হারানো, চুরি ও ছিনতাইকৃত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৫১টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ।
আজ বৃহস্পতিবার উপ-পুলিশ কমিশনারের (তেজগাঁও বিভাগ) কার্যালয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজানের উপস্থিতিতে উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোন প্রকৃত মালিকদের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, হারিয়ে যাওয়া, চুরি ও ছিনতাই হওয়ার ঘটনায় মোবাইল ফোন মালিকরা বিভিন্ন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় গত একমাসে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ ৬৩টি, হাতিরঝিল থানা পুলিশ ৫৪টি, মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ ৪০টি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ ৩২টি, আদাবর থানা পুলিশ ৩২টি ও তেজগাঁও থানা পুলিশ ৩০টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে।
মরুভূমির তপ্ত বালু আর তীব্র রোদে যে খেজুরের ফলন হয়, সেই সুস্বাদু ও দামি বিদেশি খেজুর এখন ফলছে বাংলাদেশের মাটিতে। একসময় যে উন্নত জাতের খেজুর পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তা সফলভাবে চাষ করে পাবনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা সাইফুদ্দিন হিরুক। তার এই ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদ্যোগ ইতোমধ্যে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সরেজমিনে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে থোকা থোকা খেজুর। বিস্তীর্ণ মাঠে যেন এক টুকরো মধ্যপ্রাচ্যের আবহ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালে গয়েশপুর এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে কয়েকটি উন্নত জাতের খেজুরের চারা সংগ্রহ করে যাত্রা শুরু করেন সাইফুল ইসলাম হিরুক। প্রথমে মাত্র ৩৩ শতাংশ জমিতে চারটি চারা রোপণ করেন তিনি। শুরুতে এই উদ্যোগে অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন।
অনেকেই বলেছিলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর ফলানো অসম্ভব। কিন্তু হিরুক থেমে যাননি। নিয়মিত পরিচর্যা, ধৈর্য ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে প্রায় ৬০টি গাছের এক সমৃদ্ধ খেজুর বাগানে। হিরুকের এই বাগানে ঠাঁই পেয়েছে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ১০ থেকে ১২টি উন্নত জাতের খেজুর।
এর মধ্যে রয়েছে— আজওয়া, মরিয়ম, মেজুল, ছুক্কারি, ওয়ারহিছ, বড়ই খেজুরসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় জাত। উদ্যোক্তা জানান, প্রতিটি জাতের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অনেক গাছ থেকে উন্নতমানের ‘সাকার’ বা চারা উৎপন্ন হচ্ছে, যা দিয়ে নতুন করে বাগান সম্প্রসারণ করা সম্ভব। বাগানে খেজুরের বাম্পার ফলন দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন কৃষক, শিক্ষার্থী, বেকার যুবক ও সাধারণ মানুষ। কেউ আসছেন শখের বসে ছবি তুলতে, আবার কেউ আসছেন হিরুকের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে নতুন বাগান গড়ার স্বপ্ন বুক বেঁধে। পুষ্পপাড়া এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘লোকমুখে শোনে বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই নিজের চোখে দেখতে এসেছি। এসে তো আমি অভিভূত! আমরা জানতাম খেজুর শুধু সৌদি আরবেই হয়। এখন দেখছি আমাদের পাশেই হচ্ছে। আমার নিজেরও এখন একটা বাগান করার শখ জাগছে।’
একদন্ত এলাকার স্থানীয় যুবক রুহুল আমিন বলেন, ‘মরুভূমির খেজুর যে আমাদের দেশের মাটিতেও এত সুন্দরভাবে জন্মাতে পারে, হিরু ভাই তা প্রমাণ করে দিয়েছেন। এলাকার যুবকদের জন্য এটি একটি বড় অনুপ্রেরণা।’
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে সফল চাষি সাইফুদ্দিন হিরুক বলেন, ‘শখের বশে যখন শুরু করি, তখন অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলেন। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আজ যখন গাছে ফল এসেছে, তখন মনের ভেতর অন্যরকম এক আনন্দ কাজ করছে। সরকারি সহযোগিতা ও ঋণ সুবিধা পেলে এই বাগানকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমার।’
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সঠিক পরাগায়ন এবং আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহার করলে বাংলাদেশের মাটিতেও উন্নত জাতের বাণিজ্যিক খেজুর চাষ বিপুল সম্ভাবনাময়।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হিরুক যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, তার এই সাফল্য দেখে জেলার আরও অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এই অর্থকরী ফসল চাষে এগিয়ে আসবেন।’
জুলাই শহীদ দিবস ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে এক প্রস্তুতি সভা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল কাদের, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহ শিবলী সাদিক, জেলা পরিষদের প্রশাসক আলি আহমদ, জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার শামীম কবির, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা, জেলা তথ্য অফিসার পাভেল দাস, জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল আউয়াল, মাগুরা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক সাইদুর রহমান ও পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুদ হাসান খান কিজিল প্রমুখ। তা ছাড়া সভায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, সাংবাদিক ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, আগামী পাঁচ আগস্ট জুলাই শহীদ দিবস ও আগামী ১৬ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস যথাযথভাবে মাগুরায় পালিত হবে। এ উপলক্ষে ওই দিন জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, সংবর্ধনা ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মোনাজাত ও প্রার্থনা হবে।
দিবসটি পালনের জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করা হয়। বক্তারা আরও বলেন, জুলাই শহীদ আন্দোলন আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে। এ আন্দোলনে মা হারিয়েছে তার সন্তান, পিতা হারিয়েছে তার সন্তান এবং দেশ হারিয়েছে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীদের। ৫ আগস্টের স্মৃতি দেশ ও জাতি কোনোদিন ভুলবে না।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার অন্যতম প্রধান সমস্যা ‘বিল ডাকাতিয়া’র ভয়াবহ জলাবদ্ধতা নিরসনে অবশেষে খুলে দেওয়া হয়েছে শৈলমারী স্লুইসগেট (সুইচগেট)। গত রোববার (১২ জুলাই) ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার উপস্থিত থেকে এই স্লুইসগেটটি উন্মুক্ত করেন।
এর ফলে বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত পানি নিষ্কাশনের পথ সুগম হলো, যা স্থানীয় লাখো মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রশাসনের তৎপরতা, স্লুইসগেটটি খুলে দেওয়ার সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার বলেন, বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ। স্থানীয় জনগণের কষ্ট লাঘব এবং কৃষি ও মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
শাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পানি নিষ্কাশন প্রক্রিয়া যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে।
উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের সময় ঘটনাস্থলে আরও উপস্থিত ছিলেন:পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বকুমার সেন, খুলনা পানি উন্নয়ন বিভাগ-১: আব্দুর রহমান তাযকিয়া, প্রকৌশলী, যিনি কারিগরি ও জলকপাট ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তদারকি করেন।
রুদাঘরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিএম আমানুল্লাহ, স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুর রব আকুঞ্জি, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ কৃষক সমাজ।
খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার একটি বিশাল অংশজুড়ে বিল ডাকাতিয়া বিস্তৃত। বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত পলি ভরাট এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই এই বিলে কৃত্রিম বন্যা বা স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে হাজার হাজার একর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং শত শত মৎস্য ঘের ভেসে যায়, যার ফলে স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শৈলমারী স্লুইসগেটটি খুলে দেওয়ার ফলে বিলে আটকে থাকা অতিরিক্ত পানি পশুর বা শিবসা নদীতে নেমে যাওয়ার সুযোগ পাবে। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সাময়িক গেট খোলার পাশাপাশি শৈলমারী নদী ও খালের পলি অপসারণ (ড্রেজিং) করা না হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সভ্যতার অগ্রযাত্রায় বই কেবল জ্ঞানের আধারই নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের নির্ভরযোগ্য বাহক। একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়, মননকে বিকশিত করে এবং মানুষকে আলোকিত জীবনের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়, লাইব্রেরি হচ্ছে এক ধরনের মনের হাসপাতাল। অর্থাৎ, মানসিক সুস্থতা, আত্মিক বিকাশ ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম আশ্রয়স্থল একটি গ্রন্থাগার।
এই দর্শনকে সামনে রেখে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বইপাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করতে নওগাঁ জেলা পুলিশ নিয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এরই অংশ হিসেবে জেলা পুলিশ লাইন্সের লাইব্রেরি ‘বাতিঘর’কে আরও আধুনিক ও পাঠকবান্ধব করে গড়ে তোলা হয়েছে। বইপাঠের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থাও সংযোজন করা হয়েছে, যাতে দায়িত্ব পালনের ফাঁকে পুলিশ সদস্যরা স্বাচ্ছন্দ্যে বই পড়তে পারেন।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, যুগে যুগে লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার মানুষের মেধা, মনন, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করার অন্যতম বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। মানুষের মানসিক সুস্থতা ও আত্মিক বিকাশে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, পুলিশিং অত্যন্ত ব্যস্ত ও চ্যালেঞ্জিং পেশা। তারপরও আমি আমার সহকর্মীদের সবসময় বলি, সুযোগ পেলেই বই পড়ুন। অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে বইয়ের সঙ্গে সময় কাটান। একটি ভালো বই শুধু জ্ঞানই বাড়ায় না, এটি একজন মানুষকে আরও বিচক্ষণ, মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তোলে। একজন দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ সদস্য গড়ে তুলতেও বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের নতুন ইউনিফর্মে দায়িত্ব পালনের প্রথম দিনেই পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জেলা পুলিশ লাইন্সের লাইব্রেরি ‘বাতিঘর’ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি লাইব্রেরির সার্বিক পরিবেশ ঘুরে দেখেন, বইয়ের সংগ্রহ সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত বইপাঠে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যেমন প্রয়োজন, তেমনি বইপাঠের অভ্যাসও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বই মানুষকে গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায় এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে মরিচের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে বাজারে মরিচের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। বর্তমানে উপজেলার পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় মরিচ বিক্রি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। তবে খুচরা বাজারে দাম ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় পৌঁছানোয় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভোক্তারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৫৯৫ হেক্টর। কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৫৫ হেক্টর বেশি জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মরিচ রোপণের পর দীর্ঘদিন বৃষ্টির দেখা না মেলায় এবং তীব্র তাপদাহের কারণে অনেক গাছ শুকিয়ে যায়। অনেক জমিতে গাছে মরিচও কম ধরে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পোকার আক্রমণে ফলন ব্যাহত হয়। তবে গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে গাছগুলো আবার সতেজ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সামনে ভালো ফলনের আশা করছেন তারা।
উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল জাব্বার ও সোহেল বলেন ‘বর্তমানে বাজারে মরিচের দাম ভালো। তবে গাছে মরিচ তুলনামূলক কম ধরেছে। দাম যদি ১০০ টাকার ওপরে স্থিতিশীল থাকে, তাহলে আমরা ভালো লাভ করতে পারব।
আরেক কৃষক আকবর হোসেন বলেন, মরিচ লাগানোর পর দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির কারণে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছিল। এখন কয়েক দিনের বৃষ্টিতে গাছগুলো আবার সতেজ হয়েছে। সামনে ফলন আরও বাড়বে বলে আশা করছি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেলে উপজেলার অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কাঁচাবাজার তারাগুনিয়ায় কেজিপ্রতি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় মরিচ বিক্রি হয়েছে। তবে একই দিন সকালে সেখানে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বেচাকেনা হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। একদিনের কয়েক ঘন্টার মধ্যে ১৫ থেকে ২০ টাকা দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে উপজেলার হোসেনাবাদ কাঁচাবাজারে খুচরা পর্যায়ে মরিচ ১০৫ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। বাজারের ক্রেতা আকিজ হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে বাজারে মরিচের দাম বেড়েছে। তবে ১০০ টাকার নিচে হলে আমাদের জন্য ভালো হতো। এর আগে আমরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে মরিচ কিনেছি।’
উপজেলা কৃষি অফিস ও স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরিসহ এক বিঘা জমিতে মরিচ চাষে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারে বর্তমান দাম বজায় থাকলে উৎপাদন খরচের প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভিন বলেন, ‘কৃষকদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পোকার আক্রমণ ও রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে দৌলতপুরে মরিচের ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।’
বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে মরিচ চাষে ভালো লাভের মুখ দেখবেন বলে আশা করছেন দৌলতপুরের কৃষকরা। তবে ভোক্তাদের প্রত্যাশা, উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে মরিচের দামও স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে।
টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ তুলে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবি করেছেন পরীক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বেলা সোয়া ১২টার দিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনের ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে নগরীর বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা।
অবরোধের ফলে সড়কের দুইধারে অসংখ্য যানবাহন আটকা পরে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পরতে হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখার সময় দুপুর দুইটার দিকেও অবরোধ চলছে।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একজন হাতেম আলী কলেজ শিক্ষার্থী আলিফ হোসেন বলেন, বৈরী পরিবেশের মধ্যেও সোমবার পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়া কঠিন পরীক্ষার আগেও পর্যাপ্ত বন্ধ দেওয়া হয়নি। উল্টো অতীতের চেয়ে এবার প্রশ্নপত্র কঠিন হয়েছে। এমনকি সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে।
এছাড়াও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেকস্থানেই পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই। অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়ার পরেও এক বোর্ডে পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও সব বোর্ডে তা স্থগিত করা হয়নি।
আলিফ আরো বলেন-সমস্যাগুলো সমাধান না করেই শিক্ষামন্ত্রী আমাদের কটুক্তি করেছেন তাই আমরা আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি। পাশাপাশি এই পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন দাবি করছি।
ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তাপ চলছে পুরোদমে। তার অংশ হতে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা বেলকুচি উপজেলার বড়ধুল চরে একটি বিশাল গাছ। দূর থেকে তাকালেই মনে হবে, সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার বিশাল এক পতাকা। প্রিয় দলের প্রতি এমন ব্যতিক্রমী ভালোবাসা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের আজুগরা ও জামতৈল ইউনিয়নের মাঝামাঝি স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটিকে ঘিরেই এই ব্যতিক্রমী আয়োজন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় প্রথম আকাশি-সাদা রঙে সাজানো হয়েছিল গাছটি। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে আবারও নতুন করে রঙ করা হয়েছে সেটি।
এই আয়োজনের পেছনে নেই কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের একক অর্থায়ন। স্থানীয় প্রবীণ, তরুণ ও কিশোররা যার যতটুকু সামর্থ্য, ঠিক ততটুকু অর্থ দিয়েছেন। কেউ ৫ টাকা, কেউ ১০ টাকা, কেউ ৫০ বা ১০০ টাকা করে সহযোগিতা করেছেন। সবার ছোট ছোট অবদান মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে গাছটিকে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে রাঙানো হয়েছে।
শুধু একটি গাছ নয়, এলাকার পরিবেশও যেন ফুটবলের রঙে রঙিন। বিভিন্ন সড়কে উড়ছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা। এক রিকশাচালক নিজের জীবিকার বাহনটিকেও সাজিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে। বিশ্বকাপ এলেই এলাকায় বসে খেলা দেখার আয়োজন, আড্ডা ও নৈশভোজে মেতে ওঠেন সব দলের সমর্থকরা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে শুধু মাঠের খেলায়, বাস্তবে নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ফুটবল আমাদের আনন্দের উৎসব। আমরা যে যার পছন্দের দলকে সমর্থন করি, কিন্তু সম্পর্কের জায়গায় কোনো বিভেদ নেই। বিশ্বকাপ এলে পুরো এলাকা উৎসবের গ্রামে পরিণত হয়।
আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা মো. রাসেল হোসেন বলেন, আর্জেন্টিনা আমাদের আবেগের নাম। সেই ভালোবাসা প্রকাশ করতেই ২০২২ সালে প্রথম গাছটিকে রঙ করি। এবার বিশ্বকাপে আবারও নতুন করে সাজানো হয়েছে। এই আয়োজন কারও একার নয়, এলাকার সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ ও শ্রম দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমরা চাই, এই গাছ ফুটবলপ্রেম আর সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে থাকুক।
আর্জেন্টিনা পতাকার আদলে নিজের রিকশা সাজানো চালক বলেন, রিকশাই আমার জীবিকা। কিন্তু আর্জেন্টিনা আমার ভালোবাসা। তাই নিজের রিকশাটাকেও প্রিয় দলের রঙে সাজিয়েছি। যাত্রীরাও রিকশা দেখে ছবি তোলেন, ভালো লাগে। বিশ্বকাপ এলেই অন্যরকম আনন্দ কাজ করে।
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের আর্জেন্টিনা হয়তো কখনো জানবে না বেলকুচির এই গাছটির গল্প। তবে আকাশি-সাদা রঙে মোড়া এই গাছটি প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের ভালোবাসা, আবেগ আর সম্প্রীতির এক অনন্য ভাষা।
চীনের ইয়াংঝৌ শহরে অনুষ্ঠিত চায়না মেরিটাইম ফোরাম-২০২৬ এবং ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন শিপ টেকনোলজি অ্যান্ড সেফটি-২০২৬-এ অংশ নিয়ে বৈশ্বিক মানের সামুদ্রিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বাংলাদেশের অগ্রগতি, সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেছে চার সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।
প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ. বি. এম. শামীম। সম্মেলনে উপস্থাপিত তার মূল প্রবন্ধে তিনি স্মার্ট, গ্রিন ও ইন্টেলিজেন্ট শিপিং ব্যবস্থার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নাবিক ও সামুদ্রিক পেশাজীবী তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশে শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কন্ট্রোলার অব মেরিটাইম এডুকেশন ক্যাপ্টেন সাঈদ আহমেদ উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষ নাবিক তৈরিতে যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফোরামে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সামুদ্রিক শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং কর্মসংস্থান সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সমুদ্রবিষয়ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক পরিসরে আরও পরিচিত করবে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পে বাংলাদেশের দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক সামুদ্রিক খাতে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় দুটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে এক যাত্রী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজী এলাকায় রাহাত ফিলিং স্টেশনের সামনে চট্টগ্রামগামী লেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ময়নামতি হাইওয়ে ক্রসিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মমিন।
পুলিশ জানায়, ফেনী থেকে কুমিল্লাগামী মদিনা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস সুয়াগাজী এলাকায় পৌঁছালে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সিডিএম পরিবহনের একটি বাসকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এতে মদিনা পরিবহনের বাসটির সামনের অংশ এবং সিডিএম পরিবহনের বাসটির পেছনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
দুর্ঘটনায় সিডিএম পরিবহনের যাত্রী ইমরান গাজী (২৮) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তিনি চাঁদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা এবং ফজলুল হক গাজীর ছেলে।
এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ওসি আবদুল মমিন জানান, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বাস জব্দ করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পাহাড়ি ঢল আর অবিরাম বর্ষণের করাল গ্রাসে দেশের বন্যা পরিস্থিতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। একদিকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও পার্বত্য জেলাগুলোর প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে, অন্যদিকে উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের আকাশে ঘনীভূত হচ্ছে নতুন দুর্যোগের মেঘ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সব শেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৭ জেলার ৫৯টি উপজেলা এখন সম্পূর্ণ বন্যাপ্লাবিত। বন্যার পানিতে বন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার। আর সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার।
এদিকে, ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে অতিভারি বর্ষণের কারণে দেশের অন্তত ১১টি জেলায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি এবং বিদ্যমান পরিস্থিতির চরম অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
১১ জেলার স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল: এদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় গৃহীত স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম সম্পর্কে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান মন্ত্রী।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এখন পর্যন্ত ৯৫ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সাপের কামড় থেকে সুরক্ষার জন্য সব জায়গায় অ্যান্টিভেনম পৌঁছানো হচ্ছে। বন্যাকবলিত অঞ্চলে এখনো কলেরা আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, টানা ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, ত্রাণ বিতরণ, জরুরি চিকিৎসাসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিজিবি: দেশের ১১টি বন্যাদুর্গত জেলায় জরুরি উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ বিতরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কাজ করছে। টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় তারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, দুর্গম অঞ্চলে আকাশপথে বিমান বাহিনীর মাধ্যমেও ত্রাণসামগ্রী ও শুকনো খাবার পৌঁছানো হচ্ছে।
বাড়তে পারে নদ-নদীর পানি: দেশে বর্তমানে ৫টি স্টেশনে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব বা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের বার্তায় বলা হয়, দেশে বর্তমানে ৫টি স্টেশনে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হলো—বান্দরবানে সাঙ্গু নদী (বান্দরবান ও দোহাজারী স্টেশন), সুনামগঞ্জের মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোণার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদী।
এ অবস্থায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব বা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে। এসব অঞ্চলগুলো হলো-দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলা। উত্তরাঞ্চলীয় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা।
সতর্কবার্তায় আরও জানানো হয়, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু ও খোয়াই নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় চলমান এই বন্যায় এ পর্যন্ত ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পাহাড়ধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। এর মধ্যে কেবল পর্যটন নগরী কক্সবাজারেই পাহাড়ধস ও বন্যার তোড়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ জনে।
কক্সবাজারে নামছে পানি, কাটছে না দুর্ভোগ: টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত কক্সবাজারের রামু। পাঁচ দিন পর কমতে শুরু করেছে পানি। তবে ঘরে কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া রান্নার চুলা, জ্বালানির সংকট, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি হাজারো পরিবার। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত তারা কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি।
রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের জামছড়ি এলাকার বন্যাকবলিত বাসিন্দা হামিদুল হাসান বলেন, ‘চার দিন ঘরে রান্না করতে পারিনি। শুকনো খাবার খেয়ে কোনোমতে দিন কেটেছে। এখন পানি নামলেও ঘরে কাদা, চুলা নষ্ট, জ্বালানি নেই। তাই রান্নাও করতে পারছি না। এখনো কোনো ত্রাণ পাইনি।’
হামিদুল হাসানের মতো একই ধরনের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন কচ্ছপিয়ার দোছড়ি এলাকার সিরাজুল হক, চাকমারকাঠার মকসুদ, মিঠাছড়ির করিম সিকদার ও রশিদ আহমদ। তাদের ভাষ্য, কয়েক দিন পানিবন্দি থাকার পর পানি নেমে গেলেও ঘরবাড়ি এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি। ঘরে কাদা জমে আছে, অধিকাংশ খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে, রান্নার চুলা অকেজো। বিশুদ্ধ পানির সংকটও তীব্র। অথচ এখন পর্যন্ত তারা কোনো ত্রাণ সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু ত্রাণ বিতরণ হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক দুর্গত পরিবার এখনো কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি। ব্যক্তি উদ্যোগে এবং কয়েকটি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সীমিত পরিসরে ত্রাণ বিতরণ করলেও বাস্তব চাহিদার তুলনায় তা খুবই সামান্য।
রামুর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নগুলোর মধ্যে রয়েছে কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, কাউয়ারখোপ, রাজারকুল, ফতেখাঁরকুল, জোয়ারিয়ানালা ও ঈদগড়। এসব এলাকার অনেক বসতবাড়ি এখনো আংশিক পানির নিচে। কোথাও নদীভাঙনে ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে, আবার কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও ভাঙনের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত থাকায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।
দুর্গত বাসিন্দাদের দাবি, প্রতীকী ত্রাণ বিতরণের পরিবর্তে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে ইউনিয়নভিত্তিক পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, রান্নার জ্বালানি এবং পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় চলমান সংকট আরও গভীর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
এদিকে টানা বর্ষণের কারণে নদনদীর পানি এখনো উচ্চ অবস্থানে থাকায় নতুন করে নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হবে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিল্লুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে পর্যায়ক্রমে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত। দুর্গম এলাকাগুলোতেও দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন মহাবিপদ: নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার ওপরেভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল এবং দেশের ভেতরের বৃষ্টির কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার: সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদী, সুনামগঞ্জের মারকুলিতে এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঢলের তোড়ে সুনামগঞ্জের শক্তিয়ারখলা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আগামী ২ দিন এসব নদীর পানি আরও বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
হবিগঞ্জের ভয়াবহ চিত্র: খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির ক্ষত এখনো শুকায়নি। চার ইউনিয়নের অন্তত ২৫টি গ্রাম এখনো পানির নিচে প্লাবিত হয়ে আছে। প্রায় ৩০ হাজার পানিবন্দি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকটে ভুগছেন। প্রাথমিক হিসাবে, কেবল মৎস্য খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকা।
মৌলভীবাজারের ধীরগতি: মৌলভীবাজারে নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে নামলেও রাজনগর উপজেলার অন্তত ৮ থেকে ১০টি গ্রামে এখনও পানি জমে আছে। পানি অত্যন্ত ধীরগতিতে নামার কারণে গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাঘাট এবং বসতবাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি: এই দুই পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনও সম্পূর্ণ কাটেনি। স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ও দুধকুমারের হুংকার: ৫ জেলায় লাল সতর্কতাউত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের নদ-নদীগুলোর রূপও রুদ্র হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি সমতল দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঝুঁকিতে থাকা জেলাসমূহ: আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে যাচ্ছে।
হুমকির মুখে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম: এছাড়া কুড়িগ্রাম জেলায় ধরলা নদী এবং গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদীর পানি বর্তমানে সতর্কসীমায় অবস্থান করছে। যেকোনো মুহূর্তে নদীসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার চরম শঙ্কা রয়েছে।
নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ: নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদী এবং উপদাখালি নদীর পানি বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সাথে যাদুকাটা, ভুগাই ও কংস নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের সারিগোয়াইন ও ভুগাই-কংস নদীসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলো নতুন করে প্লাবিত হওয়ার মুখে পড়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকরা আমনের বীজতলা প্রস্তুত করতে পারছেন না, যা দীর্ঘমেয়াদি কৃষি সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব ও পার্বত্য অঞ্চল: পানি নামলেও কাটেনি ক্ষত, ঘরে ফিরছে মানুষদক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি হ্রাস পেতে শুরু করেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় এসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পানি নামার সাথে সাথে ভেসে উঠছে ধ্বংসের বড় বড় চিহ্ন।
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। করিমগঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন নৌপথে কয়েক দিনের ব্যবধানে লাশবাহী নৌকা, গরু ব্যবসায়ী, হাঁস ব্যবসায়ী ও পর্যটকবাহী ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর প্রশাসন নৌপথে টহল জোরদার করেছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা পুলিশ। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছেন জনপ্রতিনিধিরা।
কয়েকদিনের ব্যবধানে একের পর এক ডাকাতি।
গত ৭ জুলাই রাতে করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া হাওরের নোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ বহনকারী নৌকায় হামলা চালায় মুখোশধারী ডাকাতরা। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, সোলার ব্যাটারি ও নগদ টাকা লুট করে নেয়। মানবিক এই ঘটনাটি জেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এর পরদিন, সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সামনের হাওরে তিন গরু ব্যবসায়ীর নৌকায় ডাকাতি হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, ডাকাতরা মারধর করে তাদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা লুট করে।
একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেরপুর সেতুসংলগ্ন বগাডুবি খাল এলাকায় হাঁস ব্যবসায়ীদের বহনকারী আরেকটি নৌকায় ডাকাতি হয়। নগদ ৭৫ হাজার টাকা, দুটি মোবাইল ফোন, হাঁড়ি-পাতিল ও ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা।
এর আগে গত ৭ জুন রাতে মিঠামইন-করিমগঞ্জ সীমান্তের হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় পর্যটকবাহী একটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রায় ৪০ জন পর্যটকের কাছ থেকে নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়।
আতঙ্কে হাওরবাসী
ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল মিয়া বলেন, প্রায় প্রতিদিনই গ্রামের পাশের চরের বিলে ডাকাতদের ঘোরাফেরা দেখা যায়। গ্রামবাসী পালাক্রমে পাহারা দেওয়ায় তারা বাড়িতে উঠতে পারে না। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে দিয়ে ডাকাত ঘুরাঘুরি করতেছে, অথচ ভয়ে কিছুই করতে পারতেছি না।’ বর্তমানে গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় পাহারাদার নিয়োগ করা হয়েছে।
মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক বাচ্চু বলেন, আগে রাতে চলাচলে ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার আগেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না, সেই দুশ্চিন্তা কাজ করে। তার ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদের সামনের মতো ব্যস্ত জায়গায় দিনের আলোতে ডাকাতির ঘটনা কল্পনাও করা যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন গ্রামের কিছু মানুষ ডাকাতদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে।
করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া গ্রামের নৌকার মাঝি হাবিকুল ইসলাম বলেন, আগে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকেরা হাওরে এসে রাত কাটাতেন। এখন সন্ধ্যার আগেই সবাই ফিরে যান। তিনি বলেন, ‘এখন তো অন্ধকারও লাগে না, দিনের আলোতেই ডাকাতেরা হামলা দেয়।’
প্রশাসনের পদক্ষেপ
ডাকাতি বৃদ্ধির পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় ডাকাতিপ্রবণ জলপথে বিশেষ নৌ-টহল শুরু করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৫টার পর প্রয়োজন ছাড়া হাওরাঞ্চলে নৌপথে চলাচল না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার বলেন, এক মাস আগে সংঘটিত একটি ডাকাতির ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক দুটি ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ডাকাতি প্রতিরোধে করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাট, নিকলী বেড়িবাঁধ এবং ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কে তিনটি পুলিশ কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ
গত ১২ জুলাই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম বলেন, হাওরের ডাকাতি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে। তার ভাষ্য, প্রশাসনের কাছে ডাকাতদের তালিকা রয়েছে। পুরনো রেকর্ডের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান চালালে ডাকাতরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান নৌযান চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত এটি।’ তার মতে, হাওরবাসীর প্রয়োজনেই গভীর রাত পর্যন্ত নৌযান চলাচল করতে হয়। তাই এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তিনি জানান, এলাকায় গিয়ে জনগণকে সংগঠিত করে ডাকাতদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম থানার জন্য তিনটি দ্রুতগামী স্পিডবোট বরাদ্দেরও দাবি জানান তিনি। তার ভাষ্য, ডাকাতরা দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে। তাই তাদের মোকাবিলায় পুলিশের কাছেও আধুনিক জলযান থাকা প্রয়োজন।
লাশবাহী নৌকায়ও ডাকাতি
৭ জুলাই রাত ১০টার দিকে ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় ডাকাতির শিকার হন মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের চমকপুর গ্রামের আবদুল হক।
তিনি জানান, তার ভাতিজা বাবু মিয়ার ১৫ দিন বয়সী কন্যাশিশু জন্মের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার পর তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ জুলাই বিকেলে শিশুটি মারা যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।
আবদুল হকের ভাষ্য, করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ার প্রায় ১৫ মিনিট পর একটি ছোট নৌকায় করে ছয় সদস্যের মুখোশধারী ডাকাতদল তাদের গতিরোধ করে। নৌকায় একটি শিশুর মরদেহ রয়েছে এ কথা জানিয়ে অনেক অনুরোধ করা হলেও ডাকাতরা কোনো কর্ণপাত করেনি। মারধরের ভয় দেখিয়ে তারা তিনটি মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়।
একই নৌকায় থাকা দুলেনা বেগম বলেন, ‘বড় বড় নৌকা, লঞ্চ কিংবা গাড়িতে ডাকাতির কথা শুনেছি। কিন্তু লাশবাহী নৌকাতেও যে ডাকাতি হতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। এবার নিজের চোখেই দেখলাম।’
নৌকার মাঝি রতন মিয়া জানান, নোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় পৌঁছানোর পর ডাকাতরা নৌকায় উঠে সোলার প্যানেলের ব্যাটারি এবং প্রায় চার হাজার টাকা লুট করে নেয়। তার ভাষায়, ‘ডাকাতরা সবাই মুখোশ পরা ছিল। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই মারতে উদ্যত হচ্ছিল। একপর্যায়ে প্রাণভয়ে বলেছি, যা আছে সব নিয়ে যান, কিন্তু কাউকে মারবেন না।’
মিঠামইনে গরু ব্যবসায়ীদের নৌকায় ডাকাতি, লুট সাড়ে ৫ লাখ টাকা।
লাশবাহী নৌকায় ডাকাতির ঘটনার মাত্র একদিন পর ৮ জুলাই সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সামনের হাওরে ডাকাতির শিকার হন তিন গরু ব্যবসায়ী।
ভুক্তভোগী নাজিম উদ্দীন জানান, নিকলী সাজনপুর বাজারে চারটি গরু বিক্রি করে অন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নৌকায় করে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে ছয় সদস্যের একটি ডাকাত দল নৌকার গতিরোধ করে।
তিনি বলেন, ডাকাতরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে প্রাণের ভয়ে তিনি ও সঙ্গে থাকা অন্য দুই ব্যবসায়ী প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা ডাকাতদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
নাজিম উদ্দীনের অভিযোগ, বিভিন্ন গ্রামের কিছু লোক আগে থেকেই ব্যবসায়ীদের চলাচল ও টাকার তথ্য সংগ্রহ করে ডাকাতদের কাছে পৌঁছে দেয়।
ইটনায় একই সন্ধ্যায় আরও এক ডাকাতি
একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেরপুর সেতুসংলগ্ন বগাডুবি খালে আরেকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
ডাকাতির শিকার সদরঞ্জন দাস জানান, তিনি ও তার এক সহযোগী সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা থেকে হাঁসের বাচ্চা কিনতে তাড়াইলের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। পথে সাত সদস্যের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল নৌকার গতিরোধ করে।
তিনি বলেন, ডাকাতরা হাঁড়ি-পাতিল, ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, দুটি মোবাইল ফোন এবং নগদ ৭৫ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
নদীতে পাহারার দায়িত্বে থাকা ফুল মিয়া বলেন, চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ব্যক্তিকে আতঙ্কিত অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাদের নিরাপদে বর্শিকুড়া বাজারে নিয়ে আসেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রুমেল মিয়া জানান, খবর পেয়ে কয়েকটি নৌকা নিয়ে ডাকাতদের ধাওয়া করা হলেও তারা এলংজুরী ইউনিয়নের দিকে পালিয়ে যায়।
পর্যটকবাহী ট্রলারেও হামলা
এর আগে ৭ জুন রাতে মিঠামইন-করিমগঞ্জ সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় পর্যটকবাহী একটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী রাজিব আহমেদ জানান, প্রায় ৪০ জন পর্যটক হাওর ভ্রমণ শেষে ফেরার পথে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ডাকাতদল ট্রলারে উঠে সবাইকে জিম্মি করে।
তিনি বলেন, ডাকাতরা নারী যাত্রীদেরও মারধর ও হেনস্তা করে। পরে মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। তার দাবি, প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে।
মসজিদের মাইকে ডাকাতের ঘোষণা, এবার মুয়াজ্জিনকে হুমকি
ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামে মসজিদের মাইকে ডাকাতের উপস্থিতির ঘোষণা দেওয়ায় স্থানীয় মুয়াজ্জিন আবদুল মতিনকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে ছিলনী জামে মসজিদে দায়িত্ব পালন করা আবদুল মতিন গ্রামবাসীর অনুরোধে ডাকাতের উপস্থিতির ঘোষণা দেন। পরে স্থানীয় লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে এগিয়ে গেলে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। তবে পরে স্থানীয় জেলে ফরিদ উদ্দিনের মাধ্যমে ডাকাতরা হুমকি দিয়ে যায়। তারা বলে, ‘এই মসজিদের মুয়াজ্জিনকে যেখানে পাব, তার খবর আছে।’
আবদুল মতিন বলেন, ‘আমি এই গ্রামেরই মানুষ। মানুষের প্রয়োজনে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিই। এখন যদি সেই দায়িত্ব পালন করায় ডাকাতদের হুমকি শুনতে হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত ৭২ দিনে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত অভিযোগে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় ৩২ হাজার ৯০৮ জনকে এবং সাধারণ অভিযানসহ বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় ৮৩ হাজার ৮১৭ জনকে।
সোমবার (১৩ জুলাই) পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখা থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১ মে থেকে ১২ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, ৭২ দিনের অভিযানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৪৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২ হাজার ৩১৩টি গুলি, ৮৮টি ম্যাগাজিন, ৫০৩টি দেশীয় অস্ত্র, ৪৩টি ককটেল, ২ কেজি গান পাউডার, ১৮টি অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ১৭টি অস্ত্র ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম এবং ১০ হাজার চকলেট বাজি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পিস্তল ৭৬টি, শুটার গান ৩০টি, এলজি ৩৩টি, রিভলবার ১৮টি, বন্দুক ৫০টি, পাইপগান ১৫টি, শটগান ৪টি, রাইফেল ২টি, এসএমজি ২টি, এয়ারগান ১২টি ও পেনগান ১টি। এ ছাড়া পুলিশ ৭৬ লাখ ৪০ হাজার ২৭৬টি ইয়াবা বড়ি, ৮ হাজার ২৮৪ পুরিয়া হেরোইন, ৩ হাজার ১৮৬ বোতল ফেনসিডিল, ৬ হাজার ৮৩৫ বোতল বিদেশি মদ, ৩৫৪ বোতল দেশি মদ, ৫ হাজার ৩৩৬ পুরিয়া গাঁজা এবং মাদক ও মাদকজাতীয় অন্যান্য দ্রব্য উদ্ধার করেছে। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ১৪ হাজার ১৫৭টি মামলা এবং ২০ হাজার ৪৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে চাঁদা দাবির পর আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠান এক্সাবাইট লিমিটেড ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা ও ল্যাপটপ লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নগরীর চকবাজার থানার কাছাকাছি স্থানেই ওই প্রতিষ্ঠানে ১০ মিনিট ধরে চালানো হয় এ তাণ্ডব। সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের চকবাজার থানাধীন এক্সেস রোডে ডিডিএনের কার্যালয়ে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরা থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। মুখে মাস্ক পরা এসব সন্ত্রাসী অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন মূল্যবান আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।
একপর্যায়ে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য অফিসে রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে যায়। এই হামলার পেছনে দুর্ধর্ষ ক্যাডার বড় সাজ্জাদের অনুসারী ডেভিড ইমনের সহযোগীদের জড়িত থাকার ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সম্প্রতি ইমন মোবাইল ফোনে ওই ব্যবসায়ীর কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা চান, না দিলে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়। তাদের কথাবার্তার অডিও রেকর্ড থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ডিডিএনের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির বলেন, ‘হঠাৎ ১৫ থেকে ২০ জন অস্ত্রধারী আমাদের অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। তারা অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর করে এবং কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। অফিসের সব কম্পিউটার ভেঙে ফেলা হয়েছে।’
হামলার ঘটনার পর সামনে এসেছে ডিডিএনের স্বত্বাধিকারীকে মোবাইল ফোনে হুমকির কল রেকর্ড। সেখানে ডেভিড ইমন নামের এক ব্যক্তি চাঁদা দাবি করেন। সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় এ হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইমন নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর সন্ত্রাসী। তার নামে অন্তত সাতটি হত্যা মামলা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ হামলাকারীদের পরিচয় ও ঘটনায় কাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—সে প্রসঙ্গে কিছুই জানায়নি।
এদিকে হামলার আগে ডিডিএনের স্বত্বাধিকারী আদিল বিন মানুনের মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়ার একটি কল রেকর্ড আজকে প্রকাশিত হয়েছে। ওই কল রেকর্ডে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি আপনাকে দুই দিনের সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলবেন। এখন আমাদের ছেলেরা ব্যবসা করবে। ব্যবসা করতে হলে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে, না হলে ব্যবসা করবেন না। ১৭ বছর অনেক ব্যবসা করেছেন।’
কল রেকর্ডে ইমন আরও বলেন, ‘ইমনকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন। সাজ্জাদ গ্রুপের ডেভিড ইমন কল দিয়েছে।’
এর জবাবে আদিল বিন মানুন বলেন, ‘আপনারা কেন আমার ওপর এত ক্ষিপ্ত? এখানে তো আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে।’ তখন অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম শহরের সবাই আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবসা করছে। ব্যবসা করতে হলে আমাদের সঙ্গে কমিটমেন্ট করে করবেন।’
ডিডিএনের একটি সূত্রের দাবি, এককালীন দুই কোটি টাকা ও পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। এতে সায় না দেওয়ায় হামলা করেছে সাজ্জাদ বাহিনী।
এ বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, হামলার খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ চলছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। মোবাইল ফোনে হুমকির প্রসঙ্গে ওসি বলেন, ‘আমরা সবকিছু বিবেচনায় রেখে তদন্ত চালাচ্ছি।’
এ ঘটনার পর থেকে নগরের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি।
পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন—এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন। তাদের একজন ডেভিড ইমন। এর আগে দেশে এই দলের নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ।