজানের পাহাড়ি ঢলের তোড়ে জেলার হাওরাঞ্চলের অন্তত ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৩৪ হাজার কৃষক। বিশেষ করে ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন উপজেলার নিচু এলাকার হাওরগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ইটনা এক উপজেলাতেই প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ফসল বর্তমানে নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে।
পাহাড়ি ঢলের প্রবাদে ধনু, মেঘনা, বৌলাই ও কালনীসহ প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি হু হু করে বাড়ছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি গতকালের চেয়ে ১০ সেন্টিমিটার এবং চামড়াঘাট পয়েন্টে মগড়া নদীর পানি ১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীগুলোর পানি এখনো বিপৎসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে আগাম বন্যার শঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক স্থানে নদী উপচে পানি সরাসরি হাওরে প্রবেশ করায় পাকা ধান রক্ষা করা কৃষকদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে যুক্ত হয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা। বৈরী আবহাওয়া ও বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকরা মাঠে যেতে চাচ্ছেন না; এমনকি দৈনিক দুই হাজার টাকা মজুরিতেও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ধান কাটার জমিতে পানি জমে যাওয়ায় আধুনিক ‘হারভেস্টার’ মেশিনগুলোও অকেজো হয়ে পড়েছে। হাওরে প্রায় ৬০০ হারভেস্টার মেশিন থাকলেও জলাবদ্ধতার কারণে সেগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উপায়ান্তর না দেখে কৃষকরা জীবনঝুঁকি নিয়ে কোমর সমান পানিতে ডুবে আধপাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
ফসল ঘরে তোলা নিয়ে সংকটের পাশাপাশি উৎপাদিত ধানের মান ও বাজারমূল্য নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা। টানা বৃষ্টির কারণে ধান শুকানোর জন্য কোনো শুকনো জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে ভেজা ধানে চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে। সরকারিভাবে গত রোববার থেকে ১৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কেনা শুরু হলেও ধানের আর্দ্রতা বেশি থাকায় গুদামে ধান নিতে পারছে না কৃষকরা। বিপরীতে স্থানীয় খোলাবাজারে বর্তমানে প্রতি মণ ধান মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিপুল বিনিয়োগ ও ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করা কৃষকরা নামমাত্র মূল্যে ধান বিক্রি করে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে এবং এরই মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে বাকি ৪০ শতাংশ ফসল রক্ষা করা এখন সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে। কৃষি বিভাগ আশা করছে, বড় ধরনের দুর্যোগ না হলে এখনো ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ধান পাওয়া সম্ভব। তবে কৃষকরা দাবি জানিয়েছেন, সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, অন্যথায় হাজার হাজার কৃষক পরিবারকে নিঃস্ব হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে।
স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে কাজে বেরিয়েছিলেন। ঘরে রেখে গিয়েছিলেন চার শিশুকে। কিন্তু কর্মস্থলে যাওয়ার পথেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান স্বামী। একই দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন স্ত্রী, যিনি এখনো জানেন না, তার স্বামী আর বেঁচে নেই। কিছু বুঝে উঠতে পারছে না ওই দম্পতির চার শিশুসন্তান, নির্বাক হয়ে পড়েছে তারা। গতকাল বোববার সকাল ছয়টার দিকে সিলেটের তেলিবাজার এলাকায় ট্রাক ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে আটজন নিহত হন, যাদের মধ্যে ওই স্বামী-স্ত্রীও ছিলেন। এছাড়া একইদিন নোয়াখালীতে মায়ের সামনে ড্রামট্রাকের চাপায় শিশু, কুমিল্লায় বাবার মোটরসাইকেল থেকে ছিঁটকে পড়ে ছেলে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রাক ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে শ্যালক ও দুলাভাই নিহত হয়েছেন। তবে শুধু একদিন নয়;
দিন যত যাচ্ছে দীর্ঘ হচ্ছে সড়কে মৃত্যুর মিছিল। থেমে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় আগামীর স্বপ্ন। কেউ যেন দেখছে না, শুনছে না স্বজনদের আহাজারি। এত নিয়ম ও আইন তবুও থামানো যাচ্ছে না এই মৃত্যুর যাত্রা। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এখন প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম। প্রতিদিনই সারাদেশে সড়কে প্রাণ যাচ্ছে মানুষের।
সিলেট: নিহত ব্যক্তিদের সবাই নির্মাণশ্রমিক। আহত হয়েছেন অন্তত ১২ জন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন– সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার সরিষা নার্গিস (৪৫), দিরাইয়ের সেচনী গ্রামের মোছা. মুন্নি বেগম (৩৫), দিরাইয়ের ভাটিপাড়া গ্রামের নুরুজ আলী (৬০), ভাটিপাড়া নূর নগরের ফরিদুল (৩৫), বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩৫) ও আমির উদ্দিন (২২); সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শিবপুর গ্রামের পান্ডব বিশ্বাস (২০) ও পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামান (৪৫)।
আহত কয়েকজন জানান, ভবনে ঢালাইয়ের কাজের জন্য সিলেটের আম্বরখানা থেকে একটি পিকআপে করে দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন তারা। পিকআপে ২০ জন ছিলেন। সঙ্গে ছিল ঢালাই মেশিন। পিকআপটি তেলিবাজার এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক আসা কাঁঠালবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় পিকআপে থাকা সবাই ছিটকে পড়েন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামানের স্ত্রী হাফিজা বেগম (২৮) আহত হয়েছেন তার । তিনি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার বিষয়ে হাফিজা জানান, পিকআপে করে কাজে যাচ্ছিলেন। পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে পিকআপের সংঘর্ষ হয়। এতে তিনি মাথায় আঘাত পান। এরপর আর কিছু মনে নেই। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারেন, তিনি চিকিৎসাধীন। তার ধারণা স্বামীও বেঁচে আছেন, একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বেলা পৌনে দুইটার দিকে হাফিজাকে শারীরিক পরীক্ষার জন্য ক্যাজুয়ালটি বিভাগ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় হাসপাতালের শয্যায় বসে ছিল তার চার সন্তান।
আর নিহত আটজনের মরদেহের সঙ্গে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে বদরুজ্জামানের মরদেহও। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বদরুজ্জামানের চাচাতো ভাই সালেহ আহমদ। তিনি বলেন, বদরুজ্জামান চার শিশুসন্তান রেখে গেছে। তিন ছেলে, এক মেয়ে। কাজের জন্য সকালে স্বামী-স্ত্রী বেরিয়েছিল। পথে একজন (বদরুজ্জামান) মারা গেছে, আরেকজন হাসপাতালে। তাদের চারটি সন্তান আছে। এখন বাচ্চাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত।
নিহত দুই ভাই: নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩৫) ও আমির উদ্দিন (২২) রয়েছেন। প্রায় ১০ বছর ধরে সিলেট নগরের সুবিদবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন। বেলা একটার দিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে নিহত দুই ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন তাদের খালাতো ভাই শামীম আহমদ। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দুর্ঘটনার খবর ও নিহত ব্যক্তিদের ছবি দেখে সন্দেহ হলে তিনি হাসপাতালে আসেন। পরে মরদেহ দেখে দুই ভাইকে শনাক্ত করেন। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়েছে। তারা সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। একসঙ্গে দুই ভাইকে হারিয়ে পরিবারে মাতম চলছে।
নোয়াখালী: সুবর্ণচরে মায়ের সামনে ড্রামট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মো. ইয়ামিন (৮) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে সোনাপুর–চেয়ারম্যানঘাট মহাসড়কের পরিষ্কার রাস্তার মাথা এলাকার ডাক্তার মসজিদের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ইয়ামিন উপজেলার চরক্লার্ক ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চরবায়োজিদ গ্রামের শাহাদাত হোসেনের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে বাড়ি থেকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশে বের হন ইয়ামিন ও তার মা বকুল আক্তার। পরে পরিষ্কার বাজার এলাকার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তারা যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় মাইজদী থেকে চেয়ারম্যানঘাটগামী একটি বেপরোয়া ড্রামট্রাক অটোরিকশাকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উঠে যায় এবং ইয়ামিনকে চাপা দেয়। এতে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়।
চরজব্বর থানার ওসি মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করে থানায় নিয়ে এসেছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
দেবিদ্বার(কুমিল্লা): দেবিদ্বারে বাবার মোটরসাইকেল থেকে ছিঁটকে পড়ে এক মাদরাসার ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল সকাল ১০টার দিকে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার পৌরসভার বানিয়াপাড়া আজগর আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত মো. খালিদ হোসেন (৮) দেবিদ্বার উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের গোপালনগর গ্রামের সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন স্বপনের ছেলে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই শিশু তার বাবার সঙ্গে দেবিদ্বারের পৌর এলাকার বাবুস সালাম নামে একটি হাফিজিয়া মাদরাসা থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। এ সময় পৌর এলাকার আজগর আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এসে পৌছালে ভাঙাচোরা সড়কের ঝাঁকুনিতে মোটরসাইকেল থেকে ছিঁটকে পড়ে পরে পিছন থেকে আসা একটি কাভার্ডভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই শিশুটি মারা যায়। পরে তারা বাবা শিশুটির রক্তাত্ব দেহ নিয়ে বাড়ির দিকে চলে যায়।
দেবিদ্বার থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, শিশুটি ঘটনাস্থলে মারা গেছে। ঘটনা শোনার পর পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: নাচোল উপজেলার নাচোল-আড্ড সড়কের বেনিপুর মোড়ে ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই শ্যালক ও দুলাভাই নিহত হয়েছে। এরা হলেন সোহাগ (১৭) এবং রবিউল আউয়াল (২২)। গতকাল সকাল ছয়টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নাচোল থানার ওসি সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ জানান, সোহাগ ও রবিউল আওয়াল সম্পর্কে শ্যালক ও দুলাভাই। তারা মোটরসাইকেলযোগে নওগাঁর দিকে যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নাচোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি জানান, সোহাগের বাড়ি নাচোল ও তার দুলাভাই রবিউল আওয়ালের বাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলায়। লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সিলেট, নোয়াখালী, দেবিদ্বার (কুমিল্লা) ও চাপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর মাতারবাড়ির মূল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। রোববার (৩ মে) থেকে বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার এক বছর পর মাঠপর্যায়ে এই কাজ শুরু হওয়া প্রকল্পের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পের প্রথম প্যাকেজের কাজ করছে জাপানের দুই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান পেন্টা ওশান এবং টোয়া কর্পোরেশন। প্রায় ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্যাকেজের আওতায় বন্দরের মূল জেটি ও টার্মিনাল কাঠামো তৈরি করা হবে। গত বছরের এপ্রিলে এই প্রতিষ্ঠান দুটির সাথে চুক্তি সই হলেও কারিগরি প্রস্তুতি ও মালামাল সংগ্রহের প্রক্রিয়া শেষে এখন প্রকল্প এলাকায় পুরোদমে দৃশ্যমান কাজ শুরু হলো।
নির্মাণকাজের প্রাথমিক পর্যায়ে জাপান থেকে আনা একটি বিশেষায়িত বিশালাকার ড্রেজার দিয়ে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্র থেকে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি মাটি ও বালি উত্তোলন করা হবে, যা দিয়ে প্রকল্প এলাকা ভরাট করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সম্প্রসারণ কাজের জন্য মাটি সংরক্ষণ করা হবে। এই প্যাকেজের অধীনে আগামী চার বছরের মধ্যে ৪৬০ মিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক কন্টেনার জেটি এবং ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি মাল্টিপারপাস জেটিসহ আনুষঙ্গিক ব্যাকইয়ার্ড সুবিধাদি গড়ে তোলা হবে।
মহেশখালীর ১ হাজার ৩০ একর জায়গায় গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরটি চালু হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং বড় আকৃতির মাদার ভেসেল বা গভীর সমুদ্রগামী জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভিড়তে পারবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে জেটি ও টার্মিনালের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ করা হবে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে ২০৩০ সাল থেকে বন্দরটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন অনুযায়ী, মাতারবাড়ি বন্দরটি ২০২৯ সালে চালু হওয়ার পর বছরে অন্তত ১১ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হবে। দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৪১ সাল নাগাদ এই হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ২৬ লাখ টিইইউএসে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হলে বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি এটি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অন্যতম প্রধান পরিবহণ ও বাণিজ্যিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর জনপদে বোরো ধানের মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও সীমান্ত নদী দিয়ে নেমে আসা পানির তোড়ে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির আধপাকা ও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে এই দুই জেলায় অন্তত ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। চোখের সামনে সোনালি ফসল পচে নষ্ট হতে দেখে ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হাহাকারের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন হাওরের প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এখানকার ৮০ হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা পাহাড়ি ঢলের চাপ সামলাতে পারছে না। শ্রমিক সংকট এবং কোমর সমান পানিতে হারভেস্টার মেশিন চালাতে না পারায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত গতিতে ধান কাটতে পারছেন না, ফলে পানিতে থাকা অবশিষ্ট ধানগুলো দ্রুত পচে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলার প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে। এতে ৩২ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জীবনঝুঁকি নিয়ে কৃষকরা কিছু ধান কাটার চেষ্টা করলেও বারবার বজ্রপাত ও কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ধনু ও মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজানের পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চলগুলো দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে।
প্রকৃতির এমন রুদ্রমূর্তিতে হাওরজুড়ে এখন লাখো কৃষকের নিঃস্ব হওয়ার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। ধান কাটার শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ঝোড়ো বাতাস ও বজ্রপাতের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ শীতল পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। অনেক এলাকায় পাকা ধান কাটার সুযোগ না পাওয়ায় ঋণগ্রস্ত কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষি যন্ত্রপাতির অভাব এবং বৈরী আবহাওয়ার এই দ্বিমুখী চাপে ফসলের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা এখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়া পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পাহাড়ি ঢল আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। এমতাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় বিশেষ ত্রাণ ও প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হলেও মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সহায়তা কতটা কৃষকের দুর্ভোগ লাঘব করবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, হাওর জনপদে এখন শুধুই কষ্টের ফসল হারানোর বেদনা আর কান্নার রোল।