বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে, কৃত্রিম সংকট রোধ ও পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদারে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে এবং এ বিষয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন সরকারপ্রধান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব ইত্যাদি রোধে উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরকারি তহবিল ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধনের কথাও বলেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ের শাপলা হলে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমন ২৫টি নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিগত ১৪ বছরে বাংলাদেশের এক অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিগত ১৪ বছরে মাথাপিছু আয় ৫৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। জিডিপির আকার মাত্র ৭০ বিলিয়ন থেকে ৪৬৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারির আগে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। মহামারি আঘাত হানার পর তা কিছুটা শ্লথ হলেও বর্তমানে তা ক্রমাগতভাবে আগের ধারায় ফিরে আসছে।’
করোনাভাইরাস ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশ থেকে আসা অর্থের প্রবাহকে প্রভাবিত করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৬০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার এবং ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে।’
জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সফলভাবে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলার কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০২২ সালে শুরু হয়েছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং অবরোধ ও পাল্টা অবরোধ। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসহ দ্রব্যমূল্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। শুধু আমাদের মত দেশ না, উন্নত দেশগুলোও এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় আমদানি পরিহার, ব্যয় সঙ্কোচন, আর্থিক খাতে মনিটরিং জোরদার করে আমরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি, যেন কোনোভাবেই দেশের মানুষের কষ্ট না হয়।’
এ সময় পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ১০০ মহাসড়কের উদ্বোধন, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণের কাজের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় আপনাদের বেতন-ভাতা হয়। জনগণ ট্যাক্স দেয় সেবা পাওয়ার জন্য। সেবা দেয়া প্রতিটি সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব। সে জন্য সেবার মনোভাব নিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকলে আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
মানুষের কল্যাণে সব প্রকার ভয়-ভীতি ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে আইনানুগ দায়িত্ব পালন করারও নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর ২৫ নির্দেশনা
তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলেন, বহুবিধ কাজের মধ্যে কিছু বিষয়ের প্রতি আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
১. খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। পতিত জমিতে ফসল ফলাতে হবে। কোনো জমি যেন অনাবাদি না থাকে সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
২. নিজেরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং জনগণকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৩. সরকারি অফিসগুলোতে সাধারণ মানুষ যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বিঘ্নে যথাযথ সেবা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেবাপ্রত্যাশীদের সন্তুষ্টি অর্জনই যেন হয় সরকারি কর্মচারীদের ব্রত।
৪. সরকারি তহবিল ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে।
৫. এসডিজি স্থানীয়করণের আওতায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে তৎপরতা জোরদার করতে হবে।
৬. দেশে একজনও ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকবে না। গৃহহীনদের জন্য গৃহনির্মাণ, ভূমিহীনদের কৃষি খাসজমি বন্দোবস্তসহ সব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যেন প্রকৃত অসহায়, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। জমি ও ঘর প্রদানের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে হবে।
৭. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান কার্যক্রমের মানোন্নয়নে উদ্যোগী হতে হবে। অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
৮. কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলো যেন কার্যকর থাকেম তা প্রতিনিয়ত তত্ত্বাবধান করতে হবে।
৯. শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে তাদের জন্য প্রত্যেক এলাকায় সৃজনশীল চর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ক্রীড়া সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. নাগরিকদের সুস্থ জীবনাচারের জন্য জেলা ও উপজেলায় পার্ক, খেলার মাঠ প্রভৃতির সংরক্ষণ এবং নতুন পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
১১. পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে উচ্চপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে।
১২. সরকারি দপ্তরগুলোর ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। নিজ নিজ জেলার সরকারের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সাফল্য ওয়েবসাইটে তুলে ধরতে হবে।
১৩. জনসাধারণের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কাজ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব ইত্যাদি রোধে উদ্যোগ নিতে হবে।
১৪. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন কোনোভাবেই অবনতি না হয় সে লক্ষ্যে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
১৫. মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে কেউ যেন সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।
১৬. মাদক, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দূর করতে হবে। নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষ যেন জঙ্গিবাদে জড়িত না হয় সে জন্য সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
১৭. বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, খাদ্যে ভেজাল, নকলপণ্য তৈরি ইত্যাদি অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে।
১৮. বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে, কৃত্রিম সংকট রোধ ও পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
১৯ সরকারি জমি, নদী, বনভূমি, পাহাড়, প্রাকৃতিক জলাশয় প্রভৃতি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে নতুন সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপনে ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণকে প্রাধান্য দিতে হবে।
২০. নিয়মিত নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্য বৃদ্ধি করতে হবে। স্লুইচ গেট বা অন্য কোনো কারণে যেন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতার জন্য যেন উৎপাদন ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
২১. বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় তালগাছ রোপণ করতে হবে।
২২. পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন পর্যটন স্পট গড়ে তুলতে হবে।
২৩. জেলার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা এবং জেলাভিত্তিক বিখ্যাত পণ্যগুলোর প্রচার, বিপণন এবং ব্র্যান্ডিং করতে হবে।
২৪ জনস্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে সেবার মনোভাব নিয়ে যেন সরকারি দপ্তরগুলো পরিচালিত হয়, সেলক্ষ্যে মনিটরিং জোরদার করতে হবে।
২৫. জেলার সব সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমগুলো যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ তথা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনাদের ব্রতী হতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন। আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া।
অনুষ্ঠানে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার জি এস এম জাফরুল্লাহ বিভাগীয় কমিশনারদের পক্ষে এবং নরসিংদীর জেলা প্রশাসক আবু নাঈম মোহাম্মদ মারুফ খান ও বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভিন তিবরিজি জেলা প্রশাসকদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক উন্নয়নের ওপর একটি ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
পবিত্র ঈদুল আজহার সকালে ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে নিহত শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে তিনি রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা উভয়ে পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শাহাদাতবরণকারী বীর সন্তানদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। দেশের তরে জীবন বিলিয়ে দেওয়া এই সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মূল প্রাঙ্গণে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহধর্মিণীকে নিয়ে নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কবর জিয়ারত করেন। সম্পর্কে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্বশুর। সেখানে তাঁরা কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করেন। পারিবারিক এই শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত স্মারক চত্বরের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
বিডিআর বিদ্রোহে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান গভীর শোক প্রকাশ করেন। তাঁরা সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাফন করা শহীদদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত সেই বর্বরোচিত বিদ্রোহে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারান। সর্বমোট ৭৪ জনের শাহাদাতবরণের সেই ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল, যাঁদের অধিকাংশকেই এই সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই শ্রদ্ধা নিবেদনকালে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উল্লেখযোগ্য। তাঁরাও প্রধানমন্ত্রীর সাথে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত দোয়া ও মোনাজাতে শরিক হন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত অন্যান্য শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে সংক্ষেপে কুশল বিনিময় করেন।
ঈদের উৎসবের দিনে শহীদদের স্মরণ করার এই উদ্যোগটি সাধারণ মানুষ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ যেন জাতি কখনো ভুলে না যায়—সেই লক্ষ্যেই প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগতভাবে এই শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। নামাজ পরবর্তী এই জিয়ারত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের বীর সন্তানদের প্রতি জাতির চিরস্থায়ী কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন।
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ যখন সারা দেশের মানুষের মনে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছে, তখন পারস্য উপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে বিষাদময় সময় পার করছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ জন নাবিক। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ঈদুল ফিতরের পর এবার কোরবানির ঈদও তাদের কাটল বিদেশের মাটিতে লোনা জলে ভাসমান অবস্থায়। বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় জাহাজের নেভিগেশন ব্রিজে যখন ঈদের জামাত শুরু হয়, তখন সবার মনেই ছিল পরিবারের কাছে ফিরতে না পারার এক চাপা হাহাকার। জাহাজের মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খানের পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন এই অকুতোভয় নাবিকেরা।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতার থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই এই সংকটের শুরু। এর পরদিন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ত্রিমুখী যুদ্ধ শুরু হলে ভূ-রাজনৈতিক বেড়াজালে আটকা পড়ে জাহাজটি। গত ৮ এপ্রিল থেকে বড় পরিসরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এখনো অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের অনুমতি নিয়ে পার হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে ছাড়পত্র পাচ্ছে না বাংলাদেশি এই জাহাজটি।
নাবিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিরলস কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার কোনো সবুজ সংকেত মেলেনি। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ কাটানোর প্রবল ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জাহাজের ভেতরেই তাদের ত্যাগের এই উৎসব পালন করতে হয়েছে। যদিও জাহাজে ঈদের বিশেষ খাবার ও একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলির আয়োজন ছিল, কিন্তু প্রিয়জনদের সান্নিধ্য না পাওয়ার শূন্যতা সবকিছুকে ম্লান করে দিয়েছে। জাহাজের প্রতিটি কোণ এখন নাবিকদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে আছে, যারা প্রতিটি মুহূর্ত কেবল ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়ে দিন গুনছেন।
ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার হয়ে টানা তিন মাস ধরে তারা এক অনিশ্চিত গন্তব্যে সাগরে ভাসছেন। কবে নাগাদ তারা হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত তথ্য তাদের কাছে নেই। প্রতিটি দিন পার করা তাদের কাছে এখন একেকটি যুগের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজনদের কাছে ফেরার আকুল আকুতি নিয়ে মোনাজাতে তারা কেবল মুক্তির প্রার্থনা করেছেন। তাদের আশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দ্রুত তাদের এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনবে।
পরিশেষে বলা যায়, এই ৩১ জন নাবিকের ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে ছিল না কোনো প্রকৃত আনন্দ। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ঈদুল আজহা তাদের কাছে ত্যাগের চেয়েও বড় এক পরীক্ষার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশের সাগরে অবরুদ্ধ এই মানুষগুলোর জন্য এখন দেশবাসীর প্রার্থনা আর কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপই হতে পারে ঘরে ফেরার একমাত্র পথ। যতদিন না সেই ছাড়পত্র মিলছে, ততদিন পারস্য উপসাগরের দিগন্তহীন জলরাশিই হবে তাদের অস্থায়ী ঠিকানা।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের ৭৪টি কারাগারে অবস্থানরত প্রায় ৮২ হাজার বন্দির জন্য বিশেষ খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় প্রতিটি কারাগারে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে বন্দিরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় করেন। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিতে সকালের শুরুতেই বন্দিদের আপ্যায়ন করা হয় ঐতিহ্যবাহী পায়েস ও মুড়ি দিয়ে। কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্দিদের মানসিক প্রশান্তি ও উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই এই বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
দুপুরের খাবারে বন্দিদের জন্য রাখা হয়েছে অত্যন্ত উন্নত মানের রাজকীয় মেন্যু। এদিন দুপুরে তাদের পাতে পরিবেশন করা হচ্ছে সুগন্ধি পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু ও খাসির মাংস। এর পাশাপাশি ডেজার্ট হিসেবে থাকছে মিষ্টি ও চমচম। খাবারের পূর্ণতা দিতে দেওয়া হচ্ছে কোমল পানীয়, সালাদ এবং খাবার শেষে পান-সুপারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। রাতের খাবারের আয়োজনেও রয়েছে ভিন্নতা। রাতে বন্দিরা পাবেন সাদা ভাত, মচমচে রুই মাছ ভাজা ও সুস্বাদু আলুর দম। প্রতিটি পদ যেন মানসম্মত হয়, সে বিষয়ে জেল সুপারদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে বন্দিদের সঙ্গে তাদের স্বজনদের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিশেষ শিথিলতা আনা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য কারাগারের বাইরে স্থাপন করা হয়েছে ফ্রি জুস কর্নার। এছাড়া বন্দিদের সঙ্গে আসা শিশুদের জন্য চকলেট ও চিপস বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বজনদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কথা বলা এবং বিশেষ সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বন্দিদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন কারাগারে বন্দিরা তাদের পরিবারের পাঠানো নতুন পোশাক ও পাঞ্জাবি গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া অসুস্থ ও বয়স্ক বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহও নিশ্চিত করা হয়েছে।
উৎসবের আনন্দ কেবল খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নানা সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে প্রতিটি কারাগারে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। বিনোদনের অংশ হিসেবে ঈদের দ্বিতীয় দিনে বন্দিদের জন্য প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং তৃতীয় দিনে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচের সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কারাবিধি অনুযায়ী, ঈদের তিন দিনের মধ্যে যেকোনো একদিন বন্দিরা তাদের পরিবারের পাঠানো খাবার গ্রহণের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, বন্দিরা যেন নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন, সেই লক্ষ্যেই এমন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে অতিরিক্ত যোগাযোগ এবং মানসম্মত খাবারের এই সমন্বয় বন্দিদের সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। কড়া নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক এই উদ্যোগগুলো দেশের প্রতিটি কারাগারে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাতে অংশগ্রহণ ও নামাজ আদায় শেষে তাঁর প্রয়াত বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করার পরপরই তিনি সরাসরি শেরেবাংলানগরের জিয়া উদ্যানে যান। সেখানে তিনি তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত করেন। এ সময় তাঁর সাথে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য ও দলীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রয়াত মা-বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে সেখানে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন।
জিয়া উদ্যান থেকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বনানী কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে তিনি তাঁর ছোট ভাই মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ ও জিয়ারত করেন। পরিবারের সদস্যদের স্মরণে এবং তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় তিনি সেখানে দীর্ঘক্ষণ প্রার্থনা করেন। পবিত্র ঈদের দিনে ত্যাগের মহিমার পাশাপাশি পারিবারিক ও ধর্মীয় এই রীতি পালনের মাধ্যমে তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রতিবছরই ঈদের সকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের কবর জিয়ারত করে থাকেন।
এর আগে সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল আজহার দেশের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দিষ্ট সময়েই সেখানে উপস্থিত হয়ে সাধারণ মুসল্লিদের সাথে ঈদের নামাজ আদায় করেন। জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ছাড়াও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রতিমন্ত্রীগণ, জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা অংশগ্রহণ করেন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক এই প্রধান জামাতে ইমামতি করেন। দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ শেষে বিশেষ খুতবা পাঠ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় দোয়া করা হয়।
ঈদের এই প্রধান জামাতে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ অংশ নেন। নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লিরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী নামাজ পরবর্তী সময়ে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করেন। যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই ঈদের জামাত ও জিয়ারত কর্মসূচি সম্পন্ন হয়। শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ঈদ উদযাপনের আহ্বান জানান।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে চিঠিটির বার্তা প্রকাশ করা হয়।
চিঠিতে নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, এই পবিত্র উৎসব ভারতের সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারা ভারতের কোটি কোটি মুসলিম অত্যন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে এই উৎসব উদযাপন করছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঈদুল আজহা ত্যাগ, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের শাশ্বত আদর্শকে সমুন্নত রাখে; যা একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, যৌথ আত্মত্যাগ, সাংস্কৃতিক মিল এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পারস্পরিক আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে ভারত ও বাংলাদেশের মথ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
চিঠিতে মোদি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনমুখী পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে ভারত সরকার বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
তিনি আরও যোগ করেন, দুই দেশের জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে যে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা মূলত দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত।
চিঠির শেষ অংশে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
জাতীয় ঈদগাহে পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত শেষে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। নামাজের আগে বিশেষ বয়ান রাখেন তিনি। পরে ঈদের খুতবাহ দেন। এসময় তিনি পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্য তুলে ধরেন।
ভোর থেকেই হাজার হাজার মুসল্লি ঈদগাহে আসতে শুরু করেন। ভেতরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেকে সামনের সড়কে নামাজ আদায় করেন। একপর্যায়ে মুসল্লিদের উপস্থিতি কদম ফোয়ারা, শিক্ষাভবন ও শিক্ষা ভবন মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণ মুসল্লিদের পাশাপাশি এই জামাতে অংশ নেন প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, ঢাকায় নিযুক্ত মুসলিম দেশের কূটনীতিক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ হাজারও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি।
নামাজ উপলক্ষে ঈদগাহ ও আশপাশের সড়কে বর্ণিল সাজসজ্জা করা হয়। বিভিন্ন মোড়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে সুপেয় পানির ব্যবস্থা রাখা হয়।
এদিকে ঈদের জামাতকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। তল্লাশির মাধ্যমে মুসল্লিদের ঈদগাহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ত্যাগের মহিমায় সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ঈদের জামাতে মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দিনটির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় জামাত শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। এর ফলে সকাল থেকেই পাড়া-মহল্লার অলিগলি ও নির্ধারিত স্থানগুলোতে কোরবানি দাতা ও শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পশু জবাইয়ের পর মাংস প্রস্তুত এবং তা বণ্টনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন মানুষ। কেবল ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোতে উৎসবের একই চিত্র ফুটে উঠেছে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের পাশাপাশি সমাজের দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন সকলে। এই ত্যাগের উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা দেশেই এক ধরনের আনন্দঘন ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করছে।
পবিত্র এই উৎসব উপলক্ষে দেশবাসী ও সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এক বিশেষ বাণীতে তিনি কোরবানির প্রকৃত মর্মার্থ অনুধাবন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সামর্থ্যবানদের উচিত কোরবানির আনন্দ দরিদ্র, বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া। মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করাই এই পবিত্র দিনের অন্যতম শিক্ষা বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেশবাসী ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে কোরবানির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, কোরবানি মানে কেবল পশু জবাই করা নয়; বরং নিজের মনের কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা ও হিংসা-বিদ্বেষকে বিসর্জন দেওয়া। পশুর কোরবানির মাধ্যমে মানুষের মনের পশুত্বকে পরাভূত করে মহানুভবতার দীক্ষা গ্রহণ করাই ঈদুল আজহার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিশেষে বলা যায়, ত্যাগের এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এক অভূতপূর্ব সম্প্রীতির আবহ তৈরি হয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি এই কোরবানি সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বর্জ্য অপসারণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে উৎসবের আনন্দ নিরবচ্ছিন্ন থাকে। সামগ্রিকভাবে, ধর্মপ্রাণ মানুষ যথাযথ মর্যাদার সঙ্গেই তাঁদের পবিত্র এই ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছেন।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই জামাতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং বিদেশি কূটনীতিকরা অংশ নেবেন। প্রধান জামাতের আগে ও পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য জামাত আয়োজনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে দিনের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে সকাল সাড়ে ৭টায় জামাত অনুষ্ঠিত হবে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে বরাবরের মতো পাঁচটি পর্যায়ক্রমিক জামাত আয়োজিত হবে, যার প্রথমটি শুরু হবে সকাল ৭টায় এবং পরবর্তী জামাতগুলো যথাক্রমে ৮টা, ৯টা, ১০টা ও পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে।
জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে প্রবেশের জন্য পাঁচটি ফটক নির্ধারিত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে একটি শুধুমাত্র নারী মুসল্লিদের জন্য। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে চার থেকে ছয় স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড ও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আকাশপথ থেকে নজরদারির জন্য ড্রোন এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সোয়াট ও বোম ডিসপোজাল ইউনিটের মতো বিশেষায়িত দলগুলো সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। নারী মুসল্লিদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও পৃথক ইবাদতের স্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে মুসল্লিদের কেবল জায়নামাজ এবং প্রয়োজনে ছাতা সঙ্গে নিয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের ব্যাগ, দাহ্য পদার্থ বা ধাতব বস্তু নিয়ে ঈদগাহে প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া মৎস্য ভবন, প্রেসক্লাব ও হাইকোর্ট মোড়ে ট্রাফিক ডাইভারশন ও ব্যারিকেডের মাধ্যমে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অন্যদিকে, রামপুরা, মিরপুর এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানীয় ঈদগাহ ও মসজিদে অধিকাংশ জামাত সকাল ৭টায় শুরু হবে। গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদে সকাল ৮টায় জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সকল সমন্বয় সম্পন্ন হয়েছে।
একদা ক্ষমতার দাপটে নেতাকর্মীদের বিশাল বহর নিয়ে ঈদগাহে নামাজ আদায় কিংবা গণভবনে আড়ম্বরপূর্ণ মিলনমেলায় অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগের ১৬১ জন হেভিওয়েট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করবেন কারাগারের প্রকোষ্ঠে।
অতীতে ঈদের দিনে তাঁদের যে রাজসিক ব্যস্ততা দেখা যেত, কারাবন্দি জীবনে তার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র ফুটে উঠছে। ঈদের দিনের বিশেষ কারামেনু সম্পর্কে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, "অন্যবারের মতো এবার ঈদের দিনও সকালের নাশতায় আসামিদের জন্য থাকবে পায়েস বা সেমাইয়ের সঙ্গে মুড়ি।" দুপুরের ভোজে বন্দিদের পাতে থাকবে পোলাও, গরুর মাংস (অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য খাসি), মুরগির রোস্ট, মিষ্টান্ন, ডিম এবং পান-সুপারিসহ শীতল পানীয়। রাতের আহারে সাদা ভাতের সঙ্গে পরিবেশিত হবে মাছ ভাজা ও আলুর দম। দেশের সকল কারাগারেই বন্দিদের জন্য এই অভিন্ন খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ কারা কর্মকর্তা আরো বলেন, "প্রতিটি কারাগার নিজেদের সাধ্যমতো বন্দীদের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। দর্শনার্থীদের গ্রহণের জন্য বিশেষ আয়োজন ও বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।" ঈদের দিন এবং পরবর্তী দুই দিন স্বজনদের পাঠানো ঘরোয়া খাবার গ্রহণের সুযোগ পাবেন কারাবন্দিরা।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দুই শতাধিক বিশিষ্ট আসামির মধ্যে ১৬১ জন প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে ‘ডিভিশন’ সুবিধা পাচ্ছেন। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় এর মধ্যে প্রায় ৬০ জন উচ্চপর্যায়ের আসামিকে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে। সেখানে তাঁরা একত্রে ঈদের নামাজ আদায় ও পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী আগে থেকে জমা দেওয়া নির্ধারিত মোবাইল নম্বরে স্বজনদের সাথে কথা বলা ও সরাসরি সাক্ষাতের সুবিধাও বহাল থাকবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। ক্ষমতার বলয় থেকে বিচ্যুত হয়ে কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে পোলাও-রোস্টের আয়োজন থাকলেও বন্দিদের মনে এক ধরনের বিষণ্নতা বিরাজ করছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের আপামর জনসাধারণসহ বিশ্বের সকল প্রান্তের মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বুধবার (২৭ মে) এক বাণীতে এই শুভেচ্ছা বার্তা প্রদান করে তিনি উৎসবের আনন্দ সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য সচ্ছল ব্যক্তিদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। আর্তমানবতার সেবায় বিত্তবানদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘মানবকল্যাণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে ঈদুল আজহার গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে উল্লেখ করেন যে, এই উৎসব মূলত মানুষের ভেতরের পাশবিকতা ও হিংসা বিসর্জন দেওয়ার এক মহান মাধ্যম। তাঁর ভাষায়, ‘ঈদুল আজহা শুধু মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবই নয়; এটি আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও মনের পশুত্বকে কোরবানি করার এক মহিমান্বিত ও সর্বজনীন আহ্বান। মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ, অবিচল আনুগত্য এবং সামাজিক সাম্যের অনুপম মহিমায় সমুজ্জ্বল পবিত্র ঈদুল আজহা আবারও সমাগত।’ ইসলামের ইতিহাসে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্রকে উৎসর্গ করার যে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তাকে মানবজাতির জন্য পরম শিক্ষা হিসেবে অভিহিত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়ে যে আত্মসমর্পণ, ধৈর্য, বিশ্বাস ও আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা মানবজাতির জন্য চিরন্তন আদর্শ। এই মহান ঘটনা আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়।’
সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে কোরবানির প্রভাব অত্যন্ত ইতিবাচক বলে রাষ্ট্রপতি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘কোরবানির মাংস আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে অংশীদারি, বৈষম্য হ্রাস, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। একই সঙ্গে কোরবানির ঈদ গরিব মানুষের সারা বছরের আমিষের জোগান দিতে সাহায্য করে এবং সার্বিক অর্থে দেশের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করে।’ এই উৎসবের মূল শিক্ষাকে ধারণ করে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে উন্নত মানবিক গুণাবলি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সততা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে।’ এছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণের মাধ্যমে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান। পরিশেষে দেশ ও জাতির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করে তিনি প্রার্থনা করেন, ‘মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার কোরবানি কবুল করুন, দেশ ও জাতির ওপর তার অশেষ রহমত বর্ষণ করুন। ঈদুল আজহা সমগ্র বিশ্বে বয়ে আনুক শান্তি, স্থিতি, সম্প্রীতি ও অশেষ কল্যাণ।’
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনে নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষের স্রোত যখন গ্রামমুখী, তখন প্রকৃতিতে গত কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টির আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বৃষ্টি একদিকে তীব্র দাবদাহ থেকে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দিলেও যাতায়াতের পথে কিছুটা বিড়ম্বনা তৈরি করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঈদের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত লঘুচাপের বর্ধিতাংশ সক্রিয় থাকায় এমন বৈরী আবহাওয়ার সৃষ্টি হতে পারে বলে একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ঈদের দিনের তাপমাত্রা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও রাতের তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ১০৩ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ৭৮ মিলিমিটার বর্ষণ হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মোংলায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে জানিয়ে আবহাওয়া অফিস আরও উল্লেখ করেছে যে, ঈদের আমেজ কাটলেও বৃষ্টির এই প্রবণতা এখনই থামছে না।
আগামী ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এই বর্ষণ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফলে উৎসবের আনন্দ ও কোরবানির আনুষ্ঠানিকতায় বৃষ্টির প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান নামাজ রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সার্বিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিতব্য এই জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, বিচারপতিগণ, রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ এবং বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বৃহৎ আয়োজনকে ঘিরে জাতীয় ঈদগাহে যাবতীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছে নগর কর্তৃপক্ষ। ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন যে, “আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নারী-পুরুষের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঈদ জামাতকে সুশৃঙ্খল ও আরামদায়ক করতে ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে।” ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক এই ঐতিহাসিক জামাতে ইমামতি করবেন।
প্রায় ৩০ হাজার বর্গমিটারের বিশাল এই ঈদগাহ প্রাঙ্গণে ২৫ হাজার ৪০০ বর্গমিটার এলাকা প্যান্ডেলের আওতায় আনা হয়েছে। এখানে ১২১টি কাতারে একযোগে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায়ের সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে ভিআইপি পুরুষদের জন্য ২৫০টি এবং নারীদের জন্য ৮০টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। সাধারণ মুসল্লিদের ক্ষেত্রে ৩১ হাজার পুরুষ এবং পৃথক স্থানে সাড়ে তিন হাজার নারী মুসল্লির জন্য আরামদায়ক নামাজের সুব্যবস্থা রয়েছে। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ময়দানে প্রবেশের জন্য চারটি এবং বের হওয়ার জন্য সাতটি পৃথক তোরণ রাখা হয়েছে, যেখানে ভিআইপি, নারী ও সাধারণ পুরুষদের জন্য স্বতন্ত্র পথ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তীব্র গরম ও বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে ঈদগাহ ময়দানে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্যান্ডেলের নিচে পর্যাপ্ত ফ্যান, আলোর ব্যবস্থা এবং ভিআইপিদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সাধারণ মুসল্লিদের জন্য নিরাপদ পানীয় জল ও কার্পেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রায় ১৪০ জন মুসল্লির একযোগে অজুর জন্য নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক অজুখানা নির্মাণ করা হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা এবং ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের সংস্থান রাখা হয়েছে। এছাড়া বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ও পানি নিরোধক সামিয়ানার মাধ্যমে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে নামাজ আদায়ের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে। তিনটি দৃষ্টিনন্দন ফটক নির্মাণের মাধ্যমে উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই জাতীয় ময়দানে।
ঈদুল আজহার দিন তিনটি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বুধবার (২৭ মে) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহে প্রধান জামাতে অংশ নেবেন।’
‘আতিকুর রহমান রুমন জানান, জাতীয় ঈদগাহ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত এবং ফাতেহা পাঠ করে গুলশানের বাসায় যাবেন।
এরপর দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘বড়খানা’ (প্রীতিভোজ) অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, ঈদের দিন এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি দেশবাসীর সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেবেন এবং বিশেষ প্রার্থনা করবেন।