‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ফেনীতে উৎসবমুখর পরিবেশে সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক।
এর আগে বেলা সাড়ে ১১টায় শহরের মিজান রোডস্থ মিজান ময়দান থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জহির রায়হান হল মাঠে এসে শেষ হয়। এবারের মেলায় মোট ২০টি স্টল স্থান পেয়েছে। যেখানে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ফুলের চারা প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।
র্যালি শেষে জহির রায়হান মাঠে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ফেনী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আল আমিন সরকার, ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্লাহ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা।
অনুষ্ঠানে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মামুন, ফেনী সদর বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র ভৌমিক, জেলা করাত কল মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী (আমির) ও নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি আবু বক্কর ছিদ্দিকসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। সাংস্কৃতিক সংগঠক মাহতাব সোহেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মনিরা হক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ লাগানোর ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, গাছ শুধু আমাদের পরিবেশই রক্ষা করে না, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাদের বেশি বেশি করে গাছ রোপণ করতে হবে। তবে শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না, সেগুলোর সঠিক পরিচর্যাও নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, জহির রায়হান হল মাঠে আয়োজিত এই মেলাটি প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলা চত্বরে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত চারার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য গাছের পরিচর্যাবিষয়ক পরামর্শের সুবিধাও রাখা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীনের পথে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ফয়জুল্লাহপুর গ্রাম। নদীর প্রবল স্রোতে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভেঙে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন শত শত পরিবার। প্রতি বছর নদীভাঙনে পদ্মা নদীর তীরবর্তী অনেক মানুষ ভূমিহীন হয়ে এখন নিঃস্ব প্রায়। ইতোমধ্যে ওই এলাকায় নতুন করে নদীভাঙন শুরু হয়েছে।
পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হার্ডিংঞ্জ ব্রিজ পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে ফয়জুল্লাহপুর এলাকার ওপর দিয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।
ফয়জুল্লাহপুর গ্রামের প্রবীণ অধিবাসী ইয়ার কবিরাজ বলেন, ‘কয়েকদফায় নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সব হারিয়ে গেছে। এখন বসতবাড়িটুকুই আমার শেষ সম্বল।’ তিনি আরও জানান, প্রায় ৬০-৭০ বছর আগে চাকলার চর থেকে এই এলাকায় তার বাপ-দাদারা এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। শেষ সম্বল বাড়িটুকু হারিয়ে গেলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’
তবে সেটিও আগামী কিছুদিনের মধ্যে মধ্যে নদীতে বিলিন হওয়ার শঙ্কায় কাটছে তার প্রতিটি নির্ঘুম রাত।
আফতাবুল সরদার (৭০) জানান, সবই চলে গেছে পানির নিচে। বেচাকেনা করলেও মানতে পারতাম। কিন্তু এখানে তো সবই গেছে পানির নিচে।
শুধু আফতাবুর সরদারই নন, ভিটেমাটি হারিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বহু সচ্ছল পরিবার।
স্থানীয়রা জানান, এলাকার মানুষ একদম নিঃস্ব হয়ে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টা আরও দেখভাল করলে ভালো হতো।
পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনকে এই ভাঙনের মূল কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
গত কয়েক বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা নিয়ন্ত্রণে কিছু জিওব্যাগ নদীতে ফেলে দিলেও তীব্র স্রোত ও ভৌগোলিক পরিবর্তনে সেসব বাঁধ টেকসই হচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বারবার প্রতিরক্ষা বাঁধ দেওয়ার পরও থামানো যায়নি ভাঙন। তাই বসতবাড়ি ও ফসলি জমি বাঁচাতে মজবুত বাঁধ নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের।
তারা জানান, সবাই দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক জায়গায় কথা বলে হয়েছে; কিন্তু কোনো উপকার হচ্ছে না।
অনেক নেতাই বারবার এসে প্রতিশ্রুতি দেন; কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয় না।
কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমি ইতোমধ্যে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। তবে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’
যশোরের কেশবপুর উপজেলায় পরপর দ্বিতীয়বার কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় এক প্রসূতি নারী ও তার নবজাতক কন্যাশিশুকে হাসপাতালে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেকসোনা খাতুন তাদের পাশে দাঁড়ান এবং চিকিৎসার ব্যয়সহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করেন।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) কেশবপুর উপজেলার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে এক নারী কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এর আগে তার ঘরে আরও একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। নবজাতক কন্যাশিশুর জন্মের খবর পেয়ে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা প্রসূতি মা ও শিশুটিকে ক্লিনিকে রেখে চলে যান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অসহায় ওই নারীর বাবা নেই। আর্থিক সংকটের কারণে তার মাও দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে পারেননি। ফলে অপারেশনের পর প্রয়োজনীয় সেবা, পুষ্টিকর খাবার ও মানসিক সমর্থন ছাড়াই নবজাতককে নিয়ে হাসপাতালে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাতে হয় তাকে। এমনকি খাবার ও অর্থের অভাবে অন্যের সহায়তায় কোনোমতে দিন পার করছিলেন তিনি।
ঘটনার বিষয়টি ইউএনও রেকসোনা খাতুন জানতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। প্রসূতি নারীর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে কেশবপুরে আনার ব্যবস্থা করা হয়। পরে তাদের হাতে আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।
ইউএনওর অনুরোধে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ প্রসূতি নারীর সিজারিয়ান অপারেশনসহ চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ মওকুফ করে। পরবর্তীতে মা ও নবজাতককে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে তার মায়ের বাড়িতে পাঠানো হয়।
বর্তমানে মা ও নবজাতক শিশুটি তার মাতৃগৃহে অবস্থান করছে। তবে কন্যাসন্তান জন্মের কারণে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন দীর্ঘ সময় তাদের কোনো খোঁজখবর নেয়নি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ইউএনও রেকসোনা খাতুন বলেন, ‘প্রসূতি মা ও নবজাতকের দুর্দশার কথা জানতে পেরে আমরা দ্রুত সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছি। একজন মায়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময়ে তাকে এভাবে পরিত্যাগ করা অত্যন্ত অমানবিক। সন্তানের লিঙ্গ নিয়ে বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেশবপুর থানার অফিসার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহযোগিতায় শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা এখন মা ও শিশুকে নিজেদের কাছে নিয়ে যেতে সম্মতি জানিয়েছে।’
রেকসোনা খাতুন বলেন, ‘বিজ্ঞান ও সভ্যতার এই যুগে দাঁড়িয়ে কন্যাসন্তান জন্মকে অপরাধ হিসেবে দেখা চরম মানসিক দেউলিয়াত্বের পরিচয়। ছেলে-মেয়ে নয়, প্রত্যেক সন্তানই সমান মর্যাদা ও ভালোবাসার দাবিদার। সমাজে কন্যাসন্তানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠুক, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’
স্থানীয় সচেতন মহল এ ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় উল্লেখ করে কন্যাসন্তান নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যমূলক মানসিকতা দূর করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অষ্টগ্রাম, ইটন, মিঠামইন, নিকলী ও বাজিতপুর উপজেলার কিছু অংশ প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের এক বিশাল আধার। কিন্তু বর্তমানে এই হাওরগুলোতে অবৈধ জাল ব্যবহারের ফলে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জাল এবং মশারি জালের অবাধ ব্যবহারে হাওরের জলজ পরিবেশ চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এই জালগুলোর সূক্ষ্ম বুননের কারণে রেনু ও পোনা মাছও রেহাই পাচ্ছে না, ফলে মাছের প্রাকৃতিক বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া পানির নিচে দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা চায়না দুয়ারি জাল মাছ চলাচলের পথ রুদ্ধ করে নির্বিচারে সব ধরনের মাছনিধন করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের মূল কারিগর এই নিষিদ্ধ জালগুলো এখন স্থানীয় হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। অষ্টগ্রামের আদমপুর বাজার ও নাসিরনগরের চাতলপার বাজারসহ হাওর এলাকার বিভিন্ন বাজারে এগুলো অবাধে বেচাকেনা চলছে। সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মৎস্যজীবী থেকে শুরু করে অসাধু চক্র সহজেই এই মরণফাঁদ সংগ্রহ করতে পারছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা ও জাল পুড়িয়ে ফেলার উদ্যোগ নিলেও, আইনি জটিলতার কারণে এটি দীর্ঘমেয়াদি সুফল আনতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নিষিদ্ধ জাল বন্ধ করতে হলে মূলত এর উৎপাদন ও আমদানির উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জ জেলার সদর, লৌহজং ও গজারিয়া উপজেলার প্রায় প্রতিটি ঘরে এসব জাল তৈরির কারখানা রয়েছে। তারা আইনি জটিলতা বা উচ্চ আদালতের রিটের দোহাই দিয়ে সারাদেশে এই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে নিয়েছে, যা আমাদের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আরও জানান, গত বছর পাকুন্দিয়া উপজেলায় নিষিদ্ধ জালের একটি বিশাল চালান আটক করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা উচ্চ আদালতের এমন একটি আদেশের কপি দেখান, যেখানে সারাদেশে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ থাকার কথা বলা হয়েছে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অবগত মুচলেকা নেওয়া হয়, ওই ব্যবসায়ীরা কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় কোনোভাবেই এই নিষিদ্ধ জাল বিক্রি করবেন না। এই মুচলেকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হলেও মূলত আইনি কৌশলের কাছে প্রশাসন অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় হাট-বাজারে জাল বিক্রির বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় বাজারে গিয়ে নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা অবশ্যই অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। হাওরের নদী ও খালগুলোতে অবৈধ জালের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হাওরের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। শুধু হাওরে অভিযান না চালিয়ে জাল উৎপাদনকারী মূল চক্রকে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক ও মৎস্যজীবীদের নিয়ে প্রতিটি এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম গড়ার মাধ্যমে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রশাসনের সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপই পারে এই ধ্বংসযজ্ঞ রোধ করে হাওরের মৎস্যসম্পদ ও জাতীয় অর্থনীতিকে রক্ষা করতে।
টানা ৭ দিনের ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মাগুরার জনজীবন। অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকার সড়ক তলিয়ে গেছে পানিতে। কোনো কোনো এলাকার সড়ক এবং সেতুর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
শহরের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাওয়াই ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। টানা সাত দিন বৃষ্টি নামার পর মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) সূর্যের দেখা মিললেও রাস্তায় পানি কাদার জন্য চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মাগুরাবাসীকে।
গত শুক্রবার (১১ জুলাই) ভারি বর্ষণের কারণে মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের সড়কের ছোট্ট সেতুটি পানির প্রবল চাপে ভেঙে পড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে আশেপাশের পাঁচ গ্রামের মানুষ। সেতুটি ভেঙ্গে পড়ায় শালিখা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ভেঙে পড়া সেতুটির উপর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচল ছিল। বর্তমানে সাধারণ মানুষের চলাচলে অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে কোমলমতি শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না এমনকি কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে সময়মতো হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এলাকাবাসীরা জানান,ঠিকাদারের গাফিলতির জন্য সেতুটি দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বারবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়া শর্তেও কোনো কাজ হয়নি অনেক যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে এর উপর দিয়ে চলাচল করতো টানা বৃষ্টিতে ব্রিজের নিচের মাটি সরে গিয়ে ভেঙে পড়েছে। দ্রুত সেতুটি সংস্কার করে মানুষের চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান তারা।
এদিকে মাগুরার চারটি উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা, কুমার, ফটকি ও মধুমতি নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে বয়ে চলেছে।
এছাড়াও মাগুরা সদর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা যেমন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, কলেজপাড়া, আলামিন স্কুল সংলগ্ন সড়কসহ বিভিন্ন নিম্নাঅঞ্চল সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো এলাকার পানি নেমে গেলেও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়কের। যেমন পলি ক্লিনিক সংলগ্ন সড়ক, শুভেচ্ছা প্রিপারেটরি স্কুল সংলগ্ন সড়কের বেহাল দশার জন্য রিক্সা এবং অটো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব সড়কের পিচ ও খোয়া উঠে যাওয়াই বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে ফলে প্রায় সময় নানা রকম দুর্ঘটনা ঘটে। শহরে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলেও ময়লা আবর্জনার কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে পানিতে তলিয়ে যায়।
বিশেষ করে কলেজ পাড়ায় বিভিন্ন কোচিং সেন্টার হওয়ায় প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীরা কোচিং করতে এই সড়ক ব্যবহার করে। বিভিন্ন জায়গায় ড্রেনের মুখ খোলা থাকায় প্রায় সময় ড্রেনের মধ্যে পড়ে শিক্ষার্থীদের জামা কাপড় নোংরা হয়ে যায়। তাছাড়া ভারি বর্ষণের কারণে সময় মত কোনো যানবাহন না পাওয়ায় সাধারণ জনগণ ও শিক্ষার্থীরা অফিস আদালতে বা বিদ্যালয় যেতে পারছেন না। এদিকে সারাদেশে চলছে এইচএসসি পরীক্ষা সেই সাথে হাইস্কুলগুলোতে শুরু হয়েছে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। কিছু কিছু এলাকায় পানি উঠে যাওয়ায় ঘর থেকে বেরোতে পারছেন না অনেকেই। পরীক্ষার জন্য বৃষ্টিতে ভিজেই শিক্ষার্থীদের যেতে হচ্ছে পরীক্ষা দিতে। অধিকাংশ সময় বৃষ্টির জন্য যানবাহন না পাওয়ার কারণে কলেজ ও বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
তবে এ ব্যাপারে মাগুরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নির্মল কুমার জোয়াদ্দার একটি বিশেষ পন্থা অবলম্বন করেছেন। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত পরীক্ষা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃষ্টিতে ভিজে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের কথা চিন্তা করে তিনি পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ের থেকে ১৫ - ২০ মিনিট দেরিতে পরীক্ষা শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে অভিভাবকরা বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
মাগুরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, টানা সাতদিন বৃষ্টিতে ঘর থেকেই বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও পরীক্ষার জন্য আমাদেরকে এই বৃষ্টির মধ্যে বিদ্যালয়ে আসতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পানি জমে থাকায় আমাদের জুতা অনেক সময় ভিজে যায় এতে চুলকানি সহ নানা ধরনের সমস্যায় ভুগতে হয়। আবার অনেক সময় পা পিছলে পানিতে পড়ে আমাদের কাপড় নষ্ট হয়ে যায়।
শহরের সততা কাঁচাবাজারের সবজি ব্যবসায়ীরা বলেন, টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে মাগুরার বিভিন্ন গ্রামের বাড়িঘর রাস্তা, মাঠঘাট পানিতে তলায় গেছে। সেজন্যি বিভিন্ন শাকসবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর যেগুলো আছে রাস্তায় পানি কাঁদার জন্যি যানবাহন না পাওয়ায় সেগুলো আনা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাজারে সবজির পরিমাণ খুবই কম। এতে আমাদের মতো ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
মাগুরা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান বারী জানান, শহরে পানি জমার প্রধান কারণ হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপব্যবহার। পানি নিষ্কাশনের জন্য আমরা সবসময় কাজ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে কলেজপাড়া একটি ব্যস্ততম এলাকা এখানে ঘনবসতি হওয়ায় বাসা বাড়ির সমস্ত ময়লা প্রতিনিয়ত পলিথিনে করে ড্রেনের মধ্যে ফেলা হয়। নিষেধ করলেও কেউ শোনে না আর প্রতিনিয়ত এই ময়লা ফেলার কারণে ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃক্ষপ্রেম গড়ে তোলার লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে মাদারীপুরে। বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের ২২ নং টুবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সবুজায়ন কার্যক্রমকে আরও বেগবান করার উদ্দেশে গাছের চারা রোপণ করা হয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন ২২ নং টুবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কামরুল ইসলাম আকরাম খান, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাসুদুর রহমান, মাদারীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনায়েত হোসেন দুলাল কাজী, জেলা তাতীদলের সভাপতি জাকির হোসেন মোল্লা, সমাজসেবক জাহাঙ্গীর খান, আনোয়ার হোসেন হাওলাদার।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি লিজা আক্তার, অভিভাবক সদস্য শওকত মাতুববরসহ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। বৃক্ষরোপণের সময় বক্তরা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে তারা এই কর্মূসূচি পালন করছেন।
২৫ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাসিন্দা বাক-প্রতিবন্ধী রুবি বেগম (ওহেদা বেগম)-এর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) মহানগরের সাতমাথায় বগুড়া মূক-বধির সংঘের উদ্যোগে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বগুড়া মূক বধির সংঘের সভাপতি আইনজীবী রায়হান আহম্মেদ রানা, কোষাধ্যক্ষ ইমামুল হাসান, নির্বাহী সদস্য আরিফুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাকসহ প্রমুখ। এসময় তারা নিহত রুবির হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে ২০০২ সালের দিকে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার ধোন শাতঘটিয়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন বাক-প্রতিবন্ধী রুবি বেগম। এরপর ৩ থেকে ৪ বছর ধরে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরা সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। একপর্যায়ে পরিবার তার খোঁজার আশা ছেড়ে দেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও দেখে পরিবারের সদস্যরা রুবিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। নিখোঁজ হওয়ার পর রুবি বেগম নরসিংদী জেলার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘ ২৫ বছর নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে যখন রুবির সন্ধান পাওয়া গেল। তখন জানা যায়, সামান্য কিছু টাকার লোভের কারণে নরসিংদীর মেথিকান্দা রেল স্টেশন এলাকায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফরিদপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) ফরিদপুর সদর উপজেলার ১০০নং ভাটিলক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।
ফরিদপুর সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুশান্ত কুমার বাড়ৈর সভাপতিত্বে ও উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কৃষ্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম।
এ সময় ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কমিটির সূরা সদস্য প্রফেসর আবদুত তাওয়াব, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিষ্ণুপদ ঘোষাল, সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ.কে.এম তৌফিকুর রহমান, সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক সহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। কর্মসূচির মাধ্যমে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়।
এই সময় বক্তারা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করা এবং বিদ্যালয়কে সবুজে ঘেরা পরিবেশে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই বলেও তারা উল্লেখ করেন।
মাত্র আট বছর বয়সে ডান (আক্রান্ত) পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলতে শুরু করেছিল। প্রথমে পরিবার বিষয়টিকে সাধারণ শারীরিক সমস্যা মনে করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পায়ের আকার ও ওজন বাড়তে থাকে। এখন ২৫ বছর বয়সি আবু বক্করের জন্য স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করাই হয়ে উঠেছে কঠিন। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে একটি বিরল শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন তিনি।
আবু বক্করের বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী ইউনিয়নের আমলাতুলি গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের বাসিন্দা মো. সাইদুল ইসলামের একমাত্র ছেলে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ছেলেকে সুস্থ করার আশায় জেলা ও বিভাগীয় শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হলেও কোনো আশানুরূপ সুফল মেলেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত পায়ের আকার আরও বড় হয়েছে। পরিবারের দাবি, আগের কিছু চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে।
আবু বক্করের বাবা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলের চিকিৎসার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। ২০২২ সালে উন্নত চিকিৎসার আশায় তাকে ভারতের চেন্নাইয়ে নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, কয়েক ধাপে অস্ত্রোপচার করতে হবে। এতে প্রায় ১৫-২০ লাখ টাকা খরচ হবে। আমাদের মতো পরিবারের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা অসম্ভব।’
বর্তমানে আবু বক্কর বাড়িতেই থাকেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংসারের ছোটখাটো কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। তবে পায়ের অতিরিক্ত ওজনের কারণে নিয়মিত চলাফেরা, কাজ করা কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন—সবকিছুই তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
ছেলের চিকিৎসার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মানুষের একটু সহযোগিতা পেলে হয়তো আমার ছেলেটা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।’
স্থানীয়দেরও আশা, সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা মিললে আবু বক্করের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এবং দীর্ঘদিনের এই দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তির সুযোগ তৈরি হবে।
শেরপুর জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘রোগীকে নিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারের পরামর্শক্রমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট যোগাযোগ করলে সহায়তা করা হবে।’
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাডামস ফাউন্ডেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে মাল্টি অ্যাক্টর পার্টনারশিপ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীলতার উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে জাতীয় কৌশল প্রণয়নে সহযোগিতা কার্যক্রম শীর্ষক প্রকল্পের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা বুধবার (১৫ জুলাই) খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপরিচালক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসিফুর রহমান।
কর্মশালায় অতিথিরা বলেন, ‘জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন ও বন্যার কারণে জলবায়ু দিন দিন পরির্তন হচ্ছে ও ক্ষয়-ক্ষতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।’
অ্যাডমস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এস এম আলী আসলামের সভাপতিত্বে কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. মুজিবুর রহমান ও কুয়েটের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (আইডিএম)-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. আঞ্জুম তাসনুভা। কর্মশালায় খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মমতাজ বেগম, উপপরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম, উপপরিচালক মিহির লাল সরদার, খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উপপ্রধান তথ্য অফিসার (রুটিন দায়িত্ব) মো. মেহেদী হাসান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী জিল্লুর রহমান। কর্মশালাটি পরিচালনা করেন অ্যাডামস ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী পরিচালক আশিক মাহমুদ।
কর্মশালায় পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
উল্লিখিত প্রকল্পটি স্থানীয় পর্যায়ে অ্যাডামস ফাউন্ডেশন জাতীয় পর্যায়ে আইক্যাড ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জার্মানওয়াচ বাস্তবায়ন করছে। কর্মশালার উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এর ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবিলা সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। কর্মশালায় জলবায়ুসংক্রান্ত পরিবর্তনে অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক বিষয়াদি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা, ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপগুলো, বাংলাদেশে ক্ষয়-ক্ষতির জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নবিষয়গুলো এবং ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আমাদের দায়িত্বগুলো সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে পচা গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগে এক মাংস ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় দোকান থেকে জব্দ করা প্রায় দুই বস্তা পচা মাংস মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করা হয়। বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লাবনী আক্তার তারানার নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, অভিযানের সময় কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড এলাকার মাংস ব্যবসায়ী শারফিন কসাইয়ের দোকানে পচা গরুর মাংস বিক্রির সত্যতা পাওয়া যায়। পরে তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দোকান থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় দুই বস্তা পচা মাংস জব্দ করে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়াতে মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করা হয়।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লাবনী আক্তার তারানা বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। জনস্বার্থে পচা মাংস ধ্বংস করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বিক্রির বিরুদ্ধে জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিত পরিচালনা করা হবে।’
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা উপকূলীয় এলাকায় একটি নতুন লঘুচাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সমুদ্রবন্দরগুলোকে সতর্ক সংকেত প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক বিশেষ সতর্কবার্তায় এই তথ্য জানানো হয়েছে।
আবহাওয়ার সতর্কবার্তায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সকাল ১০টার দিকে লঘুচাপটি স্পষ্ট হয়েছে। সাধারণত লঘুচাপ সৃষ্টির কিছু সময় পর এর প্রভাব অনুভূত হয়, তাই বৃহস্পতিবার হতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের বৃষ্টিপাত গত সপ্তাহের মতো প্রলয়ংকরী হওয়ার আশঙ্কা কম। বুধবার ঢাকায় সকালের দিকে সামান্য বৃষ্টি হলেও বিকালের দিকে এর তীব্রতা কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। উল্লেখ্য যে, গত ৫ জুলাই সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের ফলে চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ সারা দেশে যে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, নতুন এই লঘুচাপের প্রভাবে আবহাওয়া পুনরায় কিছুটা অস্থির হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বিগত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারী বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি হুঁ হুঁ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এর ফলে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এ বছরে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।
গত এক সপ্তাহ আগে হ্রদের পানি ৭৮ ফুট মিনসি লেভেলের কাছে থাকলেও মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল থেকে হ্রদের পানি ১০২ দশমিক ২৫ ফুট মিনসি লেভেল অতিক্রম করেছে। সেই সঙ্গে কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২২২ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টায় পানির লেভেল ছিল ১০২ দশমিক ২৫ ফুট মিন সি লেভেল। কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট থেকে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২ শত ২২ মেগাওয়াট। যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন।
এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ২ শত মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও হ্রদে পানি স্বল্পতায় গত বছরের ডিসেম্বর হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০০ মেগাওয়াটের নিচে চলে আসে।
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে দেশের সাত জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আকাশভাঙা বৃষ্টি আর দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় দেশের ৪৩টি জেলার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিকেলে ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ৫৬ জন মারা গেছেন। রাঙামাটিতে ৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, কক্সবাজারে ৩১ জন, চট্টগ্রামে ১৫ জন, মৌলভীবাজারে একজন মারা গেছেন। কক্সবাজারে নিহতদের মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় ও ১৩ জন রোহিঙ্গা।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫৯ উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এক হাজার ৫৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ১০ হাজার ৮৫৪ জন আশ্রয় নিয়ে আছেন।
মন্ত্রণালয় বলছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা হিসেবে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন্যাকবলিত সাত জেলায় এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং তিন হাজার ২৫০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর বাকি ৫৭ জেলার প্রত্যেকটিতে ৫ লাখ টাকা করে নগদ সহায়তা এবং ১০০ মেট্রিক টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের ভারি বৃষ্টিপাতে দেশের ৪৩টি জেলা কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং ড্রেনেজ বা নিষ্কাশন ব্যবস্থার বিপর্যয়ের ফলে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমির ফসল পুরোপুরি বা আংশিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই বিপুল পরিমাণ জমির ফসলের মধ্যে রয়েছে চলতি মৌসুমের প্রধান চালিকাশক্তি আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন হরেক রকমের সবজি, আদা, হলুদ ও পেঁপেসহ নানা ধরনের অর্থকরী ফসল। নিচে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রধান খতিয়ান তুলে ধরা হলো:
আউশ ধান: সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধানের। প্রায় ৭৯,৫০০ হেক্টর জমির আউশ ধান এখন পানির নিচে। অনেক স্থানে ধান পেকে যাওয়ার মুহূর্তে এই দুর্যোগ আসায় কৃষকেরা ঘরে ফসল তুলতে পারেননি।
আমনের বীজতলা: আমন মৌসুমকে সামনে রেখে কৃষকেরা যে চারা তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে ১০,৫০৪ হেক্টর বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে আগামী দিনে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
গ্রীষ্মকালীন সবজি: প্রায় ১৭,৮০০ হেক্টর জমির সবজি খেত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। কাঁচামরিচ, করলা, ঝিঙে, ধুন্দুল, শসাসহ বাজারে চলমান সবজির সরবরাহ লাইনে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
কৃষকদের চোখে জল ও দীর্ঘশ্বাস: কাগজে-কলমে হেক্টর কিংবা সংখ্যার যে হিসাব আমরা দেখি, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের জীবনের বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি নির্মম ও হৃদয়বিদারক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই মুহূর্তে তাদের চারপাশ শুধু পানি আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
খুলনা জেলার বতিয়াঘাটা উপজেলার খলশিবুনিয়া গ্রামের একজন আদর্শ কৃষক প্রসাদ রায়। চলতি আমন মৌসুমকে ঘিরে তার মনে ছিল অনেক বড় পরিকল্পনা। গত সপ্তাহেই তিনি অনেক কষ্ট করে নিজের ১০ কাঠা জমিতে আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। তার আশা ছিল, এই বীজতলা থেকে উৎপাদিত চারা দিয়ে তিনি নিজের ১৭ বিঘা জমিতে ধান চাষ করবেন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে তার পুরো বীজতলাটি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
প্রসাদ রায় বারবার চেষ্টা করেছেন নিজের উদ্যোগে শ্যালো পাম্প দিয়ে পানি সেচে খেতটা বাঁচাতে, কিন্তু চারদিকের পানি এত বেশি ছিল যে তার সমস্ত চেষ্টা ভেস্তে গেছে। চারাগুলো পানির নিচে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তার সামনে নতুন করে বীজতলা তৈরি করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, ‘আবার শুরু থেকে সব করতে হবে। নতুন করে বীজ কিনতে হবে, টাকা খরচ করতে হবে। অথচ পকেটে টাকা নেই। সামনে কী হবে, সেই অনিশ্চয়তা তো আছেই।’
নদী ভরাট ও মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতার অভিশাপ: প্রসাদ রায়ের এই দুর্দশার পেছনে কেবল প্রকৃতির বৃষ্টি দায়ী নয়, বরং মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ও সমানভাবে দায়ী। তিনি জানান, তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শালতা নদীটি গত পাঁচ বছরে পলি জমে সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া বিলের ভেতরের প্রাকৃতি খালগুলো প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করে ফেলেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ার কোনো পথ নেই। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ এই অবহেলা ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
শিমের চারা হারিয়ে দিশেহারা মিরিন গোলদার: একই উপজেলার চক শৈলমারী গ্রামের কৃষক মিরিন গোলদার একটু বাড়তি লাভের আশায় এবার আগাম শিমের চাষ করেছিলেন। ধারদেনা করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি শিমের চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে তার মাঠের প্রায় অর্ধেক চারা পচে গেছে। খুলনা জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই জেলায় প্রায় ৩৪০ হেক্টর কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু ফসল হয়তো পানি কমলে স্বাভাবিক হতে পারে, তবে বেশিরভাগই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
পটুয়াখালীর আমন চাষি ও পানচাষিদের হাহাকার: পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেনের গল্পটাও একই রকম। এক একর জমিতে তিনি রোপা আমনের বীজতলা করেছিলেন, যা এখন হাঁটুপানির নিচে। তিনি জানান, বাজার থেকে চড়া দামে আবার ধানের বীজ কিনে নতুন করে কাজ শুরু করার মতো আর্থিক সামর্থ্য এই মুহূর্তের অনেক কৃষকেরই নেই।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কাগজিরপুল এলাকার পানচাষিরা। টানা বৃষ্টিতে পানের বরজগুলোর মাটি নরম হয়ে ভেঙে পড়েছে এবং লতাগুলো পচে গেছে। এখানকার পানচাষি বেলায়েত খান, জাকির হোসেন ও জাহাঙ্গীর হোসেনের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা। ৭০ বছর বয়সি প্রবীণ চাষি বেলায়েত কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার জীবনের সব সঞ্চয় এই বরজেই ঢেলেছিলাম। এখন সব হারিয়ে আমি নিঃস্ব।’ ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জাকির জানান, তিনি ইতোমধ্যে ব্যাংক ও এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের বোঝায় জর্জরিত। আর জাহাঙ্গীর ভাবছেন, এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতি কাটিয়ে কীভাবে ঋণের কিস্তি শোধ করবেন আর কীভাবে পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেবেন।
শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ: এই দুর্যোগ কেবল মাঠের কৃষকদেরই নয়, গ্রামীণ ও মফস্বল শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জীবনকেও স্থবির করে দিয়েছে। পটুয়াখালী শহরের রিকশাচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেনের কথাই ধরা যাক। গত কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টির কারণে শহরের রাস্তাঘাট ফাঁকা, মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।
জাকির হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে যাত্রী এক্কেবারে কমে গেছে। সকাল থেকে ভিজা ভিজা রিকশা চালাচ্ছি, কিন্তু রাস্তায় মানুষ নাই। স্বাভাবিক দিনে যা আয় করি, আজ তার অর্ধেকও হয় নাই। এই বাজারে অল্প টাকা দিয়া চাল-ডাল কিনব নাকি পরিবারের খরচ চালাব, তা মাথায় ধরছে না।’ দিনমজুর, ভ্যানচালক কিংবা ফেরিওয়ালাদের অবস্থাও ঠিক একই রকম।
এই বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি এবং সাধারণ ভোক্তাদের জীবনের ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ভর করবে বন্যা বা জলাবদ্ধতা কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। যদি পানি দ্রুত নেমে যায়, তবে কিছু ফসল হয়তো রক্ষা পাবে। কিন্তু জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আউশ, আমন ও সবজির ক্ষতি অপূরণীয় রূপ নেবে।
জাহাঙ্গীর আলম খান আরও উল্লেখ করেন যে, এই দুর্যোগের প্রভাব শুধু ফসলের মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘস্থায়ী পানির কারণে গ্রামীণ অঞ্চলে হাঁস-মুরগির খামার, গবাদিপশু, মৎস্য চাষের ঘের এবং পশুখাদ্যের (খড় ও ঘাস) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক মাছের ঘের ভেসে গেছে, যা চাষিদের আরও ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাৎণিক পুনর্বাসন: কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সরকার কৃষকের পাশে আছে। কৃষকেরা যাতে এই ধাক্কা সামলে দ্রুত মাঠে ফিরে যেতে পারেন এবং কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারেন, তার জন্য সব ধরনের পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত এই তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণের কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা।