ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ছয় মাস পূর্তি ছিল গত বুধবার। সেদিনই নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ঘোষণা দেওয়ার কথা ছড়িয়ে পড়ায় আবারও ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে বুধবার রাতে প্রথমে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর গুঁড়িয়ে দেয় তারা। সে রাতে ভাষণও দেন ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা। এতে ক্ষোভের মাত্রা এত বেশি ছিল যে ধানমণ্ডিতে শেখ হাসিনার স্বামীর বাড়ি ‘সুধা সদন’ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। এরপর এই ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার কারণে সারা দেশে আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের বাড়িতে একের পর এক হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে থাকে। গত বুধবার রাতেই ভোলায় আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদের বাড়িতে, বরিশালে দলটির আরেক বর্ষীয়ান নেতা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমুর বাড়িতে, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের গ্রামের বাড়িতে, নারায়ণগঞ্জে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পৈতৃক বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতা। এছাড়াও নওগাঁয় সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদারের বাড়ি, রাজশাহীতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বাড়িতেও হামলা, বাঙচুর ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও আগুন এবং দলটির অনেক নেতার বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর, আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
তোফায়েল আহমেদের ভোলার বাসায় ভাঙচুর, আগুন
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদের ভোলার দোতলা বাসভবনে ভাঙচুরের পর আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। গতকাল বুধবার রাতে শহরের গাজীপুর রোডের ‘প্রিয় কুটির’ নামের বাসভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়।
এ সময় তোফায়েল আহমেদের বাড়িতে একটি ক্রেন ও একটি এক্সকাভেটর আনা হয়। তবে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ফায়ার সার্ভিসের কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি।
স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রাত ১টার দিকে দুই-তিন শ বিক্ষুব্ধ জনতা তোফায়েল আহমেদের বাসায় ভাঙচুর চালায়। বিক্ষুব্ধ জনতা বাসার ভেতরে থাকা বিভিন্ন আসবাবপত্র বাইরে বের করে সড়কে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে বাসায় দোতলা ও নিচতলায় আগুন দেয় তারা। পরে তাদের মধ্য থেকে একটি দল সড়কে হ্যান্ডমাইকে জয়বাংলার গান বাজিয়ে নাচতে থাকে ও গানের তালে তালে জয়বাংলা স্লোগান দিতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত বাসার ভেতরে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের পর আর ভোলায় আসেননি অসুস্থ তোফায়েল। বাসাটিতে তার ছেলে থাকতেন বলে জানা গেছে।
ভোলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মো. লিটন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, তারা কোনো অগ্নিকাণ্ডের খবর পাননি।
বরিশালে আমুর বাড়ি গুড়িয়ে দিয়ে আগুন
বরিশাল নগরীতে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমুর বাসভবন বুলডোজার দিয়ে ভেঙে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে জনতা। গত বুধবার রাত ২টার দিকে সিটি করপোরেশনের বুলডোজার দিয়ে নগরীর বগুড়া রোডের বাড়িটিতে ভাঙচুর শুরু করা হয়। রাত ৩টার দিকে ভাঙচুর শেষে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় জনতা।
এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী ও জনতা নগরীর কালীবাড়ী রোডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাত ভাই আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর বাড়িটিও বুলডোজার চালিয়ে গুড়িয়ে দেয়। তারপর সেখানেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাত ১১টার দিকে কালীবাড়ী রোডে এসে পুলিশ অবস্থান নেয়। রাত ১২টার দিকে সেনাবাহিনীরি সদস্যরাও সেখানে আসেন। একই সময় ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে কালীবাড়ি রোডের ‘সেরনিয়াবাত ভবন’ এর দিকে এগোয়। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের সড়কের দুইপাশ থেকেই প্রবেশে বাধা দেয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে জড়ো হয় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে ভবনের ভেতর প্রবেশ করে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিনেও এ ভবনটিতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা।
নোয়াখালীতে ওবায়দুল কাদেরের গ্রামের বাড়িতে ভাঙচুর-আগুন
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের গ্রামের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১টার দিকে উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের রাজাপুর গ্রামের বাড়িটিতে এ হামলা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা উপজেলার বসুরহাট বাজার থেকে মিছিল বের করে। মিছিলটি বসুরহাট বাসস্ট্যান্ড হয়ে ওবায়দুল কাদেরের বাড়িতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে থাকা ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল কাদের মির্জার দোতালা ভবন হাতুড়ি, শাবল দিয়ে ভাঙা হয়। পরে ভাঙচুর করা হয় তার ছোট ভাই শাহাদাত মির্জার ভবনও।
এর আগে ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের দিন বিকালে ওই বাড়ির পাঁচটি বসতঘর এবং দুটি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। সেদিন বাড়িটির বেশ কিছু আসবাব লুটপাটও হয়।
নাজিম উদ্দিন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ৫ আগস্টের কিছুদিন পর কাদের মির্জা ভবনটি সংস্কার করেছিলেন। দ্বিতীয় দফায় কাদেরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হল। তবে হামলা-ভাঙচুরের সময় তাদের পরিবারের কেউ ছিলেন না। কাদেরের পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নোয়াখালী জেলা শাখার সমন্বয়ক মো. আরিফুল ইসলাম।
গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শামীম ওসমানের পৈতৃক বাড়ি
নারায়ণগঞ্জে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পৈতৃক বাড়ি ‘বায়তুল আমান’ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। তার আগে বহু লোকজন বাড়িতে প্রবেশ করে ভাঙচুর শুরু করে। ভবনটি ভাঙার কাজ চলার সময় সেখানে বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও উৎসুক জনতাকে উল্লাস করতে দেখা যায়৷
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে শহরের মিশনপাড়া এলাকা থেকে মহানগর বিএনপির একটি মিছিল বের হয়। তাতে নেতৃত্ব দেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান ও সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। মিছিলটি শহরের চাষাঢ়ায় বায়তুল আমানের সামনে এসে পৌঁছালে শুরুতে বড় আকারের হাতুড়ি দিয়ে ভবনটির দেয়াল ভাঙতে শুরু করেন লোকজন। পরে একটি বুলডোজার দিয়ে ভবনটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়৷ ভবনটির ভেতরের একটি অংশেও দেওয়া হয় আগুন।
ঘটনাস্থলে থাকা বিএনপি নেতা আবু আল ইউসুফ খান টিপু সাংবাদিকদের বলেন, “খুনি হাসিনা ও তার ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বছরের পর বছর মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। শামীম ওসমান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী অসংখ্য গুম, খুন করেছে। ওসমান বাহিনীর প্রতি মানুষের যে ক্ষোভ, এই ভবনটি ভাঙার মধ্য দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে৷”
এর আগে বেলা ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালত, জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের বেশ কয়েকটি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য ভাঙচুর করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। এ সময়ও নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপির ওই দুই নেতা। সেখানেই দুপুরে ঘোষণা দেওয়া হয় সন্ধ্যার পর বায়তুল আমান ভবনটিও ভেঙে ফেলার।
খুলনায় ‘শেখ বাড়ি’ এখন ধ্বংসস্তূপ
খুলনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঁচ চাচাতো ভাইয়ের ‘শেখ বাড়িতে’ গত বুধবার রাতে অগ্নিসংযোগ ও বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুরের পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাড়ির ইট ও রড খুলে নিয়ে গেছে লোকজন। প্রায় দেড় দশক খুলনায় ‘ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু’ থাকা ভাঙা বাড়িটি দেখতে ভিড় করছেন উৎসুক জনতা।
এদিন দুপুরে নগরীর শেরে বাংলা রোডে গিয়ে দেখা যায়, ‘শেখ বাড়ি’ এখন পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপ। অসংখ্য মানুষ হাতুড়ি দিয়ে ইট খুলে রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইকে করে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ যন্ত্রপাতি দিয়ে রড কেটে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ইট ও রড খুলে ওই বাড়ির সামনে বিক্রি করছে। ভোর থেকে এই কর্মকাণ্ড চলছে বলে জানান স্থানীয় লোকজন। বিকেলে বাড়িটির সামনে গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র।
বাড়ির চত্বরে ডিজিটাল দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করে রড কিনছিলেন শেখপাড়া এলাকার এক ভাঙাড়ির দোকানি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দোকানি বলেন, এখানে সস্তায় কিনতে পারছি, সে কারণে এখানে এসেছি।
রিকশায় করে ইট নিয়ে যাওয়ার সময় চালক সোলায়মান হোসেন বলেন, ‘১৫ বছর আওয়ামী লীগের লোকজন লুট করেছে। সে কারণে এখন তাদের ইট-রড খুলে নিয়ে যাচ্ছি। এই বাড়ির লোকজন খুলনার মানুষের ওপর অনেক নিপীড়ন চালিয়েছে।’
এর আগে বুধবার রাত ৮টার দিকে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা শেখ বাড়ির সামনে জড়ো হয়। তারা সেখানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় ছাত্র-জনতা স্লোগান দিতে থাকে ‘শেখ বাড়ির আস্তানা ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও’, স্বৈরাচারের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’। রাত ৯টা থেকে ৩টি বুলডোজার দিয়ে বাড়ির গেট ও দোতলা বাড়ির অর্ধেক অংশ গুঁড়িয়ে দেয়। এছাড়া বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ সময় উৎসুক অসংখ্য মানুষ সেখানে ভিড় করেন।
বাড়িটি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েল, যুবলীগ নেতা শেখ সোহেল, শেখ জালাল উদ্দিন রুবেল ও শেখ বাবুর। এই বাড়ি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো খুলনায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি, ব্যবসা, ঠিকাদারি, নিয়োগ, বদলি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ অনেক কিছু। এর আগে ৪ ও ৫ আগস্ট এই বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও সবচেয়ে বেশি ভাঙচুর চালিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বিক্ষুব্ধ লোকজন। তবে সেদিন শেখ পরিবারের কেউ বাড়িটিতে ছিলেন না।
খুবিতে মুর্যালসহ ৫ স্থানে ভাঙচুর
এদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুরসহ পাঁচটি স্থানে ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। গতকাল দুপুর ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা নগরীর দৌলতপুরে সরকারি বিএল কলেজে শেখ মুজিবুর রহমানের মুর্যাল ভাঙচুর করে। বেলা ১১টার দিকে নগরীর গল্লামারী এলাকায় লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে শেখ মুজিবুর রহমানের মুর্যাল ভাঙচুর করা হয়।
এর আগে বুধবার রাতে শিক্ষার্থীরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কালজয়ী মুজিব’ ম্যুরাল ভাঙচুর করে। রাতে নগরীর দোলখোলা এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন দেলোর বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ভেঙে দেওয়া হয় তার বিলাসবহুল গাড়ি। আগুন দেওয়ার পর ৫ তলা বাড়ির লোকজন আতঙ্কে ছাদে উঠে যায়। পরে ফায়ারা সার্ভিসের দু’টি গাড়ি গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া নগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়া এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা আইয়ুব আলীর বাড়ি ভাঙচুর করে লোকজন।
সারা দেশে হামলা ভাঙচুরের আরও কিছু ঘটনা
সিলেটে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ম্যুরাল। গত বুধবার রাতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত ম্যুরালটির অবশিষ্ট অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে মুসলিম জনতার ব্যানারে ম্যুরালটিতে ভাঙচুর চালানো হয়েছিল।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বক্তৃতা প্রচারকে কেন্দ্র করে গতকাল রাতে চট্টগ্রামে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা। পরে তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে গিয়ে পুরোনো একাডেমিক ভবনের সামনে থাকা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করেন। পরে সেখান থেকে তারা জামালখান মোড়ের দেয়ালে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভাঙচুর করেন। এর আগে বিক্ষুব্ধরা একটি মশাল মিছিল বের করেন।
কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুবউল-আলম হানিফের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে একটি দল। গতকাল রাত ১০টার দিকে এক্সক্যাভেটর নিয়ে তারা বাড়ির সামনের কিছু অংশ ভেঙে ফেলে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর দলটি চলে যায়। স্থানীয়রা জানান, গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ওই বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ পরিবারের সদস্য ও জাতীয় চার নেতার একজনের নামে থাকা সব স্থাপনার নামফলক, গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন মুছে দিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাত ৯টার দিকে বিক্ষোভ শেষে মিছিল নিয়ে চারটি আবাসিক হল ও একটি স্কুলের নামফলক ভেঙে নতুন নাম দেন। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘বিজয়-২৪ হল’, নির্মাণাধীন শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হলের পরিবর্তে ‘শহীদ আলী রায়হান হল’, শেখ হাসিনা হলের পরিবর্তে ‘ফাতিমা আল-ফাহরিয়া হল’ এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের পরিবর্তে ‘নবাব ফয়জুন নেসা চৌধুরানী’ ও শেখ রাসেল মডেল স্কুলের নাম পরিবর্তন করে ‘রিয়া গোপ মডেল স্কুল’ নাম দিয়ে ব্যানার ঝুলিয়ে দেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রধান ফটকে শেখ হাসিনার ঘৃণাসূচক ছবি টানিয়ে গণজুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিতে জুতা নিক্ষেপ করে তাঁর ফেসবুক লাইভে আসার প্রতিবাদ জানান।
নাটোরে সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের পোড়া বাড়ি আলোচিত ‘জান্নাতি প্যালেসে’ আবারও আগুন দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। বুধবার রাতে শিক্ষার্থীরা শহরের কান্দিভিটা এলাকায় সাবেক আগুন দেন। এসময় মাইক বাজিয়ে মিছিল নিয়ে কান্দিভিটাস্থ শিমুলের জান্নাতি প্যালেসে যান এবং আগুন দেন। প্রায় এক ঘণ্টা পোড়া বাড়ির ভেতরে ছিলেন ছাত্ররা।
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় নকল দুধ তৈরির এক কারিগরকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাতে উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে এই রায় দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুজ্জামান। দণ্ডপ্রাপ্ত আশরাফুল আলী (৪২) ওই গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে। এ সময় সেখান থেকে নকল দুধ তৈরির উপাদান তিন ড্রাম জেলি ও বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালসহ ২০০ লিটার নকল দুধ জব্দ করে তা ধ্বংস করা হয়। এ সময় উপজেলা সেনেটারি ইন্সপেক্টর নুরুল ইসলামসহ পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, আশরাফুল নিজ বাড়িতে সিলিং সেন্টার বসিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ নকল দুধ তৈরি করে আসছিল। এসব দুধ তিনি এলাকার বিভিন্ন সিলিং সেন্টারে সরবরাহ করতেন। আর এভাবে তিনি নকল দুধ তৈরি করে অল্প দিনের মধ্যেই হয়ে গেছেন কোটিপতি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাত ৯টার দিকে সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুজ্জামান। অভিযানে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর ৫০ ধারা অনুযায়ী ওই ব্যক্তিকে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রাতেই তাকে থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করা হয়।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুর্কী ও ভাবখণ্ড বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে শিশুদের নকল প্রসাধনী ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির দায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় একটি প্রতিষ্ঠান সিলগালাও করা হয়। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেলের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানে জামুর্কী বাজারের মহন্ত স্টোর থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুদের প্রসাধনী জব্দ করা হয়। এ অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার করে ল্যাব পরিচালনার দায়ে জামুর্কী বাজারের মির্জাপুর পপুলার ল্যাব অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই বাজারে জামুর্কী লাইফ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ৫ হাজার টাকা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির দায়ে একটি ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অপরদিকে উপজেলার ভাবখন্ড বাজারে পরিচালিত পৃথক অভিযানে একটি ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির দায়ে আরও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল শিশুদের প্রসাধনী জব্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।’ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’ এই প্রতিপাদ্যে যথাযোগ্য মর্যাদায় মানিকগঞ্জে বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম মানবপাচার, লোক চোরাচালান এবং সাইবার প্রতারণা প্রতিরোধ ৪-দফা কাঠামো প্রকল্পের উদ্যোগে মানিকগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে থেকে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়। পরে মানিকগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী নূর অতএব আহম্মদ, বিশেষ অতিথি হিসেবে জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের সহকারী পরিচালক আওলাদ হোসেন, স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ব্র্যাক ডিসট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. শফিকুল ইসলাম এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এমআরএসসি কো-অর্ডিনেটর রোমানা আফরোজা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ প্রকৌশলী নূর অতএব আহম্মদ বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানবপাচার রুখে দেওয়া সম্ভব। তথ্য প্রযুক্তির যুগে অনলাইন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দায়িত্বশীল ও সতর্ক ব্যবহারের মাধ্যমে মানবপাচারের ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারি।’
এ ছাড়াও মুক্ত আলোচনায় এনজিও প্রতিনিধিরা, মানবপাচারের শিকার সারভাইভার, সম্ভাব্য অভিবাসী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে মানবপাচার প্রতিরোধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে নিজ নিজ মতামত ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে চলন্ত বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বগি থেকে মোটর খুলে নিয়ে পালানোর সময় দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে কুলিয়ারচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের আটক করেন। এ সময় চুরি হওয়া এসির মোটরটিও উদ্ধার করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন- ভৈরব নিউটাউন এলাকার মৃত মানিক মিয়ার ছেলে মো. দুলাল মিয়া (২৫) এবং একই এলাকার মো. বাবু মিয়ার ছেলে মো. আরিফ (১৬)।
রেলওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ভৈরব স্টেশন অতিক্রম করে কুলিয়ারচরের দিকে যাচ্ছিল চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুরগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস। এ সময় ট্রেনের একটি এসি বগির মোটর খুলে ফেলেন দুই ব্যক্তি। পরে চুরি করা মোটর নিয়ে তারা চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন।
বিষয়টি কয়েকজন যাত্রীর নজরে এলে তারা ট্রেনের স্টাফদের জানান। পরে জরুরি ভিত্তিতে কুলিয়ারচর স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই খরকমারা এলাকায় ট্রেনটি থামানো হয়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ধাওয়া করে চুরি করা মোটরসহ দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, আটক দুজন ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন থেকেই চুরির উদ্দেশে এসির মোটর খোলার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে ট্রেনে উঠেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
আটকের পর স্থানীয় কিছু লোকজন তাদের মারধর করেন। পরে ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাদের হেফাজতে নেন। উদ্ধার করা হয় চুরি হওয়া এসির মোটর।
পরে আটক দুজনকে ওই ট্রেনেই কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে (জিআরপি) থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী বলেন, ‘চলন্ত ট্রেন থেকে এসির যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে। প্রথমে যাত্রীরা বিষয়টি টের পান। পরে তারা ট্রেনের স্টাফদের জানালে এসির যন্ত্রাংশ খোলার সরঞ্জামসহ দুজনকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
দীর্ঘ ১৭ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত থাকার পর অবশেষে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজে চারতলা ভিতবিশিষ্ট একতলা একাডেমিক ভবনের উদ্বোধন করা হয়েছে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) বেলা ১১টায় কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভবনটির উদ্বোধন করেন ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) আহ্বায়ক ও নীলফামারী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু।
উদ্বোধন শেষে কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হওয়ায় দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কলেজটি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ এবং শ্রেণিকক্ষ সংকট দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বক্তারা আরও বলেন, নবনির্মিত একাডেমিক ভবন চালু হওয়ায় কলেজের শ্রেণিকক্ষের সংকট অনেকটাই দূর হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হবে। ভবিষ্যতে কলেজের সার্বিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ মনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাজেরুল ইসলাম এবং প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিনের সহধর্মিণী তামান্না ইয়াসমিন।
অনুষ্ঠানে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয়গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
২৮ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ২৩০০ একরের পাহাড়ী ক্যাম্পাসে পড়াশোনার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়।
স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই তাদেরকে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। ২৮ হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মাত্র ১৪ টি আবাসিক হল যেখানে মাত্র ৯ হাজার শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা ভোগ করতে পারে। মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২১% আবাসন সুবিধা পেয়ে থাকে বাকিদেরকে থাকতে হয় বাহিরের বিভিন্ন কটেজ কিংবা মেচ ভাড়া করে। সেখানেই তাদেরকে সত্যিকার জীবনযুদ্ধ টা করতে হয়। কোনোরকম থাকার মত একটি সিট জোগার করতেই শিক্ষার্থীদের গুনতে হয় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এরপর খাবারের জন্য হোটেল এবং ক্যান্টিনগুলোতে ভিড় করতে হয়। হোটেল ব্যবসায়ীরা এ ফাঁকে ফায়দা লুটে নেয়। অপরিচ্ছন্ন ও নিম্নমানের খাবার বিক্রি করে চরম মূল্যে। এ যেন মরার উপর খঁড়ার গা।
ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা টিউশনের জন্য ২৫ কিলোমিটার শাটল ট্রেনে চড়ে শহরে যেতে হয়, সেখানেও টিউশন মিডিয়ার বলির পাঠা হতে হয়। ৩ হাজার টাকার টিউশন নিতে মিডিয়াকে দিতে হয় ৬০% পর্যন্ত ফি।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ভোগান্তিটা তুলনামূলক বেশি হয়। শাটলে করে আসা যাওয়ার জন্য প্রতিদিন ৪ ঘন্টা ব্যয় হয়। শাটল ট্রেনেও শিক্ষার্থীরা মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকেন, দূর্বৃত্তদের ছোরা পাথরে আহত হয় অসংখ্য শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চবি শিক্ষার্থীদের জন্য যাতায়াতের একমাত্র বাহন শাটল ট্রেন, সেটিরও প্রতিদিন শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। দূর্বল ইঞ্জিন দিয়ে ঠিকমত সেবা দিতে পারে না শাটল।
অন্যদিকে শিক্ষক- কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে স্পেশাল বাস সেবা। শিক্ষকবাসে আবার শিক্ষার্থীদের উঠা সম্পূর্ণ নিষেধ।
এছাড়া ক্যাম্পাসে রয়েছে স্থানীয়দের একক আধিপত্য, শিক্ষার্থীরা অটো রিকশায় যাতায়াত, দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে ঝামেলা পোহাতে হয়।
২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী আশফাক বলেন, "সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস দেখে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু এখন বুজতেছি ঠিকে থাকা কতটা মুশকিল।"
২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী রাহাদ বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের সুযোগ সুবিধার কথা কেবল চিন্তা না করে আমাদের জন্য চাইলে কিছু করতে পারে। কয়েকটা হল নির্মাণ করলে আমরা এতটা ভোগান্তির মধ্যে থাকি না।”
ধান চাল উৎপাদনে বরাবরই শীর্ষে উত্তরের জেলা নওগাঁ। এখানকার উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বিশেষ কদর রয়েছে সারাদেশের খুচরা এবং পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। এক মাসের ব্যবধানে চাল বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। কেজিতে এবার ২-৪ টাকা নয় বেড়েছে ৮০ টাকা সুগন্ধি (আতপ) চালের দাম। শুধু তাই নয়, সুগন্ধীর পাশাপাশি বেড়েছে কাটারীসহ সব ধরনের সরু চালের দামও। দেশের বৃহত্তর চালের মোকাম নওগাঁয় ঠিক এমনই টালমাটাল চালের বাজার।
ক্রেতা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় কিছু মিল আর প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর মজুদ সিন্ডিকেটের কারনেই বাড়ছে চালের দাম। তবে মিল মালিক আর ব্যবসায়ী নেতাদের দাবী, সরকারীভাবে রপ্তানী আর হাটে ধানের বাড়তি দামের কারণেই উর্ধ্বমুখী চালের দাম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং এর কথা বললেও বাস্তবে দেখা মিলেনি কারোই।
নওগাঁ পৌর খুচরা চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে সকল প্রকার সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। বাজারে মোট বিক্রির ৮০ শতাংশই হয় কাটারি চাল। শর্টার ও নন শর্টারসহ সব ধরনের কাটারিরর দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। ৭৬ টাকা কেজির চাল ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ৫৮ টাকা। তবে স্মরণ কালের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সুগন্ধি (আতপ) চাল। একমাস আগেও এই চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১২০ টাকা কেজিতে। কিন্তু প্রতিদিনই বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে ৮০ টাকা। চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে। বাজারে চাল কিনতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
আতপ চাল কিনতে আসা ইসমাইল হোসেন বলেন, গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৩ কেজি আতপ চাল কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে শুনি সেই চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। এভাবে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে যাওয়াই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
আব্দুর রহিম নামে আরেক ক্রেতা ৫ কেজি ভাতের চাল কিনতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন। বলেন, এভাবে দাম বাড়লে যারা দিন এনে দিন খান তাদের জন্য চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ৪০ বছর ধরে চালের ব্যবসা করে আসছি। আমার ব্যবসার জীবনে এতটা দাম বৃদ্ধি কখনও দেখিনি। বিশেষ করে আতপ চালের দাম এতটা বৃদ্ধির পিছনে যৌক্তিক কোন কারণ আছে বলে মনে হয়না। প্রতিদিনই ক্রেতাদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে আমাদের।
আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ার অভিযোগ করে বলেন, কিছু বড় মিলার ও প্রাইভেট কোম্পানীর ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই চাল কিনে মজুদ করেছেন। তারাই মূলত এখন বাজার নিয়ন্ত্রন করছেন।
ফারিহা ও শেখ রাইস মিলের মালিক শেখ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘চালের ব্যবসা ধীরে ধীরে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তারা যেভাবে দাম নির্ধারণ করছে, তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়ছে। এতে ছোট ও মাঝারি মিল মালিকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। বাজারে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
মফিক উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম জানান, সরকার কয়েক মাস ধরেই আতপ চাল রপ্তানীর অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। দেশ থেকে এবার বড় পরিসরে আতপ রপ্তানী হচ্ছে। যার কারণেই আতপের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। আর আতপের যোগান কমে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য সরু চালে। মানুষ আতপের চাহিদার অনেকটাই কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল দিয়ে মিটাচ্ছেন। যার কারনেই সরু ও আতপের দাম কিছুটা বেশি।
নওগাঁ চাউলকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘চিনিগুড়া একটি বিশেষায়িত সুগন্ধি চাল। এর উৎপাদন সীমিত হলেও চাহিদা অনেক বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দাম বেড়েছে, তা স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে কারা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া ধান বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমানে হাটগুলোতে প্রতি মন কাটারি ১৮০০ আর আতপ কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৭’শ টাকায়।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ফরহাদ খন্দকার বলেন, মূলত রপ্তানীর কারনেই দাম বেড়েছে কিছুটা। নওগাঁয় অটোমেটিক ও হাসকিং মিলিয়ে সাড়ে ৪’শ রাইস মিল রয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতিনিয়তই মিলগুলোতে নজর রাখছে। অবৈধ মজুদ অনুসন্ধানে মাঠে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
হুমায়ুন কবীর ছিলেন পুলিশের কনস্টেবল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিবহন বিভাগে জলকামান চালাতেন। ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জে নিজ বাড়ির সামনে থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন হুমায়ুন কবীর। আর এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন তারই স্ত্রী। তদন্ত শেষে ১১ জনকে আসামি করে এ বছরের মার্চে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন হত্যা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আওলাদ হুসাইন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, স্ত্রী সালমা বেগমের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক জানাজানি হওয়া এবং হুমায়ুনের কাছ থেকে একজন আত্মীয়ের ধার নেওয়া ১০ লাখ টাকা ফেরত না দেওয়া—এ দুই উদ্দেশ্যে খুন হন এই পুলিশ সদস্য। মাস দুয়েক ধরে চলে পরিকল্পনা। একাধিকবার খুনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে হুমায়ুনকে অচেতন করা হয়। গভীর রাতে হাত-পা বেঁধে রশি দিয়ে তাকে শ্বাসরোধে খুনের পর মরদেহ বাড়ির সামনে ফেলে দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর হাকিম সারাহ ফারজানা হক গত ১ জুলাই অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়েছেন। এখন অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
হুমায়ুনের স্ত্রী সালমা বেগম ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—রাজীব হোসেন, মরিয়ম বেগম (মলি), পলি বেগম, কায়েস হাওলাদার, ফজলে রাব্বি শুভ, রাফি খান, আকাশ, আশিক, সজীব ও সাব্বির।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আর আর্থিক লেনদেন থেকে হুমায়ুনকে খুন করা হয়। ১১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ৪ জন পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে আকাশ, আশিক, সজীব ও সাব্বির শুরু থেকেই পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ১৩ আগস্ট আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।
সালমা, পলি ও রাফি কারাগারে আছেন। রাজীব, মলি, কায়েস ও শুভ জামিনে আছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আওলাদ হুসাইন বলেন, ‘এটি একটি চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আর আর্থিক লেনদেন থেকে হুমায়ুনকে খুন করা হয়। ১১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।’
হুমায়ুন কবীর ও সালমা বেগমের বিয়ে হয়েছিল ২০১০ সালে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, নিকটাত্মীয় হওয়ায় তাদের বাসায় প্রায়ই যাতায়াত করতেন রাজীব হোসেন। প্রায় বছরখানেক আগে রাজীবের সঙ্গে সালমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে গত বছরের ২৫ এপ্রিল দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠক হয়। সালিশে সালমা ওই সম্পর্ক থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দেন।
ওই সালিশের তিন দিন পর ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল সকালে দয়াগঞ্জে নিজের ভাড়া বাসার ফটকের সামনে থেকে হুমায়ুনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন হুমায়ুনের ছোট ভাই খোকন হাওলাদার যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, যাত্রাবাড়ীতে হুমায়ুনের ভাড়া বাসার ভবনের চারতলায় থাকেন মরিয়ম বেগম (মলি)। তিনি সালমা বেগমের আত্মীয়। তার স্বামী বাবুল মুন্সী প্রবাসে থাকেন। তিন-চার বছর আগে হুমায়ুনের কাছে ১০ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন বাবুল। সেই টাকা ফেরত দেননি। সময়মতো টাকা ফেরত না দেওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ হয়।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, হুমায়ুন বেঁচে থাকলে একদিকে সালমা ও রাজীবের সম্পর্কে বাধা থাকত, অন্যদিকে মলির ধারের টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ থাকত। এ কারণে পারস্পরিক যোগসাজশে হুমায়ুনকে চিরতরে সরিয়ে ফেলার ছক কষা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, খুনের ঘটনার মাস দুয়েক আগে থেকে ভাড়াটে খুনি খোঁজা শুরু হয়। মলির মাধ্যমে পলি বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পরে পলির ভাগনে কায়েস হাওলাদারের মাধ্যমে শুভ, আশিক, সজীব, রাফি, আকাশসহ কয়েকজনকে পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়।
একপর্যায়ে খুনের জন্য দা, রশি, গ্লাভসসহ নানা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়। কয়েকবার সুযোগ পেলেও তা সফল হয়নি। পরে হুমায়ুনের প্রতিদিনের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে পরিকল্পনা বদলে ফেলা হয়। ভোরবেলায় বাসার সামনে মানুষ বেশি থাকে। তাই বাইরে নয়, বরং বাসার ভেতরেই খুন করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল সালমা ও পলি স্থানীয় একটি ফার্মেসি থেকে ঘুমের ওষুধ কেনেন। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে হুমায়ুন বাসায় ফিরলে তার খাবারে সেই ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। রাত গভীর হলে মলি, পলি, শুভ ও রাফি ওই বাসায় যান। তখন হুমায়ুন সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন। তার হাত-পা গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে কয়েকজন মিলে দুই পাশ থেকে টান দেন। সালমা তার স্বামীর পা চেপে ধরে রাখেন। হুমায়ুনের মৃত্যু নিশ্চিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, খুনের পর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে হুমায়ুনের মরদেহ কাঁধে করে তিনতলা থেকে ভবনের নিচে নামিয়ে আনা হয়। বাইরে কোথাও নিয়ে সেটি ফেলে দিতে চেয়েছিলেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। কিন্তু হুমায়ুনের বাসার সামনে একটি রিকশার গ্যারেজ তখনো খোলা ছিল। তাই মরদেহ বাইরে নেওয়া সম্ভব হয়নি। মরদেহটি বাসার সামনে গেটের কাছে ফেলে দেওয়া হয়।
এরপর আসামিরা হুমায়ুনের বাসায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যান। তদন্তে বলা হয়েছে, খুনের সঙ্গে সালমা নিজে জড়িত, এটা যাতে কেউ বুঝতে না পারে, সেজন্য এমনটা করা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর শুভ ও রাফিকে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী, বাকি টাকা হুমায়ুনের মৃত্যুর পর পাওয়া পেনশনের টাকা থেকে পরিশোধ করার কথা ছিল।
তবে আসামিদের পরিকল্পনা কাজে আসেনি। পুলিশের সন্দেহ হলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হুমায়ুনকে খুন করার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আওলাদ হুসাইন বলেন, ‘কয়েক দফা পরিকল্পনা বদলে হুমায়ুনকে খুন করা হয়েছিল। খুনের আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ওই বাসাতেই অবস্থান করছিলেন।’
মামলার বাদী খোকন হাওলাদারের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নম্বরটি খোলা পাওয়া যায়নি।
আসামি সালমা বেগমের আইনজীবী কামাল হোসেন জানান, আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। আসামি সালমা কারাগারে আছেন। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন আদালত।
দেশজুড়ে দ্বিমুখী সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে অতি-সংক্রামক ব্যাধি হামের অগোচরে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহতা, অন্যদিকে সময়ের আগেই ডেঙ্গুর অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি—এই দুই রোগে রাজধানীসহ সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হামে শিশুদের প্রাণহানি যেমন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তেমনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দৈনিক ভর্তি ও মৃত্যুর মিছিল থামছেই না।
হাম পরিস্থিতি: দেশে এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৩৫ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৩৯ জন মারা গেছে। আর হামে মারা গেছে ৯৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জানিয়েছে, হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩২২ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১০৮ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৯১, ময়মনসিংহে ৭০, চট্টগ্রামে ৬১, বরিশালে ৪৪, খুলনায় ৩২ ও রংপুর বিভাগে ১১ জন মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত পরিসংখ্যানে মৃতদের বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে। তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়।
সরকারের তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে ৮৭০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেল ১ লাখ ২৭ হাজার ৪১০ জনের। গত একদিনে ল্যাব পরীক্ষায় নতুন করে আরও ১৩৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৮৭৪ জন।
হাসপাতালে ভর্তির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ১৮২ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৩ জন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি: দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬৩ জন রোগী।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন আক্রান্ত ৪৬৩ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৮৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৯ জন, খুলনা বিভাগে ৬২ জন, বরিশাল বিভাগে ৬৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১ জন, রংপুর বিভাগে ২০ জন এবং সিলেট বিভাগে তিন জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে দুইজন এবং খুলনা বিভাগে একজন রয়েছেন।
চলতি বছরের এক জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পর্যন্ত দেশে মোট ১৫ হাজার ১৫৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৩ হাজার ৯৩১ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সর্বমোট ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চ ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সর্বমোট এক হাজার ১৬৯ জন ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই ভর্তি আছেন ৪৩৮ জন রোগী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এবং ডেঙ্গুর জোড়া ধাক্কা সামলাতে অবিলম্বে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সামলাতে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি পরিবার পর্যায় থেকে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। ডাবল সংক্রামক ব্যাধির এই আঘাত প্রতিরোধে সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক পদক্ষেপই পারে বড় বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গু একই সময়ে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। ফলে অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। তার মতে, আতঙ্ক নয়, দ্রুত পরীক্ষা এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, প্রতি বছর ডেঙ্গুর সময় সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত জনবল, বৈজ্ঞানিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী সতর্ক করেছেন, বর্তমানে ডেন-৩ (DENV-3) সেরোটাইপের বিস্তার বাড়ছে। এই ধরনটি রোগীর মধ্যে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোম সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্বরকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এডিস মশা পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, ছাদের কোণা, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা পানির ড্রাম-এসবই এডিসের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। সূর্যোদয়ের পরের দুই ঘণ্টা এবং সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘণ্টা এডিস সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। ফলে ব্যক্তিগত সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াও একই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। যদিও চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুহার তুলনামূলক কম, তবে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গিঁটের ব্যথা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একই মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দুটি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হলেও বাস্তবে সেই সমন্বিত উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই বলে আসছে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর। হামের ক্ষেত্রে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার এবং জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এসব রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালুর লক্ষ্যে প্রায় দেড় হাজার বৈদ্যুতিক বাস কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান। তবে আগামী ডিসেম্বর থেকেই দেশে ইলেকট্রিক বাস আসা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে মোট ২০০টি বাস সরবরাহ করা হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৪৫ আসনের ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস, চার্জিং স্টেশন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ৪০০ কোটি টাকা এবং নারীদের জন্য ২৮ থেকে ৩২ আসনের ১০০টি বৈদ্যুতিক মিনিবাস, চার্জিং স্টেশন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে ৪০০ কোটি টাকার দুটি পৃথক প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়। পরে অর্থ বিভাগ অনুদানের পরিবর্তে ৮০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিতে সম্মতি দেয়।
এ বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা (অতিরিক্ত সচিব) সম্প্রতি বলেছেন, মোট ২০০ বৈদ্যুতিক বাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ এ প্রকল্পে ঋণ সহায়তার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। বাসগুলো পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে এখনো কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করেই এসব বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। রুট, চার্জিং স্টেশনের অবস্থান এবং পরিচালনাসংক্রান্ত অন্য বিষয় নির্ধারণে একটি কমিটি কাজ করছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বায়ুদূষণ রোধে বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টের (বিসিএপি) প্রথম ধাপের আওতায় ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস কেনা হবে। বর্তমানে এ প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের কাজ করছে ডিটিসিএ।
নারীবান্ধব গণপরিবহন চালুর অংশ হিসেবে বিআরটিসি ১০০টি বৈদ্যুতিক মিনিবাস কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রকল্পে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) অর্থায়নে ৩০০টি বৈদ্যুতিক এসি বাস এবং ২৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে এ নিয়ে প্রাথমিক কাজ চলছে। চীনা অর্থায়নে আরও ৫০০টি বৈদ্যুতিক এসি বাস এবং ২৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১১ জুন পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় এ প্রকল্পের ব্যয় পুনর্বিবেচনা করে সংশোধিত প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে।
সরকারি অর্থায়নে একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় আরও ১২টি বৈদ্যুতিক বাস কেনা, চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিসি।
সব মিলিয়ে ডিটিসিএ ও বিআরটিসির বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৪১২টি বৈদ্যুতিক বাস সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং নগরাঞ্চলে যানবাহনের কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
তবে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যমান গণপরিবহনব্যবস্থার যৌক্তিকীকরণ ছাড়া এতগুলো নতুন বৈদ্যুতিক বাস চালু করলে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। বাসগুলো কবে নাগাদ আসবে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, অনুমোদিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বাসগুলো আনা হবে। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রথম দফায় বৈদ্যুতিক বাস আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে ঢাকায় এসব বাস চালু করা হবে।
বেসরকারি খাতের তৎপরতা: সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সভা হয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারকে সহজ শর্তে ঋণ, নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দিয়ে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু বিআরটিসির মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে বাস চালানোর পরিবর্তে শুরু থেকেই সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমান অংশীদার করা উচিত। কারণ, দীর্ঘ মেয়াদে যাত্রীসেবা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুরো ব্যবস্থাকে টেকসইভাবে পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি অপারেটরদেরও নিতে হবে।
পরিবহন খাত থেকে বায়ুদূষণ কমাতে সড়ক পরিবহনের অন্তত ৩০ শতাংশ যানবাহন বিদ্যুৎ-চালিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগে ইলেকট্রিক গাড়ির আমদানি শুল্ক কমানোসহ এ খাতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হবে।
বিভিন্ন দেশের কোম্পানির আগ্রহ: ইতোমধ্যে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকংসহ বিভিন্ন দেশের বৈদ্যুতিক বাস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে তাদের প্রস্তাব ও প্রযুক্তিগত উপস্থাপনা দিয়েছে। তবে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাস কেনা হবে, সে বিষয়ে এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ইলেকট্রিক বাসের সম্ভাব্য দাম দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। ব্যাটারির সক্ষমতাসহ বাসের বিভিন্ন কারিগরি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে দাম কমবেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, বৈদ্যুতিক বাস চালুর আগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ও বাস রুট রেশনালাইজেশনে। এসব ঠিক না করে শুধু বাস কিনলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের জন্যও একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। চার্জিং অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, ওয়ার্কশপ ও দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে সেবা দিতে হলে পুরো ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করতে হবে। না হলে এসব দামি বাস পরে অচল হয়ে পড়ে থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহার করতেন বিদেশি সিম ও মুঠোফোনের বিশেষ অ্যাপ। পাওয়া গেছে ভারতীয় আধার কার্ডও। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
গত বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ইমনকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইমন পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় আলোচিত যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করে। ২২ জুলাই মাসুদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামি রাউজানের ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াসকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে আমরা অনেক তথ্য পাই। তাদের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে পারি।’ তিনি বলেন, সম্প্রতি ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের মালিককে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও ইলিয়াসের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পায় পুলিশ। আর এসব তথ্যই ‘সন্ত্রাসী’ ইমনকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে সহায়তা করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান করেন। সিম ব্যবহার করেন না। বিদেশি নম্বর, অ্যাপসের মাধ্যমে কথা বলেন। ডেভিড ইমনও সেটা করতেন। তিনি যখন দেখলেন তার ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে, তখন তিনি বিদেশে থাকা গ্যাং লিডার সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাজ্জাদের পরামর্শে ইমন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বলে আমরা জানতে পারি। ইমন ভারতের আধার কার্ডও করিয়েছেন। সেখানে তার নাম আজহার খান।’
অবস্থান জানতে পেরে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার সময় দাউদকান্দি এলাকায় ইমনকে আটক করার চেষ্টা করে পুলিশ, তবে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘আমরা তখন সফল হতে পারিনি। এরপর ঢাকায় তারা গাড়ি বদল করেন, এমনকি তাদের গাড়িচালক পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আসে ইমন খুলনার দিকে যাবেন। আমরা পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় চেকপোস্ট স্থাপন করি। মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সহায়তা করে। কিন্তু আমাদের ব্যাড লাক, আমরা ওই সময়ও তাকে ধরতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি যে তিনি খুলনায় যাবেন। খুলনা জেলা পুলিশের সহায়তায় রূপসার দিকেও আমরা একটা চেকপোস্টের ব্যবস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু তারা বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। হঠাৎ গোপালগঞ্জ থেকে নড়াইলের দিকে চলে যান। তখন রাত প্রায় সাড়ে তিনটার মতো বাজে। পরে নড়াইল থেকেও চলে যান তারা। শেষে ভোর পাঁচটার দিকে যশোর পুলিশের সহায়তায় ঝুমঝুমপুর এলাকায় আমরা ডেভিড ইমন ও তার আরও তিনজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।’
ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি প্রচার হয়ে যাওয়ায় অপারেশনের পরবর্তী কার্যক্রমগুলো কঠিন হয়ে গিয়েছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি বলেও জানান তিনি।
মাসুদ জানান, যখন ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার অভিযান চলছিল, ঠিক একই সময়ে চট্টগ্রামের আরেক কুখ্যাত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরেকটি টিম নোয়াখালীতে অবস্থান করছিল। টিভি স্ক্রলে যখন আসে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার’, তখন আমাদের ওই টিম দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে তিনি পালিয়ে যান।’
এসপি মাসুদ আলম আরও জানান, ‘ডেভিড ইমনের ঝিকরগাছা হয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। কে সীমান্ত পার করবেন এবং ভারতে কে রিসিভ করবেন, সব ঠিক করা ছিল। এমনকি তার কাছে আধার কার্ড পাওয়া গেছে, যেটা ভারতে ব্যবহার করার কথা ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ইমনের বিরুদ্ধে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। তাকে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আরও তথ্য জানানো হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে এসপি বলেন, এখন পর্যন্ত ডেভিড ইমন ও তাঁর সহযোগীদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক গডফাদারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। গত ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কিছুটা কম থাকার সুযোগে তারা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করেছেন। চট্টগ্রামে অপরাধ করে কেউ পার পাবেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার শেখ মো. সেলিম, সিরাজুল ইসলাম, জুনায়েদ কাওসার, মো. রাসেল ও কাজী মো. তারেক আজিজ প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করে এ কর্মসূচিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ সেলের সভাপতি নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘নারী, তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষার্থী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এতে সম্পৃক্ত করা জরুরি। স্থানীয় মাটি, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য বিবেচনা করে সঠিক স্থানে উপযুক্ত দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণের পাশাপাশি চারার বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সভায় তিনি এ কথা বলেন। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত সেলের এটি ৪র্থ সভা।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘২০২৬ সালে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার মাধ্যমে মোট ৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩০টি চারা রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্বভাবে উৎপাদিত চারা এবং নিজস্ব অর্থায়নে সংগৃহীত চারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৩ শতাংশ চারা রোপণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে থাকা মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে বর্ষা মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে।’
সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, “সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি সফল করতে শুধু চারা রোপণ নয়, রোপণ-পরবর্তী নিয়মিত পরিচর্যা, সুরক্ষা এবং কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি বলেন, “সরকারি ও বেসরকারি নার্সারির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। ‘রাইট ট্রি, রাইট প্লেস’ নীতি অনুসরণ করে দেশীয় প্রজাতিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা জরুরি।” অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গাছ নারিকেল, তাল, খেজুর, সুপারি ইত্যাদি রোপণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে জোর দেন তিনি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হলে জানুয়ারি মাসের মধ্যে এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে।’
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, ‘বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে নারী, তরুণ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সাড়ে তিন লাখের বেশি সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সারা দেশে নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’
সভায় প্রতিটি রোপিত গাছের জিপিএস ভিত্তিক অবস্থান, প্রজাতি, রোপণের তারিখ, জিও-ট্যাগযুক্ত ছবি ও পরিচর্যার তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের জন্য ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ তৈরির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
অ্যাপটির মাধ্যমে গাছের বেঁচে থাকার হার, প্রতিস্থাপনমূলক বৃক্ষরোপণ, জেলা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অগ্রগতি এবং রিয়েল-টাইম প্রতিবেদন জাতীয় ড্যাশবোর্ডে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) শামিমা বেগম, বৃক্ষরোপণ সেলের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৈশ্বিক কর্মবাজারে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে দেশের ২৫টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ল্যাংগুয়েজ সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এসব কেন্দ্রে জাপানিজ, কোরিয়ান, চাইনিজ, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মানসহ মোট আটটি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখানো হবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এ তথ্য জানান।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বর্তমান সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষাক্রমে তৃতীয় ভাষা অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা নিয়েছে। এর ফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দক্ষ বিদেশি ভাষা শিক্ষকের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ল্যাংগুয়েজ সেন্টারগুলো এ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিকভাবে চাহিদাসম্পন্ন ভাষায় দক্ষ করে তুলবে এবং দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।’
তিনি বলেন, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এ যুগে বহুভাষিক দক্ষতা আর অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়, বরং অপরিহার্য সক্ষমতা। ভাষাশিক্ষা বাংলাদেশের তরুণদের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, কূটনীতি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রবেশের পথ আরও সুগম করবে।’
অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানান, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর ও আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ইউজিসি পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক ‘এডুকেশন হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকদের জন্য বাংলাদেশ একটি পছন্দের গন্তব্যে পরিণত হয়।
তিনি আরও জানান, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি, ভিসা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা সহজ করতে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির সমন্বয়ে একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক’ গঠন করা হবে। একই সঙ্গে দেশের পাঁচটি সরকারি ও পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে মডেল এডুকেশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, মেডিকেল সেন্টার, শিক্ষার্থী সহায়তা, কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার সাপোর্ট এবং বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবার সম্প্রসারণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া। সভাপতিত্ব করেন ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন সহযোগী ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ।